স্বাধীনতা যুদ্ধে বীর উত্তম এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদের বীরত্বগাঁথা | চ্যানেল আই অনলাইন

স্বাধীনতা যুদ্ধে বীর উত্তম এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদের বীরত্বগাঁথা | চ্যানেল আই অনলাইন

এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদ (অব.) (বীর উত্তম) ১৯৪৪ সালের ১ আগস্ট ফেনী জেলায় দাগনভূইয়া উপজেলার দক্ষিণ করিমপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আলহাজ্ব নুরুল হুদা এবং মাতা আংকুরেরনেছা বেগম। পিতামাতার চার ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে তার অবস্থান দ্বিতীয়। তিনি আরমানিটোলা সরকারী বিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে পাকিস্তানের পিএএফ পাবলিক স্কুলে যোগদেন। সেখান থেকে থেকে ম্যাট্রিকুলেশান এবং পিএএফ একাডেমি থেকে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইন্টারমিডিয়েট সম্পন্ন করেন। তিনি ১৯৬০ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগদান করেন এবং ১৯৬২ সালে জেনারেল ডিউটি (পাইলট) শাখায় কমিশন লাভ করেন। পরবর্তী কালে তিনি এয়ার কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ, যুক্তরাষ্ট্র হতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯৭০ সালে ফেরদৌস আরা মাহমুদ এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সাংসারিক জীবনে তিনি এক পুত্র ও কন্যা সন্তানের জনক। স্কুল, কলেজ ও একাডেমিতে একজন ভালো খেলোয়ার হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার পর মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে পাকিস্তানীদের সজাগ দৃষ্টি উপক্ষো করে স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে তাৎক্ষণিক শ্রীলংকা হয়ে ঢাকা পৌছান। তখন তিনি পাকিস্তানের মৌরিপুরে (করাচী) তে চাকুরীরত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে যোগাদনের সিদ্ধান্ত নেওয়াও খুব সহজ কাজ ছিল না। পাকিস্তানীদের অবর্ণনীয় অত্যাচার থেকে পরিবার ও স্বজনদেরর রক্ষা করার প্রশ্ন উপক্ষো করাও ছিল কঠিন। স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ একজন বন্ধুর গাড়ীতে দাউদকান্দি ফেরীঘাট পর্যন্ত পৌছান। গাড়ী থেকে যখন নামছিলেন স্থানীয় কিছু পাকিস্তানি সমর্থক তার বেশভূষা দেখে চ্যালেঞ্জ করলে এবং যখন তাদের দল ভারী হওয়া শুরু করল, তখন তার বন্ধু ভয় পেয়ে গাড়ী নিয়ে পিছন দিকে পালিয়ে যাওয়ার সময় তাকে একটি নদীর ধারে নামিয়ে দিলেন। অগত্যা কোন উপায় না দেখে নিজের হাত ব্যগটা পানিতে ফেলে, ভরা মেঘনায় ঝাঁপ দিলেন। ভাগ্য গুনে জোয়ার তাকে হোমনার দিকে নিয়ে গেল। অতঃপর তিনি প্রথমে ২ নম্বর সেক্টর (মতিনগর ও মেলাঘরে) এবং পরবর্তীকালে ১ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। সে সময় বিমান বাহিনী গঠিত হয়নি বলে প্রথমে তিনি গেরিলা যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সহায়তায় একজন পাইলট হিসাবে এগিয়ে এসে তার দক্ষতা দেখানোর সুযোগ ছিল বলে, স্থল যুদ্ধেই শত্রুর মুখোমুখি হতে এগিয়ে এলেন। তিনি এবং তার টিমের সদস্যরা মিলে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে ১৫০মাইল পায়ে হেঁটে চট্টগ্রামের মদুনা ঘাটে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র ধ্বংস করে চট্ট্রগ্রাম এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ বিছিন্ন করতে সক্ষম হন। সেই অভিযানে তিনি পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। আঘাত থেকে সেরে ওঠার সময় তিনি বাংলাদেশ ফোর্সেস হেডকোয়াটার্সে ছিলেন। এছাড়াও রামগড় থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বহু এলাকার স্থলযুদ্ধের অনেক সফল অপারেশন তার নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। সেই সময় মুক্তিবাহিনীর জন্য বিমান বাহিনী গঠনের প্রস্তুতি চলছিল। বাংলাদেশ বাহিনী সদর দপ্তরে “কিলো ফ্লাইট”-এর নেতৃত্বে দেওয়ার জন্য স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদকে ‘কিলো ফ্লাইট’, অর্থাৎ ভবিষ্যতের বাংলাদেশ বিমান বাহিনী গঠন ও নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের ০৫ মাস পর, তার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে বিমান বাহিনীর অবদান প্রমাণ করার সুযোগ এসেছিল। স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ ডিমাপুরে পৌঁছে ৯ জন পাইলট, ৪৭ জন বিমানসেনা এবং ০৩ টি বেসামরিক বিমান নিয়ে গঠিত কিলো ফ্লাইটের নেতৃত্ব দেন। ০৩ জন বিমান বাহিনীর বৈমানিক, ০৬ জন বেসামরিক পাইলট এবং ৪৭ জন টেকনিশিয়ান নিয়ে একটি বিমান বাহিনী ইউনিট তৈরি করতে দৃঢ় মানবিক গুণাবলী, আত্মত্যাগের মনোভাব এবং সাংগঠনিক দক্ষতার প্রয়োজন ছিল। পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বহু সফল বিমান আক্রমণের মাধ্যমে ইউনিটটি যুদ্ধে তার সক্ষমতা প্রমাণ করেছে।

এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদ মুক্তিযুদ্ধকালীন কিলোফ্লাইটের সদস্যদের নিয়ে পুরাতন অতি সাধারণ বিমান ও হেলিকপ্টারকে সামরিক যুদ্ধবিমানে রূপান্তর করেন। তাঁর নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জস্থ’ গোদনাইল ও চট্টগ্রামের পতেঙ্গাস্থ’ তেলডিপো ধ্বংস, মৌলভীবাজারে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ৩১৩ ব্রিগেড সদর দপ্তরে আক্রমণ, শমসেরনগর ও কুলাউড়ায় বিমান আক্রমণ এবং নরসিংদীতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোলাবারুদ বহনকারী ট্রাকের ওপর আক্রমণসহ বহু সফল অভিযান পরিচালিত হয়। এ সকল অভিযানের ফলে ৭ ডিসেম্বরেই পাকিস্তনি হানাদার বাহিনী বাংলার আকাশে উড্ডয়ন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এছাড়া তিনি প্রথমবারের মতো কিলোফ্লাইটের অ্যালুয়েট হেলিকপ্টার দিয়ে সশস্ত্র পাহারায় মিত্রবাহিনীর প্যারাট্রুপারদের নরসিংদীতে অবতরণে সহায়তা করেন। পাকিস্তনি বাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে দিয়ে বিজয়ক্ষণ এগিয়ে আনতে এ সকল সফল আক্রমণের ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ তার সহ-পাইলট সহ ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তানি অবস্থানের উপর প্রথম বিমান আক্রমণ পরিচালনা করেন। সেই আক্রমন ছিল আকাশ যুদ্ধে এক বিরল ঘটনা। আর সেই আক্রমনের সাথে সাথেই মিত্র বাহিনীর সশস্ত্র আক্রমনের সূচনা করে। যথাযথ নেভিগেশন যন্ত্র এবং অস্ত্র ব্যবস্থা ছাড়াই পুরানো অ্যালুয়েট-৩ হেলিকপ্টার দ্বারা ভারী প্রতিরক্ষামূলক তেল শোধনাগারের বিরুদ্ধে রাতে আক্রমণ পরিচালনা করা বিমান যুদ্ধের ইতিহাসে বিরল। তার রাতের আক্রমণের সাফল্যের পর পরই মিত্র বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমন শুরু হয়। সেদিন বাংলাদেশ বিমান বাহিনী পাকিস্তানিদের পরাজয়ের প্রথম ঘণ্টাধ্বনি বাজায়। পরের দিন সকাল থেকেই পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যৌথ বহুমাত্রিক আক্রমণ শুরু হয়। নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল জ্বালানি ডিপোতে সেই রাতের সাহসী আক্রমণ এবং ঘাঁটিতে নিরাপদে প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর অসাধারণ কৃতিত্বের প্রমাণ বহন করে। স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ তার দলের সদস্যদের নিয়ে ১৯৭১ সালের ৩ থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সিলেট, শায়েস্তাগঞ্জ, শমশেরনগর, মৌলভীবাজার, কুলাউড়া, নরসিংদী, রায়পুরা, কুমিল্লা, ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, দাউদকান্দি এবং এলিয়টগঞ্জে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অনেক অভিযান পরিচালনা করেন। তারঁ হেলিকপ্টারটি গুলিবিদ্ধ হয়েছে বারবার। তারপরও সেই হেলিকপ্টারটি সব ক্ষতি স্বীকার করে টিকেছিল, মহান মুক্তিযুদ্ধে রেখেছিল বিশেষ ভূমিকা। স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ ২৫টি বিমান অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। তিনি তার দলের সদস্যদের নিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রথম ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। বিজয়ের পর প্রথম কয়েক দিনের মধ্যে তিনি বিমান বাহিনী গঠন এবং তেজগাঁও বিমানবন্দরকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন।

তাঁর বিরত্ব সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল (অবঃ) এ কে খন্দকার বীর উত্তম বলেছিলন, কর্তব্য পালনের আহ্বান ছিল না বরং দেশের প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং বাংলাদেশের প্রতি গভীর আনুগত্য তাকে সমস্ত ঝুঁকি মোকাবেলা করে তার মাতৃভূমির সেবা করতে পরিচালিত করেছিল’।

এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদ (অব.) বীর উত্তম, স্বাধীনতা পরবর্ত্তী সময়েও বিমান বাহিনী গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান ও বিমান বাহিনী গঠণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার স্বীকৃতি হিসাবে ১৯৮১ সালের ২৩ জুলাই বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রধান হিসাবে দায়িত্ব প্রদান করা হয় এবং ১৯৮৭ সালের ২২ জুলাই পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সালের মার্চ মাস থেকে তিনি উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বও পালন করেছেন প্রায় ০৫ বছর। বিমান বাহিনী থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি অস্ট্রোলিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসাবে ০৩ বছর দায়িত্ব পালন করেন।

মুক্তিযুদ্ধে তার দেশপ্রেম, সম্মুখ সমরে অকুতোভয় অংশগ্রহণ এবং অসীম সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরুপ বাংলাদেশ সরকার তাকে “বীর উত্তম” উপাধিতে ভূষিত করেন। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধে তার দেশাত্ববোধ ও সাহসিকতার জন্য ব্রাজিল সরকার তাকে “মেরিট আ্যারোনটিকস” উপাধিতে সম্মানিত করেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদ (অব.) বীর উত্তম, কে ২০১৮ সালে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান স্বাধীনতা পদক প্রদান করেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম বীর সেনানী ও অকুতোভয় যোদ্ধা এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদ (অব.) বীর উত্তম, ২০২৩ সালের ১৪ই আগষ্ট মৃত্যুবরণ করেন।

Scroll to Top