ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরার ছক কষছেন নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেতারা | চ্যানেল আই অনলাইন

ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরার ছক কষছেন নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেতারা | চ্যানেল আই অনলাইন

মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহ ও দুর্নীতিসহ বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত রাজনৈতিক দল এখন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। কার্যক্রমে নিষিদ্ধ দলটি। ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের পর দলটির নেতৃত্ব স্থানীয় নেতারা প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিভিন্ন দেশে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন।

দলীয়প্রধান শেখ হাসিনাসহ কেন্দ্রীয় অধিকাংশ নেতৃবৃন্দ এখন ভারতে অবস্থান করছেন।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের কলকাতার শপিং মলের ভিড়ঠাসা ফুডকোর্টে, কালো কফি আর ভারতীয় ফাস্টফুডের আড্ডায় বসে নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেতারা নিজেদের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের ছক কষছেন। ভাবছেন, কী করে, কোন উপায়ে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করা যায়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থান তাকে নাটকীয়ভাবে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীরা তার বাসভবনের দিকে এগোতে থাকলে তিনি হেলিকপ্টারে করে ভারত চলে যান। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই আন্দোলনে তার সরকারের দমন-পীড়নে প্রায় ১, ৪০০ মানুষ নিহত হন।

এরপর সহিংসতা ও ক্রমবর্ধমান মামলার মুখে তার দলের হাজারো নেতাকর্মীও দেশ ছাড়েন। শাসনামলের অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে অনেকেই জনরোষ ও আইনি ঝুঁকিতে পড়েন। তাদের মধ্যে ৬০০ জনের বেশি আওয়ামী লীগ নেতা কলকাতায় আশ্রয় নেন, যেখানে তারা তখন থেকে আত্মগোপনে রয়েছেন।

তবে, দলীয় কার্যক্রম ও সংগঠন টিকিয়ে রাখতে ভারতের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত বছরের মে মাসে জনরোষের মুখে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের সব কার্যক্রম স্থগিত করে এবং হত্যা ও দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগে দলটির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার শুরু করে।

শেখ হাসিনার পতনের পর চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলছে। সেই নির্বাচনেও দলটিকে অংশগ্রহণ ও প্রচারণা থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

গত বছরের শেষদিকে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে তার শাসনামলের শেষ পর্যায়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেন।

এরপর থেকে অনেকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ বললেও মানতে নারাজ তিনি। এটিকে ‘মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দেন। বরং ভারত থেকেই প্রকাশ্যে তার প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে আসন্ন নির্বাচন বানচাল করতে হাজারো সমর্থককে সক্রিয় করার চেষ্টাও রয়েছে।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভারতের রাজধানী দিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তায় গোপন অবস্থান থেকে শেখ হাসিনা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা দলীয় বৈঠক করেন এবং বাংলাদেশে থাকা নেতাকর্মীদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তার এই রাজনৈতিক তৎপরতা ভারত সরকারের নজরদারির মধ্যেই চলছে।

গত এক বছরে কলকাতা থেকে সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিসভার সদস্যসহ শীর্ষ নেতাদের নিয়মিত দিল্লিতে ডেকে পাঠানো হয়েছে দলীয় কৌশল নিয়ে আলোচনার জন্য। তাদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন।

তিনি বলেন, “আমাদের নেতা শেখ হাসিনা বাংলাদেশে থাকা আমাদের কর্মী, নেতা ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। তিনি দলকে আসন্ন সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করছেন।”

তিনি আরও বলেন, “কখনো কখনো তিনি দিনে ১৫-১৬ ঘণ্টা কল ও বৈঠকে থাকেন। আমাদের নেত্রী খুবই আশাবাদী যে, তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন। আমরা বিশ্বাস করি শেখ হাসিনা একজন নায়ক হিসেবেই ফিরবেন।”

শেখ হাসিনার আমলে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ দুটি নির্বাচন ব্যাপক ভোট কারচুপির অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হবে এক দশকের মধ্যে দেশের প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন।

আওয়ামী লীগের দাবি, তাদের নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়া হলে গণতান্ত্রিক বৈধতার সব দাবি ভেঙে পড়ে।

শেখ হাসিনার সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, “আমরা আমাদের কর্মীদের বলেছি, এই ভুয়া নির্বাচনে অংশ নেবে না, প্রচারণা করবে না, ভোট দেবে না।”

বাংলাদেশে যারা আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনকে স্বৈরাচারী ও লুটপাটের শাসন হিসেবে দেখেন, তাদের কাছে দলটির হঠাৎ করে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলা প্রবল সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘের বহু বছরের নথিতে দেখা যায়, হাসিনার শাসনামলে বিরোধী মত দমন করা হয়েছে। হাজারো মানুষ গুম, নির্যাতন ও গোপন বন্দিশালায় নিহত হয়েছেন। অনেকেই তার পতনের পর বেরিয়ে আসেন। সংবাদমাধ্যম ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ভেঙে পড়েছিল, আর নির্বাচন ছিল সাজানো নাটক।

তবে নতুন গণতান্ত্রিক পথের প্রতিশ্রুতি দেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারও সমালোচনার বাইরে নয়। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রয়োগ, বাকস্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু সুরক্ষায় ব্যর্থতা এবং আইনশৃঙ্খলার মারাত্মক অবনতি নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ট্রাইব্যুনালও আন্তর্জাতিক মান না মানার অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ।

হাসিনার শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের নামে দেশজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে আওয়ামী লীগের দাবি, তাদের শত শত কর্মী হামলার শিকার হয়েছেন, নিহত হয়েছেন বা জামিন ছাড়া কারাবন্দি হয়েছেন। অনেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন।

ছাত্রলীগ সভাপদি সাদ্দাম বলেন, “আমরা কলকাতায় আছি কারাগারের ভয়ে নয়, আমরা এখানে আছি, কারণ দেশে ফিরলে আমাদের হত্যা করা হবে।”

ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন
কলকাতা ও দিল্লিতে আওয়ামী লীগের সক্রিয় উপস্থিতি ভারতকে ক্রমেই বিব্রতকর প্রশ্নের মুখে ফেলছে। বিশেষ করে কার্যক্রমে নিষিদ্ধ একটি রাজনৈতিক দলকে ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে কার্যক্রম চালাতে দেওয়ার বিষয়টি এবং আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। তবে কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতারা সবাই বলেছেন, ভারত তাদের দেশে ফেরত পাঠাবে—এমন আশা তাদের নেই।

গত সপ্তাহে এই ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন চূড়ান্ত রূপ নেয়, যখন শেখ হাসিনা দিল্লিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে বক্তব্য দেন। তার গোপন আশ্রয়স্থল থেকে ধারণ করা অডিও বার্তায় তিনি আসন্ন নির্বাচনকে নিন্দা জানান এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে ‘জোরপূর্বক ক্ষমতা দখল’ ও বাংলাদেশকে ‘রক্তে ভেজা দেশে’ পরিণত করার অভিযোগ তোলেন।

প্রতিবাদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, “ভারতের রাজধানীতে এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনের সুযোগ দেওয়া এবং গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে ঘৃণামূলক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের প্রতি স্পষ্ট অবমাননা।”

তবে ভারত সরকার এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

সম্প্রতি দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

কলকাতার আরামদায়ক বাসভবনে থাকা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে তাদের শাসনামলে সংঘটিত কথিত মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে অনুশোচনা বা আত্মসমালোচনার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। অধিকাংশই ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থান হিসেবে মানতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এটিকে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেন।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য এ.এফ.এম. বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, “এটা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব ছিল না। এটা ছিল আমাদের গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করার জন্য একটি সন্ত্রাসী দখল।”

কলকাতার উপকণ্ঠে উচ্চ নিরাপত্তা-ঘেরা একটি বিলাসবহুল ভিলায় বসে তিনি এ কথা বলেন।

তার বিরুদ্ধে আনা হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি হেসে বলেন, “ভিত্তিহীন, সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।”

এ পর্যন্ত নির্বাসিত নেতাদের প্রত্যাবর্তন পরিকল্পনা নির্ভর করছে আসন্ন নির্বাচনের ব্যর্থতার ওপর। তাদের দাবি, এই নির্বাচন দেশে স্থিতিশীলতা বা শান্তি আনবে না এবং শেষ পর্যন্ত জনগণ আবার আওয়ামী লীগের দিকেই ফিরে যাবে।

কলকাতায় বসবাসরত সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য তানভীর শাকিল জয়, যিনি আগস্ট ২০২৪ থেকে সেখানে রয়েছেন, অল্প কয়েকজনের একজন যিনি অতীতের ‘ভুল’ স্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, “আমি স্বীকার করি আমরা সাধু ছিলাম না। আমরা কর্তৃত্ববাদী ছিলাম। পুরোপুরি গণতান্ত্রিক ছিলাম না। ২০১৮ সালের নির্বাচন পুরোপুরি কার্যকর ছিল না, এটা আমি মানি। আমরা চাইতাম সেটা আরও সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ হোক, দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা হয়নি।”

তবে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে আনুমানিক ২০০ বিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

কলকাতায় থাকা অনেকের মতো তানভীর শাকিল জয়ও মনে করেন, তার ভারতে নির্বাসন দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তবে দেশে ফিরলে কারাবরণের সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি বলেন, এখন আমাদের সময়টা খুব অন্ধকার, কিন্তু আমি মনে করি না এটা দীর্ঘদিন এমন থাকবে।

Scroll to Top