দীর্ঘ ২৩ মাস বন্ধ থাকার পর দ্বিগুণ দামে গ্যাস কিনে উৎপাদনে ফেরানো হয়েছিল দেশের অন্যতম বৃহৎ ইউরিয়া উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (জেএফসিএল)। দৈনিক ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন উৎপাদন সক্ষমতাসম্পন্ন এ কারখানায় টেকসই উৎপাদনের আশ্বাস দেওয়া হলেও এক মাস না পেরোতেই গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় আবারও বন্ধ হয়ে গেছে নিয়মিত উৎপাদন।
সোমবার ২৩ ফেব্রুয়ারি এর প্রকাশিত প্রতিবেদনে জামালপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইলসহ উত্তরবঙ্গের ১৯ জেলার কৃষকের সার সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বাড়ছে আমদানি নির্ভরতার ঝুঁকি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) নিয়ন্ত্রণাধীন এ কারখানায় গত ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ গ্যাস সংযোগ দেয় তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড। কিন্তু ২২ জানুয়ারি গ্যাসের চাপ ৮ কেজিতে নেমে গেলে বয়লার স্ট্রিপ করে উৎপাদন সাময়িক বন্ধ করা হয়। পরে ১৫ ফেব্রুয়ারি চাপ আরও কমে ৫ দশমিক ২ কেজিতে নামলে পুরো কারখানাই অচল হয়ে পড়ে।
কারখানার জিএম (অপারেশন) মো. ফজলুল হক জানান, ১৫ ফেব্রুয়ারি গ্যাসের চাপ ৫ দশমিক ২ কেজিতে নেমে এলে উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হই। ১৭ ফেব্রুয়ারি তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, রমজান মাসে কারখানায় গ্যাস সরবরাহ সম্ভব নয়। কবে নাগাদ উৎপাদন স্বাভাবিক হবে—এ বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি তিনি। তবে কারখানার উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, গ্যাস সরবরাহ পুনরায় চালু হলে দ্রুত উৎপাদনে ফেরার সক্ষমতা রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গ্যাসের স্বল্পচাপের মধ্যেও কারখানাটির দৈনিক গড় উৎপাদন ছিল ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন। সে হিসাবে এক মাস (৩০ দিন) চালু থাকলে সম্ভাব্য উৎপাদন হতো ৩৬ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া। এই পরিমাণ সার আমদানি করতে হলে প্রতি টন ৮৮ হাজার টাকা হিসাবে ব্যয় হবে প্রায় ৩১৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অথচ স্থানীয়ভাবে একই পরিমাণ সার উৎপাদনে খরচ হতো প্রায় ৭৯ কোটি ২০ লাখ টাকা (প্রতি টন ২২ হাজার টাকা হিসাবে)। অর্থাৎ এক মাস উৎপাদন বন্ধ থাকলে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২৩৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বাড়তি ব্যয় সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার এসোসিয়েশন (বিএফএ) জামালপুর জেলা শাখার সাবেক সভাপতি চান মিয়া চানু বলেন, লাভজনক যমুনা সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ হলে সরকার নির্ধারিত মূল্যে কৃষকদের কাছে সার সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়বে। যমুনার সার গুণগত মানে ভালো, তাই কৃষকের চাহিদাও বেশি। উৎপাদন বন্ধ মানেই আমদানির ওপর নির্ভরতা।
বিএফএ রাজশাহী জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম সরদার বলেন, যমুনা কারখানার উৎপাদিত সার উন্নতমানের হওয়ায় কৃষকের চাহিদা বেশি। উৎপাদন বন্ধ মানেই বাজারে চাপ তৈরি হওয়া। অতীতে আমদানি করা সার নিয়ে মান ও দামের অভিযোগ ছিল, কৃষক যেন আবার ক্ষতিগ্রস্ত না হন। কারখানা সূত্র জানায়, রমজান মাসে গ্যাস সরবরাহ সম্ভব নয় বলে তিতাস কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে—দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা ছাড়া কেন উৎপাদন শুরু করা হলো?
শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা ও নীতিগত অস্থিরতার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বারবার বিপর্যস্ত হচ্ছে। দ্বিগুণ দামে গ্যাস কিনেও যদি টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করা না যায়, তবে তা কেবল আর্থিক নয়, নীতিগত ব্যর্থতারও ইঙ্গিত দেয়। দৈনিক ১ হাজার ২০০ টন উৎপাদন সক্ষম একটি কারখানা বন্ধ থাকা মানে শুধু রাজস্ব ক্ষতি নয়—কৃষি উৎপাদন, বাজার স্থিতি ও জাতীয় অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ। দ্রুত কার্যকর সমাধান না এলে এর প্রভাব পড়তে পারে কৃষিখাত ও বৈদেশিক মুদ্রা ভাণ্ডারে—এমন আশঙ্কাই এখন শিল্প ও কৃষি মহলে।




