আবির হোসেন সজল : উত্তরবঙ্গের ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ লালমনিরহাট–বুড়িমারী মহাসড়ক এখন দেশের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ভয়াবহ দুর্ঘটনার ধারাবাহিকতায় এ সড়কে ঝরছে প্রাণ, আহত করছে বহু মানুষকে। এ মহাসড়কে রয়েছে ৮৪টি বাঁক ও ১১টি রেলওয়ে লেভেল ক্রসিং। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে খানাখন্দ ও কার্পেটিং টিউমারি। প্রতিনিয়িত দূর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয় মহাসড়কটিতে।

জেলা পুলিশের কন্ট্রোল রুম ও হাইওয়ে থানার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারী থেকে ২০২৬ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত এক বছরে এ মহাসড়কে মোট ৬৫টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ৩৪ জন নিহত এবং ৫৫ জন আহত হয়েছেন। সড়ক দূর্ঘটনা সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ২৭টি।
সবশেষ ১৭ মার্চ সকালে এই মহাসড়কের পাটগ্রাম উপজেলার মডেল মসজিদ এলাকায় ভয়াবহ দূর্ঘটনা ঘটে। একই পরিবারের এক শিশুসহ তিনজন মারা যায়। ওই পরিবারের আট বছর বয়সের অপর শিশু গুরুতর আহত হয়ে এখন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। এনজিও কর্মী শরিফুল ইসলাম তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে মোটরসাইকেলযোগে বাড়ি ফিরছিলেন। বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রাক ধাক্কা দিলে ঘটনাস্তলেই শরিফুল, তার স্ত্রী ও এক শিশু সন্তান মারা যায়। অপর শিশু সন্তান গুরুতর আহত হয়।
১৯৮৮ সালে লালমনিরহাট শহরের সঙ্গে বুড়িমারী স্থলবন্দর সংযোগ স্থাপনের জন্য নির্মিত হয় এই মহাসড়কটি। পরের বছর, ১৯৮৯ সালে, এটি জাতীয় মহাসড়ক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে সড়কের সংকীর্ণ প্রস্থ ও ত্রুটিপূর্ণ নকশা ক্রমে এটিকে দিন দিন আরও অনিরাপদ করে তুলেছে, বিশেষ করে প্রতিদিনের বাড়তি যানবাহনের চাপে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) জানায়, জাতীয় মহাসড়কের মান অনুযায়ী এ সড়কের প্রস্থ ১০ দশমিক ৩ মিটার হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে এটি মাত্র ৫ দশমিক ৫ মিটার প্রশস্ত। অথচ প্রতিদিন প্রায় ৫,০০০ যানবাহন—যার মধ্যে পণ্যবাহী ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাসও রয়েছে—এই সড়ক দিয়ে চলাচল করে। এছাড়া পুরো সড়কজুড়ে রয়েছে ৮৪টি বাঁক ও ১১টি রেলক্রসিং, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। এত বাঁক ও রেলক্রসিংয়ের মহাসড়ক দেশে আর কোথাও নেই। এটি যেন এক মৃত্যু ফাঁদ।
প্রতিটি রেলক্রসিংয়েই রয়েছে গেট ও গেটম্যান। কিন্তু প্রতিদিন লালমনিরহাট–বুড়িমারী রুটে চার জোড়া ট্রেন চলাচল করে, ফলে প্রতিদিন আটবার এসব ক্রসিংয়ে যান চলাচল বন্ধ থাকে, তৈরি হয় দীর্ঘ যানজট ও বিশৃঙ্খলা।
“আমি দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে ট্রাক চালাই, কিন্তু এত বেশি বাঁক, রেলক্রসিং ও সংকীর্ণ রাস্তা আর কোথাও দেখিনি,” বলেন মশিউর রহমান (৪৮), যিনি নিয়মিত বুড়িমারী স্থলবন্দরে পণ্য পরিবহন করেন। ‘এছাড়া মহাসড়কটির বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দ ও কার্পেটিং টিউমার রয়েছে। এটা সারাবছরই দেখছি। ৩০-৩৫ কিলোমিটা বেগে ট্রাক চালাই তবুও দূর্ঘটনার কবলে পড়তে হয়,’ তিনি বলেন।
“পুরো সড়ক পাড়ি দিতে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা সময় লাগে। এতগুলো বাঁক ও রেলক্রসিং না থাকলে অন্তত এক ঘণ্টা সময় বাঁচতো,” বলেন বুড়িমারী স্থলবন্দরের ট্রাকচালক জিয়া ইসলাম (৪৫)।
তিনি আরও বলেন, “সংকীর্ণ সড়কে অতিরিক্ত ভারবাহী ট্রাক চালানো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে বিপরীত দিক থেকে দুটি বড় যান একসঙ্গে এলে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে।”
একই উদ্বেগ প্রকাশ করেন নাইটকোচ বাসের চালক সোহাগ ইসলাম (৫০)। ’বাঁক ঘুরতে অনেকসময় গাড়ি উল্টে যায়। গাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এমনকি চালক ও পথচারী ক্ষতিগ্রন্থ হয়,’ তিনি বলেন। ‘দূর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে এই সড়কে গাড়ি চালাতে হয়। বছর বছরধরে মহাসড়কটির বেহালদশা দেখছি কিন্তু সওজ কর্তৃপক্ষ কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না,’ তিনি বলেন।
বুড়িমারী স্থলবন্দরের পরিবহন শ্রমিক মমিনুল ইসলাম জানান, ‘পরিবহন শ্রমিকেরা দীর্ঘদিন ধরে এ মহাসড়কটি বিস্তৃত ও আধুনিকীকরণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু যতদিন পর্যন্ত কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হবে, ততদিন পর্যন্ত লালমনিরহাট–বুড়িমারী মহাসড়ক উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে একটি ভয়ঙ্কর মৃত্যু ফাঁদ হিসেবেই থেকে যাবে।’
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
লালমনিরহাট সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) মোজাম্মেল হক জানান, “দেশের অন্য কোনো মহাসড়কে এত বেশি বাঁক ও রেলওয়ে লেভেল ক্রসিং নেই। নকশাগতভাবে এটি অন্যান্য মহাসড়কের তুলনায় অনেক বেশি সংকীর্ণ। তাই এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ মহাসড়কে প্রতিনিয়ত সড়ক দূর্ঘটনার ঘটনা ঘটছে। অনেক দূর্ঘটনায় প্রাণহানি হচ্ছে। আহত হচ্ছে মানুষজন। গাড়ি উল্টে যাওয়ার ঘটনা প্রতিদিনের।’ ‘প্রকল্প গ্রহন ছাড়া এই মহাসড়কের সমস্যা সমাধান করা যাবে না। আপাতত সড়কের ওপর খানাখন্দ ও কার্পেটিং টিউমার সংস্কার করা জরুরী হয়ে পড়েছে। এজন্য বরাদ্দ চেয়েছি কিন্তু এখনো তা পাইনি,’ তিনি বলেন।



