ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকরের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে অনেকের মনেই ধারণা, তিনি অতি কোমল হৃদয়, প্রগাঢ় আবেগ এবং অশ্রুসিক্ত স্বভাবের একজন সাধক মানুষ। তাঁর দূরদর্শী রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সংকট মুহূর্তের দৃঢ়তাকে প্রায়শই আড়াল করা হয়।
নবীজির ওফাতের পর ইসলামি রাষ্ট্র যখন অস্তিত্বের সংকটে নিপতিত হয়েছিল, তখন ওমর ইবনুল খাত্তাবের মতো শক্তিশালী সাহাবিও কৌশলগত নমনীয় নীতির পরামর্শ দিয়েছিলেন।
কিন্তু সেই কঠিন সন্ধিক্ষণে আবু বকর সিদ্দিক (রা.) অবিচল পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়েছিলেন এবং তিনটি সাহসী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন; যা শুধু ইসলামি রাষ্ট্রের ভিত্তিই সুসংহত করেনি; বরং ইসলামের বিধান ও মৌলিক কাঠামোকে রক্ষা করেছিল।
১. ওসামার বাহিনী প্রেরণ
ওফাতের ঠিক কয়েক দিন পূর্বে নবীজি (সা.) ওসামা ইবনে জায়েদের নেতৃত্বে রোমান সীমান্তে পাঠানোর জন্য একটি সেনাদল প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু বাহিনী মদিনার উপকণ্ঠে পৌঁছতেই নবীজির বিদায়ের সংবাদ আসে।
এ সময় সমগ্র আরব উপদ্বীপে বিদ্রোহ ও স্বধর্মত্যাগের (রিদ্দা) আগুন জ্বলে ওঠে। মদিনা যখন চতুর্দিক থেকে বিদ্রোহী ও শত্রুগোত্রগুলোর আক্রমণের আশঙ্কায় মারাত্মক হুমকির মুখোমুখি, তখন জ্যেষ্ঠ সাহাবিদের একটি দল নিরাপত্তার স্বার্থে ওসামার অভিযান স্থগিত রাখার কিংবা সেনাদলকে মদিনা রক্ষায় নিয়োজিত রাখার পরামর্শ দেন।
আবু বকর (রা.) সাহাবিদের এই নমনীয় কৌশলগত প্রস্তাব দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে আল্লাহর রাসুল (সা.) যে সেনাদলের পতাকা বেঁধেছেন, তা স্থগিত করার অধিকার তাঁর নেই।
কৌশলগত বিচারে আবু বকরের এই সিদ্ধান্তটি ছিল এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।
মদিনা নগরী যখন অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সংকটে জর্জরিত, তখন এত বিশাল ও সুসজ্জিত সেনাদলকে পারস্য ও রোমান সীমান্তের দিকে এগিয়ে যেতে দেখে বিদ্রোহী গোত্রগুলো চলে ওঠে।
তারা ভাবতেও পারেনি যে মদিনার কেন্দ্রীয় প্রশাসন এতটা শক্তিশালী ও নির্ভীক হতে পারে। ফলে মদিনা দখলের পরিকল্পনা নস্যাৎ হয় এবং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ও প্রতিপত্তি অক্ষুণ্ণ থাকে। (আলি মুহাম্মদ আস-সাল্লাবি, আবু বকর আস-সিদ্দিক: সাহাকসিয়্যাতুহু ওয়া আসরুহু, ১/১৮৫, মাকতাবাতুস সাহাবাহ, জেদ্দা, ২০০১)

