
তেহরান, ২৫ মার্চ – যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেছে। সংঘাতের শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার খবর আসে। এই ঘটনার পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন যে যুদ্ধ হয়তো দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে। তবে বাস্তবে তা ঘটেনি এবং ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনো মজবুতভাবে টিকে আছে।
প্রশ্ন উঠেছে যে প্রথম দিনেই সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পরও লিবিয়া, সিরিয়া বা ইরাকের মতো দেশগুলোর স্বৈরশাসনের মতো ইরানের পতন কেন হলো না। এর প্রধান কারণ হলো ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর দেশটিতে গড়ে ওঠা এক অত্যন্ত জটিল ও সুসংগঠিত শাসন কাঠামো। ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যাতে পুরো ক্ষমতা কখনোই একক কোনো ব্যক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না থাকে। ইরানে সর্বোচ্চ নেতা দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা পালন করেন। এই বিশেষ পদটি ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পরপরই সৃষ্টি করা হয়েছিল।
নিয়ম অনুযায়ী ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ পরিষদ একজন জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতাকে আজীবনের জন্য এই পদে নির্বাচিত করে থাকে। গোয়েন্দা সংস্থা এবং সেনাবাহিনীসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদে নিয়োগ তার সরাসরি অনুমোদনের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। ইরানের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কেবল দুজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা হলেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি এবং আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো ইরানের ক্ষমতা শুধু সর্বোচ্চ নেতার হাতেই কুক্ষিগত নয়। এর পাশাপাশি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি নামের আরেকটি অত্যন্ত শক্তিশালী কাঠামো দেশটিতে কার্যকর রয়েছে। আইআরজিসির প্রভাব কেবল সামরিক নির্দেশনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং তাদের ক্ষমতা সর্বস্তরে বিস্তৃত। চলমান এই সংঘাতে আইআরজিসির কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় কমান্ডার নিহত হয়েছেন।
তবে সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে কেউ নিহত হলেও তার শূন্যস্থান পূরণের জন্য নতুন কমান্ডার সব সময় প্রস্তুত থাকেন। আইআরজিসি বাসিজ নামে পরিচিত একটি স্বেচ্ছাসেবী মিলিশিয়া বাহিনীও নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। প্রায় ১০ লাখ সদস্যের বিশাল এই বাহিনীকে সাধারণত যেকোনো ধরনের ভিন্নমত বা অভ্যন্তরীণ কোন্দল দমনের জন্য রাস্তায় মোতায়েন করা হয়। ইসরায়েল দাবি করেছে যে তারা বাসিজের বেশ কয়েকটি চেকপয়েন্টে সফল হামলা চালিয়েছে। তা সত্ত্বেও শহরগুলোতে বাসিজ সদস্যরা এখনো সক্রিয় রয়েছেন এবং তারা নিয়মিত গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছেন। দেশের অভ্যন্তরে কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষকে রাস্তায় নেমে কোনো ধরনের বিক্ষোভ না করার বিষয়ে কঠোরভাবে সতর্ক করেছে।
এই উদ্দেশ্যে সরকারিভাবে বিবৃতি প্রদান এবং নাগরিকদের মুঠোফোনে গণহারে খুদে বার্তা পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ফলে বিক্ষোভকারীদের পক্ষে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয় করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটিতে এখন পর্যন্ত বড় আকারের কোনো সরকারবিরোধী বিক্ষোভ বা আন্দোলন দেখা যায়নি। উল্টো রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো বিভিন্ন শহরে সরকারের সমর্থকদের বড় বড় সমাবেশের দৃশ্য সম্প্রচার করছে। অন্যদিকে মার্চের শুরুতে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসার পর থেকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে এখনো জনসমক্ষে উপস্থিত হতে দেখা যায়নি। ইরানি গণমাধ্যমে কেবল তার দেওয়া কয়েকটি লিখিত বার্তা প্রকাশ করা হয়েছে।
ইসরায়েল তাকেও লক্ষ্যবস্তু বানানোর কথা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ইরানি কর্তৃপক্ষ তাদের শীর্ষ নেতাদের অবস্থানে পরিবর্তন এনেছে এবং বিভিন্ন চেকপয়েন্টে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন দেশটি বর্তমানে নেতৃত্বের চেয়ে বরং শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেই বেশি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ইরান তার রাষ্ট্রের সার্বিক ক্ষমতা ও দায়িত্ব বিভিন্ন স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সুকৌশলে ভাগ করে দিয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশিরভাগই এখনো নিজেদের কার্যক্রম কোনো না কোনোভাবে চালিয়ে যাচ্ছে।
এই বিকেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থাটি বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের সরকারের গঠনকাঠামোর তুলনায় একেবারেই ভিন্ন। বিশেষজ্ঞ পরিষদ হলো এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা আগামী দিনে যাদের কথা আরও বেশি শোনা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মোট ৮৮ জন সদস্য নিয়ে গঠিত এই পরিষদ দেশের সর্বোচ্চ নেতাকে নির্বাচন ও নিয়োগ করার প্রধান দায়িত্ব পালন করে। সর্বোচ্চ নেতা মারা গেলে তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে নতুন নেতা বেছে নেওয়ার পুরো দায়িত্বও তাদের ওপর ন্যস্ত থাকে। তারা চাইলে কোনো সর্বোচ্চ নেতাকে অযোগ্য বিবেচনা করে অপসারণ করার ক্ষমতাও রাখেন। তবে বাস্তবে এ ধরনের হস্তক্ষেপের নজির অত্যন্ত বিরল।
সর্বোচ্চ নেতার ঠিক নিচেই অভিভাবক পরিষদ ইরানের অন্যতম একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে। ১২ জন সদস্যের সমন্বয়ে এই পরিষদ গঠিত হয়। এর মধ্যে ছয়জন ইসলামী ধর্মগুরুকে সর্বোচ্চ নেতা নিজে নির্বাচন করেন এবং বাকি ছয়জন আইনজ্ঞকে সংসদ নিয়োগ দেয়। সংসদে পাস হওয়া যেকোনো আইন তারা পর্যালোচনা করে দেখেন এবং তা ইসলামী শরিয়াহ আইন অনুযায়ী প্রণীত হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করেন। এছাড়া সংসদ নির্বাচনে কারা প্রার্থী হতে পারবেন সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও তারা গ্রহণ করেন। এর ফলে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাদের ব্যাপক প্রভাব বজায় থাকে। ইরানের বিচার বিভাগ একজন প্রধান বিচারপতির অধীনে পরিচালিত হয়। তাকেও সর্বোচ্চ নেতা সরাসরি নিয়োগ দেন।
এই প্রতিষ্ঠানটি কেবল আদালত তত্ত্বাবধান বা অভিশংসক নিয়োগের কাজই করে না বরং দেশের ইসলামী আইনের কঠোর ব্যাখ্যাও প্রদান করে থাকে। সমাজব্যবস্থার ওপর তাদের এই ব্যাখ্যার বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে। বর্তমানে ইরানের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন মাসুদ পেজেশকিয়ান। চার বছর মেয়াদে নির্বাচিত এই রাষ্ট্রপতি সরকার পরিচালনা, মন্ত্রী নিয়োগ এবং বাজেট প্রস্তাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করেন। তবে সাধারণ সংসদ সদস্যদের মতো তাকেও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আগে অভিভাবক পরিষদের কঠিন ছাড়পত্র ও অনুমোদন নিতে হয়। এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিল মূলত সর্বোচ্চ নেতাকে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার কাজ করে। পাশাপাশি সংসদ এবং অভিভাবক পরিষদের মধ্যে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে তা নিরসন করাও তাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
আরতেশ নামে পরিচিত ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনীর অস্তিত্ব রাজতন্ত্রের আমল থেকেই বিদ্যমান রয়েছে। দেশের সীমান্ত সুরক্ষিত রাখা এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করা তাদের প্রধান দায়িত্ব। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর আইআরজিসি গঠন করা হয়। তৎকালীন নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি নিয়মিত সেনাবাহিনীকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তার আশঙ্কা ছিল যে সেনাবাহিনী হয়তো ক্ষমতাচ্যুত শাহের প্রতি অনুগত থাকতে পারে। আইআরজিসি সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার কাছে জবাবদিহি করে থাকে এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের আদর্শকে টিকিয়ে রাখাই তাদের মূল লক্ষ্য।
১৯৮০ সালে শুরু হওয়া ইরান এবং ইরাক যুদ্ধের দীর্ঘ আট বছরে এই বাহিনী আকার ও শক্তিতে বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। নিজেদের নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী থাকার পাশাপাশি আইআরজিসি বাসিজ নামের মিলিশিয়া বাহিনীটিকে নিয়ন্ত্রণ করে। এটি প্রায়শই অভ্যন্তরীণ প্রতিবাদ দমনে ব্যবহৃত হয়।
তারা আইআরজিসির আন্তর্জাতিক শাখা হিসেবে পরিচিত কুদস ফোর্সও পরিচালনা করে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী যেমন হামাস, হিজবুল্লাহ এবং হুথিদের সাথে তাদের গভীর ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইরানের রাজনীতিতে আইআরজিসির প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। কোনো কারণে সর্বোচ্চ নেতা মারা গেলে সাময়িকভাবে প্রধান বিচারপতি, রাষ্ট্রপতি এবং অভিভাবক পরিষদের একজন সদস্যকে নিয়ে গঠিত একটি ত্রিপক্ষীয় কমিটি তার দায়িত্ব পালন করে থাকে।
এ এম/ ২৫ মার্চ ২০২৬





