মুসলিম সমাজে আতিথেয়তার বিকাশ
খেলাফত আমল থেকে শুরু করে ওসমানিয়া সাম্রাজ্য, মুঘল আমল এবং আন্দালুসের মুসলিম সমাজে অতিথি আপ্যায়ন শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিল। তৎকালীন মুসলিম শাসকেরা এবং সাধারণ মানুষ মেহমানদারির জন্য বিশেষ অবকাঠামো গড়ে তুলেছিলেন। (টমাস আর. আর্নল্ড, দ্য স্প্রেড অব ইসলাম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড, পৃষ্ঠা ৮৫, গুড প্রেস, লন্ডন, ১৯১৩)
১. অতিথিশালা: বাগদাদ, দামেস্ক, কায়রো ও ইস্তাম্বুলের মতো প্রধান শহরগুলোতে শাসক ও ওয়াকফ বোর্ডের অর্থায়নে বিশাল সব অতিথিশালা বা সরাইখানা নির্মিত হতো; যাকে বলা হতো দারুল জিয়াফাত।
সেখানে দূরদূরান্ত থেকে আগত পথচারী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও দরিদ্র মেহমানরা বিনামূল্যে তিনবেলা খাবার এবং থাকার জায়গার ব্যবস্থা পেতেন। (তাকিউদ্দিন মাকরিজি, আল-মাওয়াইজ ওয়াল-ইবার ফি জিকরি খিতাতি ওয়াল-আসার, ২/৪১৫, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, বৈরুত, ১৯৯৮)
ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদহীন এই প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল মুসলিম সমাজের সাম্য ও কল্যাণের প্রতীক।
২. সুফি সংস্কৃতির লঙ্গরখানা: সুফি সাধকদের খানকাহ ও দরগাগুলো অতিথি আপ্যায়নের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। যেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষের জন্য ‘লঙ্গরখানা’ বা উন্মুক্ত ভোজের ব্যবস্থা থাকত। সেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণনির্বিশেষে যে কেউ গিয়ে খাবার গ্রহণ করতে পারত।
এই ধারাবাহিকতা আজও উপমহাদেশেরবিভিন্ন মাঝার ও খানকায় চোখে পড়ে। (আলি ইবনে ওসমান আল-হুজুইরি, কাশফুল মাহজুব, পৃষ্ঠা ১২৫, জিয়া পাবলিকেশন্স, লাহোর, ১৯৮৮)
অতিথি আপ্যায়নের শিষ্টাচার
মুসলিম সভ্যতায় অতিথি আপ্যায়নের ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট আদব রয়েছে, যা মেজবান ও মেহমান উভয়ের জন্য প্রযোজ্য। এগুলো সমাজকে শৃঙ্খলিত ও সৌহার্দ্যপূর্ণ রাখে। (কাজি আয়াজ, শিফা শরিফ, ১/২১০, দারুল ফিকর, বৈরুত, ২০০১)
মেজবানের শিষ্টাচার
১. আন্তরিক হাসি: মেহমান ঘরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই হাসিমুখে তাঁকে স্বাগত জানানো এবং বসার জন্য সুন্দর ও আরামদায়ক স্থান নির্বাচন করা।
২. বিলম্ব না করে আপ্যায়ন: অতিথি আসার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ক্লান্তি দূর করার জন্য পানি এবং সাধ্যমতো খাবার বা নাস্তা পরিবেশন করা। মুঘল ও মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতিতে গোলাপজল ছিটিয়ে এবং সুগন্ধি বা ধূপ জ্বেলে মেহমানকে বরণ করার রেওয়াজ ছিল। (আবুল ফজল, আইন-ই আকবরি, ১/২৭০, এশিয়াটিক সোসাইটি, ক্যালকাটা, ১৮৭৩)
৩. কৃত্রিমতা বর্জন করা: অতিরিক্ত লৌকিকতা বা কৃত্রিম আড়ম্বর দেখিয়ে মেহমানকে বিব্রত না করা। আলী (রা.) বলেন, নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে মেহমানের জন্য অতিরিক্ত কষ্ট করা উচিত নয়; যা ঘরে আছে, তা-ই হাসিমুখে পরিবেশন করা আদর্শ মেজবানের লক্ষণ। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১২৫০)
৪. শেষ পর্যন্ত সঙ্গ দেওয়া: মেহমান খাবার গ্রহণের সময় মেজবানের উচিত নিজে উপস্থিত থাকা এবং মেহমান যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে খেতে পারেন, সেদিকে খেয়াল রাখা। আর বিদায় দেওয়ার সময় ঘরের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেওয়া।

