মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনায় আতঙ্কে প্রবাসীরা, ফ্লাইট বাতিলে ওমরাহ যাত্রীরা বিপাকে | চ্যানেল আই অনলাইন

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনায় আতঙ্কে প্রবাসীরা, ফ্লাইট বাতিলে ওমরাহ যাত্রীরা বিপাকে | চ্যানেল আই অনলাইন

ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে হামলাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সামরিক উত্তেজনা শুরু হয়েছে। ইরানের পাল্টা হামলাকে কেন্দ্র করে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পুরো অঞ্চলে। ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় পর উপসাগরীয় দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারে নিরাপত্তা সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে। ওইসব দেশে কর্মরত আছেন বহু বাংলাদেশি প্রবাসী, তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। একই সঙ্গে পবিত্র রমজান মাসে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে গিয়ে ফ্লাইট বাতিল ও শিডিউল জটিলতায় আটকে পড়েছেন অনেক বাংলাদেশি হজযাত্রী।

প্রবাসী বাংলাদেশি ও ট্রাভেল এজেন্সি সূত্রে জানা গেছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে কয়েকটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সময়সূচি পরিবর্তন বা বাতিল করা হয়েছে। ফলে ওমরাহ করতে গিয়ে মক্কা ও মদিনায় অবস্থানরত অনেক বাংলাদেশি নির্ধারিত সময়ে দেশে ফিরতে পারছেন না। অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত শ্রমিক ও পেশাজীবীরা নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।

সৌদি আরবে কর্মরত ইঞ্জিনিয়ার ফরহাদ হোসেন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে ইরান হামলা করেছে তারমধ্যে তুলনামূলক নিরাপদ সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা ও দূতাবাস এলাকায় হামলা হয়েছে, মাঝে মাঝে সাইরেনের শব্দ কিছুটা আতঙ্ক বাড়াচ্ছে। এছাড়া জনজীবন মোটামুটি স্বাভাবিক।

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনায় আতঙ্কে প্রবাসীরা, ফ্লাইট বাতিলে ওমরাহ যাত্রীরা বিপাকে | চ্যানেল আই অনলাইন
ইরানের হামলার পরে দুবাইয়ে একটি ভবন থেকে ধোঁয়া

বাহরাইনে একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মো. শাহীন মিয়া চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘আমাদের এখানে এক প্রবাসী বাংলাদেশি ভাই কর্মরত অবস্থায় নিহত হয়েছেন। গত কয়েক দিন ধরে এখানে সবাই খুব সতর্ক অবস্থায় আছি। টেলিভিশন ও মোবাইলের খবর দেখলেই বোঝা যায় পরিস্থিতি ভালো না। আমরা কাজ করছি ঠিকই, কিন্তু ভেতরে একটা ভয় কাজ করছে—যদি পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়!’

এখানকার পরিস্থিতি ও হামলার ছবি তোলা ও ভিডিও করা নিয়ে কিছু বিধি নিষেধ আছে বলেও জানান তিনি।
দুবাইয়ে একটি শপিং মলে কর্মরত নোয়াখালীর বাসিন্দা রাশেদ আহমেদ বলেন, ‘প্রায় ৬ বছর হলো দুবাইতে আছি, এমন আতঙ্ক ও ভয়ের পরিস্থিতি আগে দেখি নাই। হামলার আগে সাইরেনের শব্দ সবার মনে ভয় বাড়িয়ে দেয়। অনেকে খাবারসহ জরুরি কিছু জিনিস কিনে স্টক করছে। পরিচিত অনেককে হোম অফিস করতে দেখেছি। আমাদের মলেও ক্রেতার ভিড় একেবারে নেই বললেই চলে।’

ইরানের হামলায় কাতারের একটি সড়কের পাশে স্থাপনার চিত্র

প্রবাসী বাংলাদেশি সংগঠনগুলোর কয়েকজন প্রতিনিধি জানিয়েছেন, এই সংঘাতের প্রেক্ষাপটে উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে পরিবারগুলোর উদ্বেগ বেড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে কর্মস্থলে নিরাপত্তা নির্দেশনা জোরদার করা হয়েছে বলেও তারা জানিয়েছেন। দূতাবাসগুলোর পক্ষ থেকে হটলাইন খোলা হয়েছে, দূতাবাস থেকে কমিউনিটিতে মাঝে মাঝে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে বলেও তারা উল্লেখ করেন।

ইরানের হামলায় এখন পর্যন্ত বাহরাইন ও দুবাইয়ে দু’জন প্রবাসী বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।

ওমরাহ শেষে আটকা পড়েছেন সিরাজগঞ্জের বাসিন্দা আবুল হোসেন

পবিত্র রমজান মাসে ওমরাহ করতে গিয়ে সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মধ্যে অনেকেই এখন বিপাকে পড়েছেন। ফ্লাইটের সময়সূচি পরিবর্তন বা বাতিল হওয়ায় তাদের নির্ধারিত সময়ে দেশে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

ওমরাহ যাত্রী সিরাজগঞ্জের বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, ‘আমাদের প্যাকেজ অনুযায়ী থাকার সময় শেষ হয়ে গেছে, ১ মার্চ দেশে ফেরার কথা ছিল । এখন বাড়তি দিন থাকলে অতিরিক্ত খরচ দিতে হচ্ছে। অনেকের জন্য এটা কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রবাসী ভাইয়েরা অনেক সাহায্য করছেন, ওমরাহ শেষে সৌদির বিভিন্ন এলাকায় তাদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাত করে সময় কাটছে।’

ওমরাহ হজ শেষে বর্তমানে মদিনায় অবস্থানরত ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা কাওসার মজুমদার চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘আমাদের ফেরার ফ্লাইট ছিল ৩ মার্চ। পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইট স্থগিত হয়েছে। এখন হোটেলে থাকতে হচ্ছে এবং প্রতিদিন প্রায় ২৩০ রিয়াল বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে। আল্লাহর অশেষ রহমতে আগামী ৯ মার্চের একটা ফ্লাইটে টিকিট পেয়েছি।

ওমরাহ শেষে আটকা পড়েছেন মিরপুরের বাসিন্দা কাওসার মজুমদার, প্রতিদিন বাড়তি টাকা খরচ করে আছেন মদিনাতে

ঢাকার একটি ট্রাভেল এজেন্সির কর্মকর্তা সৈয়দ শহীদুল ইসলাম আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের পরিবর্তিত সময়সূচি বিষয়ে বলেন, ‘সব ফ্লাইট বন্ধ হয়নি, কিন্তু কিছু ফ্লাইটে বিলম্ব হচ্ছে বা পুনঃনির্ধারণ করা হচ্ছে। এতে ওমরাহ যাত্রীদের মধ্যে অনেকে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি দিন থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। আমরা চেষ্টা করছি বিষয়গুলো সামাল দেওয়ার। রোজার মাসে যেহেতু ওমরাহ করার প্রবণতা বেশি, সেজন্য চাপও একটু বেশি।’

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সামরিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে কাজ করা বিপুল সংখ্যক বিদেশি শ্রমিক ও প্রবাসীদের জীবনযাত্রায় তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনেও। প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের উদ্বেগ এবং ওমরাহ যাত্রীদের দুর্ভোগ সেই বাস্তবতারই একটি প্রতিচ্ছবি। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসার অপেক্ষায় আছেন সংশ্লিষ্ট সবাই।

Scroll to Top