ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় স্বাভাবিকভাবে চালু করতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়েছে। প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে ইরান শর্তের একটি তালিকা তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে তেহরানের ওপর প্রভাব খাটিয়ে নৌপথটি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখার চেষ্টা করছেন মধ্যস্থতাকারীরা।
শুক্রবার ২৮ আগস্ট রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আলোচনার পথ থেকে সরে গিয়ে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পর কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি বৃহস্পতিবার তেহরান সফর করেন। তিনি ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

এর আগে জুনে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক হয়েছিল। এর ফলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও হরমুজ প্রণালি নিয়ে দুই দেশের মতবিরোধের কারণে তা দ্রুত ভেঙে পড়ে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি শুক্রবার কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠককে ‘সৃজনশীল’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বন্ধ করে আবার আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন।
আরাকচি বলেন, কূটনীতিকে আবারও সঠিক পথে ফেরানো অসম্ভব নয়। তবে এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝতে হবে যে চাপ প্রয়োগ করে কোনো ফল পাওয়া যাবে না। এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার নিন্দা করে একে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে শর্তের একটি তালিকা তৈরি করছে তেহরান।
তিনি বলেন, ইরান ওমানের সঙ্গে প্রণালির মধ্য দিয়ে একটি নির্দিষ্ট নৌপথ চালুর বিষয়ে একমত হয়েছে। ওই নৌপথের কিছু অংশ ওমানের জলসীমায় এবং কিছু অংশ ইরানের জলসীমায় পড়বে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শর্ত পূরণ করলে নির্ধারিত কেন্দ্রীয় নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে পারবে।
এর আগে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরানের দাবির মধ্যে ছিল দেশটির বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার, ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া। তবে এসব দাবির পরিবর্তন করে ওয়াশিংটনের কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো সমাধানে তেহরান যাবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে কয়েক মাস আগে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) পেতে রাখা সমুদ্র মাইন সরিয়ে ফেলার দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বলেছেন, আন্তর্জাতিক নৌপথ বর্তমানে উন্মুক্ত এবং জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার গতি তৈরি হয়েছে। তার দাবি, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মার্কিন বাহিনী প্রায় ১ হাজার ৫০০ বাণিজ্যিক জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হতে সহায়তা করেছে। এসব জাহাজে প্রায় ৭৫ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছিল।
তবে ইরানের হুমকির কারণে অনেক জাহাজ এখনো হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল এড়িয়ে যাচ্ছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক সময়ের মাত্র ৫ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।
শুক্রবার প্রকাশিত প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র সাতটি পণ্যবাহী জাহাজ গেছে। এর আগের দিন এই সংখ্যা ছিল ১৭টি। আর গত ১০ দিনের গড় ছিল ১৫টি জাহাজ।
হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে উপসাগরীয় দেশগুলোও বিকল্প অবকাঠামো তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলের বন্দর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের পূর্ব উপকূলের বন্দর দিয়ে বাণিজ্য ঘুরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে এসব বিকল্প পথের সক্ষমতা হরমুজ প্রণালির তুলনায় কম।