ভালোবাসায় ভাসছেন শাহীনুর আলম মারফত—বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরল এক দৃশ্য

জাহিদ ইকবাল : খিলক্ষেতের রাজনীতিতে শাহীনুর আলম মারফত একটি পরিচিত নাম। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় তিনি খিলক্ষেত থানা বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজনীতির দুঃসময়ে তাঁর ভূমিকা ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কথা এখনো স্মরণ করেন তাঁর সহযোদ্ধারা।

আজ সেই শাহীনুর আলম মারফতই কথিত চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন।

খবরটি প্রকাশের পর থেকেই বিষয়টি খিলক্ষেতের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আমার জানামতে, আজকের এই ঘটনা এখন খিলক্ষেতের টক অব দ্য এরিয়া।

কিন্তু এই আলোচনার সবচেয়ে লক্ষণীয় দিকটি অন্য জায়গায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খিলক্ষেতভিত্তিক বিভিন্ন প্রোফাইল, পেজ ও গ্রুপের প্রতিক্রিয়া যতটা চোখে পড়েছে, সেখানে শাহীনুর আলম মারফতের বিরুদ্ধে নেতিবাচক মন্তব্যের চেয়ে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও আস্থার প্রকাশই বেশি দৃশ্যমান।

আমার নিজের পর্যবেক্ষণ থেকে বলতে দ্বিধা নেই—এমন একটি পরিস্থিতি বাংলাদেশের স্থানীয় রাজনীতিতে নিঃসন্দেহে বিরল।

আমি বরং চ্যালেঞ্জ নিয়েই কথাটি বলছি—খিলক্ষেতভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার একটি বিশ্বাসযোগ্য উদাহরণ থাকলে সেটি সামনে আনা হোক।

কারণ আমার চোখে পড়া প্রতিক্রিয়াগুলোর বড় অংশজুড়েই ছিল—
শ্রদ্ধা।
ভালোবাসা।
আক্ষেপ।
সহমর্মিতা।
আর একজন পরিচিত রাজনৈতিক মানুষের জন্য গভীর উদ্বেগ।

একটি অভিযোগ কি মুছে দিতে পারে একটি মানুষের বহু বছরের পরিচয়?

শাহীনুর আলম মারফতের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, সেটি গুরুতর। অভিযোগের তদন্ত হওয়া উচিত। প্রমাণ থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে—এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে—
অভিযোগ আর অপরাধ এক বিষয় নয়।

একজন মানুষকে গ্রেপ্তার করা একটি আইনি পদক্ষেপ। কিন্তু তিনি চূড়ান্তভাবে অপরাধী কি না, সেটি নির্ধারিত হবে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায়।

সুতরাং তদন্তের আগেই একজন মানুষকে সামাজিকভাবে অপরাধী বানিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই ন্যায়বিচারের পথ হতে পারে না।

শাহীনুর আলম মারফতের ক্ষেত্রেও তাই প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক।
অভিযোগের ভিত্তি কী?
প্রমাণ কী?
ঘটনার প্রকৃত প্রেক্ষাপট কী?
তাঁর বক্তব্য কী?
এসব প্রশ্নের উত্তর সামনে আসা প্রয়োজন।

রাজনীতির মাঠে প্রতিযোগিতা থাকবে, প্রতিহিংসা নয়

রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবে।
নেতৃত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতা থাকবে।
কে সামনে আসবেন, কে দায়িত্ব পাবেন—এসব নিয়ে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও থাকবে।
কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যেন কখনো ব্যক্তিগত প্রতিহিংসায় পরিণত না হয়, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
কারও রাজনৈতিক উত্থান কারও জন্য অস্বস্তির কারণ হতে পারে—এমন আলোচনা রাজনীতিতে নতুন নয়। কিন্তু সেই অস্বস্তি যদি কোনো মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ তৈরির কারণ হয়ে থাকে, তাহলে সেটি অবশ্যই তদন্তের বিষয়।
আর যদি অভিযোগের পেছনে সত্য থাকে, সেটিও প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।

বিচার হোক প্রমাণে, পরিচয়ে নয়।
চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোরতা চাই—কিন্তু অভিযোগেরও প্রমাণ চাই

চাঁদাবাজি সমাজের জন্য গুরুতর অপরাধ।
প্রকৃত চাঁদাবাজ যে-ই হোক, যে দলেরই হোক, যে পরিচয়েরই হোক—তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
কিন্তু কাউকে চাঁদাবাজ হিসেবে চিহ্নিত করার আগে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ ‘চাঁদাবাজ’ শব্দটি একজন মানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে।
একটি অভিযোগ একজন মানুষের বহু বছরের অর্জিত সম্মানকে মুহূর্তে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিতে পারে।
তাই অভিযোগের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন।

অভিযোগ করা সহজ, প্রমাণ করা কঠিন।

আর ন্যায়বিচারের জায়গায় প্রমাণের বিকল্প কিছু হতে পারে না।
কেন এত মানুষ আজ শাহীনুর আলম মারফতের পাশে?
এই প্রশ্নটিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
যাঁরা দীর্ঘদিন শাহীনুর আলম মারফতের সঙ্গে রাজনীতি করেছেন, তাঁরা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নানা সময়ের সাক্ষী।
কেউ তাঁকে রাজপথে দেখেছেন।
কেউ দুঃসময়ে পাশে পেয়েছেন।
কেউ তাঁর সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ছিলেন।
কেউ ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে চেনেন।
তাঁদের সেই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকেই আজ অনেকেই তাঁর পাশে দাঁড়াচ্ছেন।
তাঁদের বক্তব্যের সারকথা একটাই—
একটি অভিযোগ দিয়ে একজন মানুষের পুরো জীবনকে বিচার করা যাবে না।
এই আবেগকে শুধু রাজনৈতিক সমর্থন হিসেবে দেখলে বিষয়টির মানবিক দিকটি আড়ালে থেকে যায়।
কারণ কঠিন সময়ে মানুষ সাধারণত যার প্রতি আস্থা রাখে, তার পক্ষেই কথা বলে।
শাহীনুর আলম মারফতের দীর্ঘ পথচলাটিও দেখতে হবে

একজন মানুষকে মূল্যায়ন করতে হলে তাঁর জীবনের একটি ঘটনা নয়, পুরো পথচলাকে দেখতে হয়।

শাহীনুর আলম মারফতের ক্ষেত্রেও আজকের ঘটনাটির পাশাপাশি তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, সাংগঠনিক ভূমিকা, সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার বিষয়গুলোও আলোচনায় থাকা প্রয়োজন।

তাঁর সমর্থকেরা তাঁকে পরিচ্ছন্ন রাজনীতির একজন মানুষ হিসেবে দেখেন।
এটি তাঁদের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত মূল্যায়ন।

এই মূল্যায়নের সত্যতাও শেষ পর্যন্ত তাঁর কর্মকাণ্ড ও তথ্য-প্রমাণের মাধ্যমেই যাচাই হবে।

কিন্তু সেই মূল্যায়ন প্রকাশের অধিকার তাঁদের আছে।
একজন মানুষকে সামাজিকভাবে দোষী বানানোর আগে

আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে প্রকৃত অপরাধী কোনোভাবেই রেহাই পাবেন না।

আবার এমন সমাজও চাই না, যেখানে কোনো নিরপরাধ মানুষ রাজনৈতিক বিরোধ, ভুল তথ্য কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের কারণে সামাজিকভাবে দোষী সাব্যস্ত হয়ে যাবেন।

দুই ক্ষেত্রেই একই নীতি প্রযোজ্য—
আইন সবার জন্য সমান হতে হবে।
শাহীনুর আলম মারফতের ক্ষেত্রেও সেই নীতিই প্রযোজ্য।
অভিযোগ থাকলে তদন্ত হোক।
প্রমাণ থাকলে তা সামনে আসুক।
তাঁর বক্তব্যও শোনা হোক।
ন্যায্য আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা হোক।
আর সত্য যা-ই হোক, সেটিই শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হোক।

খিলক্ষেতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া একটি বার্তা বহন করে

আজকের দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের অনুভূতির একটি বড় প্রকাশভূমি।
কোনো রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেখানে সমর্থন যেমন আসে, তেমনি সমালোচনাও আসে।
কিন্তু শাহীনুর আলম মারফতের গ্রেপ্তারের খবরের পর খিলক্ষেতকেন্দ্রিক যেসব প্রতিক্রিয়া আমার চোখে পড়েছে, তার বড় অংশজুড়ে ছিল তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।
কেউ তাঁর রাজনৈতিক অবদানের কথা স্মরণ করেছেন।
কেউ তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা বলেছেন।
কেউ তাঁর গ্রেপ্তারের ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
কেউ আবার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এ দৃশ্য নিঃসন্দেহে ভাবার মতো।

কারণ রাজনৈতিক জীবনে একজন মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো পদ-পদবি নয়—
কঠিন সময়ে মানুষের মনে তাঁর জন্য জায়গা তৈরি হওয়া

শাহীনুর আলম মারফতের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত হোক—এ দাবির সঙ্গে দ্বিমতের কোনো কারণ নেই।
কিন্তু তদন্তের আগেই তাঁকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হোক—এটি মেনে নেওয়া যায় না।

রাজনীতি হোক প্রতিযোগিতার।
প্রতিহিংসার নয়।

আইন হোক সবার জন্য সমান।

প্রমাণ হোক সত্য নির্ধারণের একমাত্র ভিত্তি।

আর একজন মানুষের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয়কে মূল্যায়ন করা হোক তাঁর পুরো পথচলার আলোকে।

আজ খিলক্ষেতের মানুষের যে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে, সেটি অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করে—
শাহীনুর আলম মারফতকে মানুষ শুধু আজকের একটি অভিযোগ দিয়ে চেনে না।
তাঁকে চেনে দীর্ঘদিনের পরিচয়ে।
তাঁকে চেনে রাজনৈতিক পথচলায়।
তাঁকে চেনে ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গা থেকে।
আর সেই কারণেই হয়তো আজও তাঁর কঠিন সময়ে এত মানুষ কথা বলছেন।

শেষ পর্যন্ত সত্য কী, তা তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে।

কিন্তু একজন মানুষের সম্মানহানি যদি কোনো মিথ্যা, ভিত্তিহীন বা বানোয়াট অভিযোগের কারণে হয়ে থাকে, তাহলে সেই সত্যও একদিন সামনে আসা প্রয়োজন।

সত্যকে দীর্ঘদিন আড়াল করে রাখা যায় না।

সময় অনেক প্রশ্নের উত্তর দেয়।

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

আর সেই সময়ের অপেক্ষায় আজকের সবচেয়ে মানবিক দাবি—

শাহীনুর আলম মারফতের বিরুদ্ধে কথিত চাঁদাবাজির মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগে করা এই গ্রেপ্তারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।

আমরা চাই সত্য উদঘাটিত হোক, ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক এবং শাহীনুর আলম মারফতের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের প্রতি যথাযথ সম্মান বজায় থাকুক।

মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা কোনো মামলার কাগজে মুছে ফেলা যায় না। সত্য ও ন্যায়বিচারই শেষ পর্যন্ত কথা বলুক।

লেখক পরিচিতি: সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটি।

Scroll to Top