মানুষ সাধারণত এমনভাবে জীবনযাপন করে, যেন সে চিরকাল বেঁচে থাকবে। ভবিষ্যতের পরিকল্পনা, সম্পদের হিসাব, স্বপ্নের বিস্তার—সবকিছুর ব্যস্ততায় সে অনিবার্য একটি সত্যকে ভুলে যায়; আর তা হলো মৃত্যু।
মৃত্যু কোনো গল্প বা দূরবর্তী সম্ভাবনা নয়। এটি এমন এক বাস্তবতা, যা প্রতিনিয়ত আমাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাই প্রতিটি মুমিনের উচিত মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করা। কেননা মৃত্যুর স্মরণ কেবল আখেরাতের প্রস্তুতিই নয়; দুনিয়ার জীবনকেও সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও অর্থবহ করে তোলে।
১. পাপ থেকে দূরে রাখে
মানুষ দুনিয়ার মোহে পড়ে অনেক সময় পাপে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু যখন তার মনে জাগে যে আজকের দিনটিই হয়তো জীবনের শেষ দিন, তখন পাপের আকর্ষণ অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়।
আল্লাহ-তাআলা বলেন, “প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮৫)
এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে দুনিয়ার সব ভোগ-বিলাস ক্ষণস্থায়ী, আর আসল প্রতিদান চিরস্থায়ী। ফলে মৃত্যুচিন্তা মানুষকে পাপ থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে।
২. দুনিয়ার মোহ ভেঙে দেয়
মানুষের অধিকাংশ দুশ্চিন্তা আবর্তিত হয় সম্পদ, পদমর্যাদা ও সম্মানকে ঘিরে। কিন্তু মৃত্যুর কথা মনে হলে সে উপলব্ধি করে, আজ যা নিজের বলে মনে হচ্ছে, কাল তা অন্যের হাতে চলে যাবে আর তার চূড়ান্ত ঠিকানা হবে নিঃসঙ্গ কবর।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমরা দুনিয়ার ভোগ-বিলাস বিনষ্টকারী তথা মৃত্যুকে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩০৭)
মৃত্যুর স্মরণ মানুষকে দুনিয়ার প্রতি অতি-আসক্তি থেকে দূরে রাখে এবং তাকে আখিরাতমুখী করে তোলে।
৩. সময়ের মূল্য উপলব্ধি করায়
মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো সময়। অর্থ বা সম্পদ হারালে তা আবার ফিরে পাওয়া সম্ভব, কিন্তু জীবনের একটি মুহূর্ত চলে গেলে তা আর ফিরে আসে না। মৃত্যুর স্মরণ মানুষকে এই সত্য গভীরভাবে উপলব্ধি করায়।
তাবেয়ি হাসান বসরি (রহ.) বলেছেন, “হে আদম সন্তান, তুমি তো কয়েকটি দিনের সমষ্টি। একটি দিন চলে গেলে তোমার জীবনের একটি অংশও চলে যায়।” (হিলয়াতুল আওলিয়া ওয়া তাবাকাতুল আসফিয়া: ২/১৪৮)
যে ব্যক্তি সর্বদা মৃত্যুকে স্মরণ করে, সে অযথা সময় নষ্ট করে না; বরং প্রতিটি মূহুর্তকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে।
৪. অহমিকা দূর করে
অহমিকা মানুষের হৃদয়ের ধ্বংসাত্মক ব্যাধিগুলোর অন্যতম। এটি মানুষকে সত্য গ্রহণে বাধা দেয় এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হয়।
নবীজি (সা.) বলেছেন, “যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯১)
মৃত্যুর স্মরণ মানুষকে তার প্রকৃত অবস্থান মনে করিয়ে দেয়। যে ব্যক্তি আজ সম্পদ, ক্ষমতা বা মর্যাদা নিয়ে গর্ব করছে, একদিন তাকেও মাটির নিচে শায়িত হতে হবে। এই বাস্তবতা হৃদয়ের অহংকার ভেঙে দেয় এবং মানুষকে বিনয়ী করে তোলে।
৫. আখিরাতের প্রস্তুতির দিকে ধাবিত করে
মৃত্যুকে স্মরণের সবচেয়ে বড় উপকারিতা হলো, এটি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। সে বুঝতে পারে, দুনিয়া আসল গন্তব্য নয়; বরং এটি আখিরাতের প্রস্তুতির ক্ষেত্র মাত্র।
নবীজি (সা.) বলেছেন, “বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসের হিসাব নেয় এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য আমল করে।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৫৯)
অর্থাৎ প্রকৃত মুমিনের কাজ কেবল ইবাদত নয়; আত্মসমালোচনাও। তিনি নিজেকে বারবার প্রশ্ন করেন, আমার জীবনের আসল লক্ষ্য কী? আমি কি সে লক্ষ্যেই অগ্রসর হচ্ছি? আমার আমল কি রবের সন্তুষ্টির জন্য যথেষ্ট হচ্ছে?
রায়হান আল ইমরান: লেখক ও গবেষক



