সীতার জন্মভূমিতে এক আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ভ্রমণ | চ্যানেল আই অনলাইন

সীতার জন্মভূমিতে এক আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ভ্রমণ | চ্যানেল আই অনলাইন

পাহাড়ি জনপদের নির্মল আনন্দের আকর্ষণে আমরা ছুটে গিয়েছিলাম নেপালে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে। পাহাড়ের বৈচিত্র্যের প্রেমে পড়ে আবারও কলম ধরা—লিখে ফেললাম জানকী নগরের ভ্রমণ কাহিনী।

কাঠমুন্ডু থেকে জানকিনগরের দূরত্ব সড়কপথে ৩৯০ কিলোমিটার, সময় লাগে ১০-১২ ঘণ্টা। তবে প্লেনে গেলে সময় লাগে ২০-২৫ মিনিট মাত্র! সড়কপথের স্বর্গীয় সৌন্দর্য এককথায় অসাধারণ।

কাঠমুন্ডু থেকে জানকীনগরের পথটি যেন নেপালের ভূগোলকে ধীরে ধীরে উন্মোচনের এক জীবন্ত ক্যানভাস। ভোরের কুয়াশা ভেদ করে যখন যাত্রা শুরু হয়, তখন কাঠমুন্ডু উপত্যকার পাহাড়গুলো নীরবে পেছনে পড়ে থাকে—শুরু হয় এক দীর্ঘ অথচ মোহময় পথচলা।

শহর ছাড়িয়ে গাড়ি এগোতে থাকে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায়। এক পাশে খাড়া পাহাড়, অন্য পাশে গভীর খাদ; মাঝেমধ্যে দেখা মেলে পাহাড়ি ঝরনা আর সবুজ বনানীর। চন্দ্রগিরির ঢাল পেরোতে বাতাসের ঠান্ডা শীতলতার ছোঁয়া অনুভব করা যায়। দূরে ছোট ছোট গ্রাম, টিনের ছাউনি আর প্রার্থনার রঙিন পতাকা বাতাসে দুলতে দুলতে পথিককে শুভেচ্ছা জানায়।

পথ যত এগোয়, পাহাড়ি পরিবেশ ধীরে ধীরে নরম হতে শুরু করে। উঁচু ঢাল বদলে যায় ঢেউ খেলানো উপত্যকায়। নদীর ওপর ঝোলানো কংক্রিটের সেতু পেরিয়ে দেখা যায় পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা জলধারা। রাস্তার পাশে চা, গরম গরম মোমো ও থুকপার দোকান, ফলের দোকান আর বিশ্রাম নেওয়া ট্রাক—সব মিলিয়ে পথের নিজস্ব এক জীবন।

কিছুক্ষণ পর প্রকৃতির রূপ পাল্টাতে থাকে। পাহাড়ের রুক্ষতা হারিয়ে সামনে খুলে যায় তেরাই অঞ্চলের বিস্তীর্ণ সমতল। এখানে আকাশ যেন আরও বড়, বাতাস ভারী আর মাটির রঙ গাঢ়। ধানক্ষেত, কলাবাগান ও সরিষার ক্ষেত একে একে চোখে পড়ে। গ্রামীণ জনপদের মানুষজন ব্যস্ত তাদের দৈনন্দিন কাজে—এই দৃশ্য পথকে আরও মানবিক করে তোলে।

সূর্য যখন পশ্চিমে ঢলে পড়ে, তখন জানকী নগরের আভাস মিলতে শুরু করে। রাস্তার পাশে হ্রদ আর জলাশয়ের ঝিলিক দেখা যায়। দূরে মন্দিরের চূড়া আর শহরের কোলাহল জানান দেয়—মিথিলার পুণ্যভূমি আর খুব দূরে নয়।

অবশেষে যখন জানকীনগরে প্রবেশ, তখন পাহাড়ি যাত্রার ক্লান্তি যেন মিলিয়ে যায় এক গভীর প্রশান্তিতে। কাঠমুন্ডুর পাহাড় থেকে জনকপুরের সমতল—এই পথ শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর গল্প নয়, এটি নেপালের প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও জীবনের এক নিঃশব্দ কিন্তু গভীর অভিজ্ঞতা।

নেপালের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত জনকপুর শুধু একটি শহর নয়—এটি মিথিলা সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র, সনাতন বিশ্বাসের এক পবিত্র তীর্থভূমি। দেবী সীতার জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত এই নগরী যুগ যুগ ধরে ধর্ম, সংস্কৃতি ও শিল্পকলার এক অনন্য মিলনস্থল হয়ে আছে। জনকপুরের হৃদয়ে অবস্থিত জানকী মন্দির নেপালের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ধর্মীয় স্থাপনা এবং সনাতন ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

জানকী মন্দির, যা সীতা মন্দির নামেও পরিচিত, জনকপুর জেলার প্রধান আকর্ষণ। সনাতন বিশ্বাস অনুযায়ী এখানেই দেবী সীতার জন্ম এবং এই জানকী নগরীতেই ভগবান রাম ও সীতার পবিত্র বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল। এই ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক গুরুত্বের কারণেই জানকী মন্দির সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এক পরম শ্রদ্ধার স্থান।

পাথর ও মার্বেল দিয়ে নির্মিত তিনতলা বিশিষ্ট এই মন্দিরে রয়েছে প্রায় ষাটটি কক্ষ। নেপালের জাতীয় পতাকার নকশা, সূক্ষ্ম চিত্রকর্ম, অলংকৃত জালি-জানালা ও মিথিলা শিল্পরীতির নিখুঁত ছোঁয়া মন্দিরটিকে স্থাপত্যশিল্পের এক অনবদ্য নিদর্শনে পরিণত করেছে।

জনশ্রুতি অনুসারে, ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে টিকমগড়ের মহারাণী বৃষভানু দেবী জানকী মন্দিরটি নির্মাণ করেন। সে সময় এই মন্দির নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল প্রায় নয় লক্ষ টাকা—যা তৎকালীন যুগে ছিল বিরল ও ব্যতিক্রমী। এই কারণেই জানকী মন্দির লোকমুখে পরিচিতি পায় “নৌলাখা মন্দির” নামে। এর স্থাপত্যে হিন্দু ও নেপালি-মুঘল রীতির সুন্দর সমন্বয় লক্ষ করা যায়।

জানকী মন্দির নেপালের সবচেয়ে বড় মন্দির, যার আয়তন প্রায় ৪,৮৬০ বর্গফুট। এই মন্দিরের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিক হলো—মন্দির প্রাঙ্গণের ভেতরেই একটি মসজিদের অস্তিত্ব। এটি ধর্মীয় সহনশীলতা ও সহাবস্থানের এক বিরল দৃষ্টান্ত, যা জানকী মন্দিরকে কেবল ধর্মীয় নয়, মানবিক মূল্যবোধেরও প্রতীক করে তুলেছে।

বিবাহ পঞ্চমী, রাম নবমী ও দীপাবলির সময় জানকী মন্দির পরিণত হয় উৎসবের আলোকমালায় ভরা এক প্রাণবন্ত তীর্থক্ষেত্রে। এই সময় নেপাল, ভারত ও শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার সনাতনী ভক্ত দেবীর দর্শনে আসেন। আলো, ফুল, ভজন-কীর্তন ও ধর্মীয় আচার মিলে মন্দির প্রাঙ্গণে সৃষ্টি হয় এক অনন্য আধ্যাত্মিক আবহ।

জনকপুরে রয়েছে বায়ান্নটিরও বেশি ঐতিহাসিক হ্রদ, যেগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা কিংবদন্তি ও ধর্মীয় বিশ্বাস। এর মধ্যে ধনুষ সাগর, গঙ্গা সাগর ও পরশুরাম কুণ্ড বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ছট পূজার সময় এসব জলাশয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজার অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠে। এছাড়াও দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে— বিবাহ মণ্ডপ, ধনুষ ধাম, রাম মন্দির ও স্বর্গদ্বার।

জনকপুর মিথিলা সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। কায়স্থ, যাদব, থারু, ব্রাহ্মণ, ছেত্রীসহ নানা জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস এখানে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। মৈথিলী শিল্প ও চিত্রকলা জনকপুরের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

জনকপুরে বিভিন্ন বাজেটের হোটেল ও রিসোর্টে থাকার সুবিধা রয়েছে। খাবারের তালিকায় রয়েছে ভাত, ডাল, তরকারি, ডিডোসহ ভাজা, লিট্টি ও লস্যির মতো জনপ্রিয় স্থানীয় খাবার।

জানকী মন্দির ও জনকপুর কেবল একটি ভ্রমণগন্তব্য নয়—এটি বিশ্বাস, ইতিহাস, শিল্প ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল। মিথিলার এই পুণ্যভূমি ভ্রমণ মানেই আত্মিক প্রশান্তি, ঐতিহ্যের স্পর্শ এবং মানবিক সহাবস্থানের এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

Scroll to Top