ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের মানুষ। এ সংকট বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। ইতিমধ্যে গ্রামাঞ্চলে চরম লোডশেডিং শুরু হয়ে গেছে। এর মধ্যে নিত্যপণ্যের বাজারও অশান্ত হয়ে উঠেছে। জ্বালানি তেলের সংকটের মধ্যে সরকার এখনো জ্বালানি বা বিদ্যুতের দাম বাড়ায়নি। তেলসংকটের প্রভাব বাজারে পড়ার কথা নয়। ফলে বাজারে অস্থিরতার কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি করাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে এখনই তৎপর হতে হবে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে মুরগি, মাছ ও সবজি—অনেক পণ্যের দাম বেড়েছে। খুচরা বিক্রেতাদের ভাষ্য, সরবরাহ–সংকটের কারণ দেখিয়ে গত এক-দুই মাসে ধাপে ধাপে এসব পণ্যের দাম বাড়িয়েছেন সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত ব্যবসায়ীরা। সরকারের পক্ষ থেকে বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রতিনিয়ত আশ্বাসের বাণী শোনানো হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন মিলছে না।
সাধারণ মানুষের মাংসের চাহিদা মেটানোর প্রধান উৎস সোনালি ও ব্রয়লার মুরগি এখন আক্ষরিক অর্থেই ‘বিলাসিতা’। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে সোনালি মুরগির দাম কেজিতে ১০০ টাকার বেশি বেড়ে গেলেও এখন কিছুটা কমেছে। ডিমের দামও ডজনে বেড়েছে। খামারিদের লোকসান বা বাচ্চার দাম বাড়ার যে অজুহাত ব্যবসায়ীরা দিচ্ছেন, তা কতটা যৌক্তিক আর কতটা কারসাজি, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন আছে।
ভোজ্যতেলের বাজারেও দেখা যাচ্ছে, দুই মাস ধরে বোতলজাত সয়াবিন তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রাখা হয়েছে। ডিলার পর্যায়ে সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে প্রকারান্তরে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাখা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দাম না বাড়ানোর প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত নিলেও বাজারে তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে, সরবরাহ নেই এমন অজুহাতে বাড়তি দামে তেল বিক্রি হচ্ছে। তাহলে কি সরকারের সিদ্ধান্ত কার্যকরে আন্তরিক নন ব্যবসায়ীরা? আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে বারবার দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলেও শুল্কছাড়ের সুবিধা নিয়ে ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষকে কোনো স্বস্তিই দিচ্ছেন না।
সবজির বাজারও চড়া। গ্রীষ্মকালীন সবজির আগমনের শুরুতে প্রতিটি সবজির কেজি এখন ৮০ থেকে ১০০ টাকার ওপর। এমন দামে সবজি কিনে খাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে। শীতকালীন সবজির বিদায়বেলায় যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তার সুযোগ নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সুগন্ধি চালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। পোলাও চালের দাম এক বছরে ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে সরবরাহ শৃঙ্খল পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। প্যাকেটজাত সুগন্ধি চালের দাম যেভাবে চার মাসে তিনবার বাড়ানো হয়েছে, তা কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না।
২০২২ সাল থেকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দারিদ্র্যের হার বেড়ে গেছে। মানুষের আয় বাড়েনি। ফলে ক্রয়ক্ষমতায়ও কমে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে অধিক মনোযোগী হতে হবে সরকারকে। সরবরাহ-সংকটের দোহাই দিয়ে দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই। কিন্তু বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির সিলেটে ‘কৃষকের হাট’ উদ্বোধনকালে বাজার সিন্ডিকেটের স্মৃতি বিদায় করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা শুনতে শ্রুতিমধুর হলেও মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন। সরবরাহব্যবস্থায় নজরদারি বাড়িয়ে শৃঙ্খলা আনতে হবে। যাঁরা অনিয়ম করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। প্রতিটি জেলায় ‘কৃষকের হাট’ মডেল ছড়িয়ে দিতে হবে। টিসিবির কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে হবে।



