বিশ্বকাপ থেকে স্কটল্যান্ডের বিদায় নিশ্চিত হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রধান কোচ স্টিভ ক্লার্ক পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তার এই সিদ্ধান্ত ছিল অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত। মাত্র এক মাস আগে স্কটিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন চার বছর মেয়াদে তার চুক্তি নবায়নের ঘোষণা দিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ সরে দাঁড়ানোর কারণ নিয়ে কোনো ব্যাখ্যাও দেননি ক্লার্ক।

তার বিদায়ের ধরনও ছিল তার স্বভাবসুলভ—নীরব, সংযত এবং প্রচারবিমুখ। দীর্ঘ বিদায়ী বার্তায় ইঙ্গিত মিলেছে, সিদ্ধান্তটি সম্ভবত এক-দুদিন ধরেই বিবেচনায় ছিল। তবে কেন এত দ্রুত দায়িত্ব ছাড়লেন, সে প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
ক্লার্কের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আগে থেকে জানতেন না খেলোয়াড়রাও। স্কটিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালনা পর্ষদের অনেক সদস্যও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না।
ক্লার্ককে নিয়ে স্কটল্যান্ডে বরাবরই মতভেদ ছিল। একদল সমর্থক তার মেয়াদ বাড়ানোর বিরোধিতা করলেও তা সংযতভাবেই প্রকাশ করেছেন। আবার আরেকটি অংশ দীর্ঘদিন ধরেই তার সমালোচক। কিলমার্নকের দায়িত্বে থাকার সময় সাম্প্রদায়িক স্লোগান নিয়ে রেঞ্জার্স সমর্থকদের সমালোচনা করেছিলেন ক্লার্ক। সেই মন্তব্যের জের ধরে অনেক সমর্থক তাকে কখনোই ক্ষমা করেননি।
তবে সাত বছরের দায়িত্ব শেষে তার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকারকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন কোচ, নতুন চিন্তা এবং নতুন কণ্ঠের প্রত্যাশায় এক ধরনের স্বস্তিও অনুভূত হচ্ছে। যদিও উপযুক্ত উত্তরসূরি খুঁজে পাওয়া সহজ হবে না।
ক্লার্কের নেতৃত্বে স্কটল্যান্ড সাত বছরে তিনটি বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে জায়গা করে নেয়। যদিও কোনোবারই নকআউট পর্বে উঠতে পারেনি দল। সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপেও সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি।
তবু তার অর্জনকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। এই সাফল্যগুলো স্কটিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের আয় বাড়িয়েছে এবং দীর্ঘদিনের হতাশা থেকে জাতীয় দলকে বের করে এনেছে। ক্লার্ক দায়িত্ব নেওয়ার আগে টানা ব্যর্থতায় সমর্থকদের মধ্যে হতাশা আর অনীহাই ছিল প্রধান বাস্তবতা।
তার দায়িত্ব শুরুর আগে কাজাখস্তানের কাছে ৩-০ গোলে হারের পর দল ছিল গভীর সংকটে। ক্লার্কের প্রথম ম্যাচে সাইপ্রাসের বিপক্ষে কষ্টার্জিত জয় দেখতে মাঠে উপস্থিত ছিলেন ৩১ হাজার ২৭৭ দর্শক। এরপর রাশিয়া, বেলজিয়াম, সান মারিনো ও কাজাখস্তানের বিপক্ষে ম্যাচগুলোতেও দর্শকসংখ্যা কমতে থাকে। বিদায়ী বার্তায় সেই সময়ের কথাও স্মরণ করেছেন ক্লার্ক। অল্প কিছু নিবেদিতপ্রাণ সমর্থক ছাড়া জাতীয় দলকে ঘিরে তখন প্রায় কোনো আগ্রহই ছিল না।
ক্লার্কের সময়টা ছিল সাফল্য ও ব্যর্থতার মিশেলে ভরা। অতিমারির কারণে পিছিয়ে যাওয়া ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপে টাইব্রেকারে টানা দুটি জয় এনে স্কটল্যান্ডকে মূল পর্বে তুলেছিলেন তিনি। তবে সেখানে দল হতাশই করেছে।
এরপর ২০২২ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে টানা ছয়টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ জিতে নতুন আশার জন্ম দিয়েছিল স্কটল্যান্ড। ডেনমার্ককে হারিয়ে ইউক্রেনের বিপক্ষে ঘরের মাঠে প্লে-অফের সুযোগ পেলেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। পরে উয়েফা নেশনস লিগেও আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের কাছে ৩-০ গোলে হারে দল।
ইউরো ২০২৪ বাছাইপর্বে আবারও ঘুরে দাঁড়ায় স্কটল্যান্ড। ঘরের মাঠে স্পেনকে হারানো এবং নরওয়ের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের জয় ছিল স্মরণীয়। জর্জিয়ার বিপক্ষে প্রবল বৃষ্টির মধ্যে পাওয়া জয়ও ক্লার্কের সময়ের অন্যতম উজ্জ্বল মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপের মূল পর্বে আবারও হতাশা। হাঙ্গেরির কাছে ১-০ গোলে হেরে বিদায় নেয় স্কটল্যান্ড। টুর্নামেন্ট শেষে ক্লার্কের প্রতিক্রিয়া এবং আচরণও সমালোচনার জন্ম দেয়।
এরপরও তিনি দলকে আবার ঘুরে দাঁড় করান। নেশনস লিগে পর্তুগালের বিপক্ষে ড্র এবং ক্রোয়েশিয়া ও পোল্যান্ডের বিপক্ষে জয় নতুন আশার সঞ্চার করে।
বিশ্বকাপ বাছাইয়েও ভাগ্য সহায় ছিল স্কটল্যান্ডের। গ্রিস ও বেলারুশের বিপক্ষে বাজে খেলেও জয় পায় দল। পরে গ্রিসের কাছে হারলেও কোপেনহেগেনে ডেনমার্কের বিপক্ষে বেলারুশের অপ্রত্যাশিত ড্র স্কটল্যান্ডকে প্লে-অফ এড়াতে সহায়তা করে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ডেনমার্কের বিপক্ষে স্মরণীয় জয় তুলে নেয় দল।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হয় হতাশায়। সেই ব্যর্থতার পরই দায়িত্ব ছাড়লেন ক্লার্ক।
এখন স্কটল্যান্ডের সামনে নতুন কোচ খোঁজার চ্যালেঞ্জ। বর্তমান দলটি বিশ্বকাপের অন্যতম প্রবীণ দলগুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্রে দলে থাকা তিন গোলরক্ষকের সম্মিলিত বয়স ছিল ১০৩ বছর। লিন্ডন ডাইকস ও লরেন্স শ্যাঙ্কল্যান্ডের বয়স ৩০। জন ম্যাকগিন, রায়ান ক্রিস্টি ও জ্যাক হেন্ড্রির বয়স ৩১। অ্যান্ডি রবার্টসনের বয়স ৩২। গ্রান্ট হ্যানলি ও কেনি ম্যাকলিনের বয়স ৩৪।
নতুন কোচকে গোলরক্ষক ও সেন্টার-ব্যাকের সংকট, সৃজনশীল মধ্যমাঠের অভাব, গতিময় প্রান্তভাগের খেলোয়াড়ের স্বল্পতা এবং আক্রমণভাগে সুযোগ তৈরির সমস্যাসহ একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
আরও পড়ুন
স্টিভ ক্লার্ক স্কটল্যান্ডকে দীর্ঘ পথ এগিয়ে নিয়েছেন। তবে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছানোর পথ এখনও অনেক বাকি। সেই পথচলার দায়িত্ব এখন নতুন একজন কোচের হাতে।



