গত ১৬ই এপ্রিল সকালে ফ্লোরিডা থেকে নিখোঁজ হওয়া ২৭ বছর বয়সী দুই বাংলাদেশী শিক্ষার্থী নাহিদা বৃষ্টি এবং জামিল লিমনের নিখোঁজ রহস্যের জট খুলতে শুরু করেছে। এই ঘটনায় তাদের রুমমেট হিসাম আবুঘারবিয়েহকে ফার্স্ট-ডিগ্রি মার্ডারের অভিযোগে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে ঠান্ডা মাথার খুনের এক ভয়াবহ চিত্র, যেখানে চ্যাটজিপিটির মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে খুনের পরিকল্পনা এবং আলামত লোপাটের চেষ্টা করা হয়েছে।
কোর্টের নথিপত্র অনুযায়ী, ১৬ই এপ্রিল বেলা ১১:৩০ মিনিটে বৃষ্টির সাথে তার এক বন্ধুর শেষ কথা হয়। দুপুর ২:১৪ মিনিটে বৃষ্টি তাকে ফোন করে তার চশমা নিয়ে আসতে বলেন। ওই বন্ধু বিকেল ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষা করলেও বৃষ্টির দেখা পাননি এবং এরপর থেকে বৃষ্টির ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরদিন ১৭ই এপ্রিল বৃষ্টির অন্য এক বন্ধু জামিল লিমনের অ্যাপার্টমেন্টে (১৩৬১২ অ্যাভালন হাইটস বুলেভার্ড) খোঁজ নিতে গেলে জানতে পারেন লিমনও নিখোঁজ। লিমনের স্কুটারটি অ্যাপার্টমেন্টেই পড়ে ছিল।
১৮ই এপ্রিল ইউএসএফ (USF) পুলিশ বৃষ্টির কর্মস্থলে গিয়ে তার ম্যাকবুক, আইপ্যাড ও পার্সসহ প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত জিনিসপত্র উদ্ধার করে। আইপ্যাডের মেসেঞ্জার লোকেশন থেকে দেখা যায়, ১৬ই এপ্রিল দুপুর ১২:৪১-এ বৃষ্টি ফ্লেচার অ্যাভিনিউয়ের কাছে ছিলেন। সিসিটিভি ফুটেজেও তাকে ১২:০৮-এ ছাতা মাথায় দিয়ে অফিস থেকে বের হতে দেখা যায়।
পুলিশ লিমনের রুমমেট হিসাম আবুঘারবিয়েহকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে কিছু জানে না বলে দাবি করে। তবে একজন ডিটেকটিভ লক্ষ্য করেন হিসামের বাম হাতের কনিষ্ঠা আঙুলে ব্যান্ডেজ এবং একটি তাজা ক্ষত। হিসাম দাবি করে, পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে তার হাত কেটে গেছে, যদিও সে কী রান্না করছিল তা বলতে পারেনি।
পুলিশ হিসামের সাদা হুন্ডাই জেনেসিস গাড়ির মুভমেন্ট ট্র্যাক করে দেখে যে, লিমনের ফোনের লোকেশন যেখানে যেখানে পিং হয়েছিল (কোর্টনি ক্যাম্পবেল ও ক্লিয়ারওয়াটার বিচ), হিসামের গাড়িও ঠিক একই সময়ে সেসব জায়গায় অবস্থান করছিল।
তদন্তের এক পর্যায়ে পুলিশ অ্যাপার্টমেন্টের ডাম্পস্টারে তল্লাশি চালিয়ে লিমনের ব্যক্তিগত ওয়ালেট, আইডি কার্ড, রক্তমাখা টি-শার্ট, হাফপ্যান্ট এবং বৃষ্টির আইফোন কেস উদ্ধার করে। লিমনের কক্ষ থেকে নিখোঁজ হওয়া একটি রক্তমাখা কিচেন ম্যাটও সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়। ফরেনসিক রিপোর্টে দেখা যায়, কিচেন ম্যাটের রক্ত বৃষ্টির এবং টি-শার্টের রক্ত লিমনের ডিএনএর সাথে মিলে গেছে।
পুলিশ যখন অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে লুমিনল টেস্ট করে, তখন কিচেন থেকে শুরু করে হলওয়ে হয়ে হিসামের বেডরুম পর্যন্ত রক্তের একটি দীর্ঘ রেখা দেখতে পায়। হিসামের বেডরুমের কার্পেটের নিচে মানুষের শরীরের আকৃতির দুটি রক্তের প্যাটার্ন পাওয়া যায়, যা পরিষ্কার করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
চ্যাটজিপিটিতে খুনের পরিকল্পনা ও অনুসন্ধান
ডিটেকটিভরা হিসামের ফোনের ফরেনসিক রিপোর্ট থেকে জানতে পারেন যে, সে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই অপরাধ করেছে। তার ফোনের সার্চ হিস্ট্রি থেকে পাওয়া তথ্যগুলো রীতিমতো পিলে চমকানো:
-
৭ এপ্রিল: অ্যামাজন থেকে ডাক্ট টেপ অর্ডার।
-
১১ এপ্রিল: ফায়ার স্টার্টার, চারকোল এবং ট্র্যাশ ব্যাগ অর্ডার।
-
১৩ এপ্রিল: চ্যাটজিপিটিকে প্রশ্ন করে— “যদি কাউকে কালো ট্র্যাশ ব্যাগে ভরে ডাম্পস্টারে ফেলা হয়, তবে কী হবে?” চ্যাটজিপিটি একে বিপজ্জনক বললে সে পাল্টা প্রশ্ন করে— “তারা তাকে কীভাবে খুঁজে পাবে?”
-
১৫ এপ্রিল: অ্যামাজন থেকে একটি ‘নকল দাড়ি’ (fake beard) কেনা হয়।
-
১৭ ও ১৯ এপ্রিল: চ্যাটজিপিটিতে সার্চ করা হয়— “মাথায় স্নাইপারের গুলি খেয়ে কি কেউ বাঁচে?”, “প্রতিবেশীরা কি আমার বন্দুকের শব্দ শুনতে পাবে?”, এবং “নতুন আইফোন ব্যবহারকারীকে কি অ্যাপল ট্র্যাক করতে পারে?”
-
২৩ এপ্রিল: সার্চ করা হয়— “missing endangered adult” বলতে কী বোঝায়।
গত ২৪শে এপ্রিল ডিটেকটিভরা একটি ব্রিজের নিচ থেকে একটি কালো হেভি-ডিউটি ট্র্যাশ ব্যাগ উদ্ধার করেন, যা থেকে পচা লাশের গন্ধ আসছিল। পরে নিশ্চিত হওয়া যায় যে সেটি জামিল লিমনের মরদেহ। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী, লিমনের শরীরে অসংখ্য ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল এবং তার হাত-পা বাঁধা ছিল। তার পিঠের নিচের দিকের একটি ক্ষত প্রায় ১০ সেন্টিমিটার গভীর ছিল যা লিভার পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল।
নাহিদা বৃষ্টির কোনো হদিস এখনো পাওয়া যায়নি। তবে কোর্টের নথিপত্র বলছে, বৃষ্টির বেঁচে থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ধারণা করা হচ্ছে, তাকেও হত্যা করে কোনো গোপন স্থানে ফেলে রাখা হয়েছে।
অভিযুক্ত হিসাম আবুঘারবিয়েহকে শুক্রবার গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ফার্স্ট-ডিগ্রি মার্ডারের দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। বর্তমানে সে বিনাজামিনে কারাগারে রয়েছে এবং আগামী মঙ্গলবার তাকে আবারও আদালতে হাজির করা হবে।
নিহত ও নিখোঁজ শিক্ষার্থীদের পরিবারের মাঝে এই ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাংলাদেশী কমিউনিটি এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছে।




