রেবেকা-রুবায়েতের যোগসাজশে রেলওয়ে স্কুলের লাখ লাখ টাকা লোপাট

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের সিআরবি কার্যালয়ের ওয়েলফেয়ার ইন্সপেক্টর (পূর্ব) রুবায়েতের পেশাগত দায়িত্ব পালন, পরীক্ষা চলাকালীন বিদ্যালয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ এবং পরিদর্শন প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপনের অভিযোগে তোলপাড় শুরু হয়েছে। পাহাড়তলী বাংলাদেশ রেলওয়ে উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ রোকনুজ্জামানের করা একটি লিখিত অভিযোগে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যগুলো সামনে এসেছে। এতে একদিকে যেমন দায়িত্ব পালনে অসদাচরণের প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে বিদ্যালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রেবেকা সুলতানার বিরুদ্ধে লক্ষাধিক টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে।

গার্ডেন পোর্ট্রেট ডুও

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ অক্টোবর ২০২৬ থেকে প্রতিষ্ঠানটিতে এসএসসি পরীক্ষা ২০২৭-এর নির্বাচনী পরীক্ষা শুরু হয়। ওই দিন পরীক্ষা শুরুর প্রায় এক ঘণ্টা পর কোনো পূর্বানুমতি, লিখিত চিঠি কিংবা আনুষ্ঠানিক নোটিশ ছাড়াই আকস্মিকভাবে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন ওয়েলফেয়ার ইন্সপেক্টর রুবায়েত। এ সময় নতুন ভবনের ৩০১ নম্বর কক্ষ থেকে প্রধান শিক্ষককে ডেকে এনে তদন্তের কথা বলে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও হেনস্তা করা হয়, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষার সময়কালে চরম পেশাগত শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই পরদিন ২৭ অক্টোবরও পরীক্ষা চলাকালীন নির্ধারিত সময়ের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট পরে আবারও বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন সেই পরিদর্শক। প্রধান শিক্ষকের কক্ষে ঢুকে পুনরায় তদন্তের অজুহাতে নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করার মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রমে অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরীক্ষার মতো একটি সংবেদনশীল সময়ে পূর্বানুমতি ছাড়া এ ধরনের বারবার আকস্মিক পরিদর্শন ও জিজ্ঞাসাবাদের যৌক্তিকতা নিয়ে এখন গভীর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

শুধু জিজ্ঞাসাবাদের আতিশয্যই নয়, গত ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে পাহাড়তলী বাংলাদেশ রেলওয়ে উচ্চ বিদ্যালয় পরিদর্শনের সময় তৈরিকৃত প্রতিবেদনেও তথ্য গোপনের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন প্রধান শিক্ষক। নিয়ম অনুযায়ী ওই দিন বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিদ্যালয়ের পরীক্ষা ও নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম চলমান থাকলেও, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে কেবল প্রাথমিক শাখার পরীক্ষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পূর্ণকালীন ক্লাস চালুর বাস্তব চিত্র ওই প্রতিবেদনে সচেতনভাবেই বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগের সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিকটি হলো বিদ্যালয়ের আর্থিক তহবিল তছরুপের বিষয়টি। সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রেবেকা সুলতানা দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন খাতের অর্থ নিয়মবহির্ভূতভাবে স্থানান্তর করেন এবং বিদ্যালয়ের দরিদ্র তহবিল থেকে প্রায় ৫৫ হাজার ও খণ্ডকালীন শিক্ষক তহবিল থেকে প্রায় ৫০ হাজার টাকাসহ ব্যাংক হিসাব থেকে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব অর্থ এখনও বিদ্যালয় তহবিলে ফেরত দেওয়া হয়নি এবং বিষয়টি একাধিকবার ওয়েলফেয়ার ইন্সপেক্টর রুবায়েতকে মৌখিকভাবে জানানো হলেও তিনি রহস্যজনক কারণে কোনো কার্যকর প্রতিবেদন দেননি।

আর্থিক অনিয়মের এত বড় অভিযোগ জানার পরও কেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হলো না, তা নিয়ে ওয়েলফেয়ার ইন্সপেক্টর রুবায়েতের ভূমিকা এখন সন্দেহের ডায়েরিতে। এমনকি সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রেবেকা সুলতানার সঙ্গে এই পরিদর্শকের গোপন কোনো যোগসাজশ রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখার জোর দাবি জানিয়েছেন বর্তমান প্রধান শিক্ষক। রেলওয়ের মতো একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের অধীনস্থ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে অনতিবিলম্বে ঘটনার সঠিক তদন্ত এবং আত্মসাৎকৃত অর্থ ফেরত পাওয়ার দাবি জোরালো হয়েছে।

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

এদিকে পুরো বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে অভিযুক্ত ওয়েলফেয়ার ইন্সপেক্টর রুবায়েত হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করার পরামর্শ দিয়ে তিনি জানান যে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া এ বিষয়ে তাঁর পক্ষে গণমাধ্যমে মুখ খোলা বা কিছু বলা নিয়মবহির্ভূত। অন্যদিকে, অভিযুক্ত সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রেবেকা সুলতানার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি এবং হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তারও কোনো সাড়া দেননি। পাশাপাশি রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মামুনুল ইসলাম পিইঞ্জের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকেও কোনো সাড়া মেলেনি।

Scroll to Top