ফুটবলে সবসময়ই বড় বেশি আলোচনা হয় স্ট্রাইকারদের নিয়ে। কেননা তাদের ছোঁয়াতেই আসে সেই কাঙ্ক্ষিত গোল। একজন স্ট্রাইকার পুরো ম্যাচজুড়ে নিজেকে নিবেদন করেন কেবলই গোলের জন্য। ফলে তারকা ফরোয়ার্ডদের ওপর যতুটুকু আলো থাকে ততটুকু অন্য খেলোয়াড়দের ওপর থাকে না। স্ট্রাইকারদের করা গোল, অ্যাসিস্ট নিয়ে চলে চুলচেরা বিশ্লেষণ। আবার মধ্যমাঠের খেলোয়াড়রাও কম যান না। একটা ম্যাচের সৌন্দর্যকে বড় বেশি মহিমান্বিত করেন মধ্যমাঠের খেলোয়াড়রা। মাঠে তাদের চোখ জুড়ানো বল আদান-প্রদান, প্রতিপক্ষের রক্ষণ প্রাচীর মুহুর্তে ভেঙে ফেলা, আক্রমণের পর আক্রমণ শানিয়ে ডি-বক্স তছনছ করে ফেলা- ফলে তারাও থাকেন ক্রীড়ামোদীদের অপূর্ব ভালোবাসায়। কিন্তু সেই তুলনায় ডিফেন্ডাররা অনেকটাই আড়ালে থেকে যান।
অবশ্য আধুনিক ফুটবলের বিবর্তনের ধারায় ফুটবল বদলে গেছে। আর তাই হালে রাইট-ব্যাক ও লেফট-ব্যাকরা এখন ভয়ংকর আক্রমণাত্মক অস্ত্রে পরিণত হয়েছেন, যারা প্রতিপক্ষের রক্ষণে ফাঁক খুঁজে বের করে আক্রমণ গড়ে তুলতে সহায়তা করেন। ফলে পুরনো দিনের সেই শুধু রক্ষণভাগ পাহারা দেওয়ার চলও এখন আর নেই। এই বিশ্বকাপে ইতিমধ্যেই রক্ষণভাগের কিছু ফুটবলারকে দেখা গেছে যারা আকাশ এবং মাটিতে সমান দক্ষতায় খেলতে পারে। এই প্রমাণটা বড় বেশি রাখতে সক্ষম হয়েছেন নেদারল্যান্ডসের সেন্টার ব্যাক ফন ডাইক। বিশ্বের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার তিনি। হেডওয়ার্কেও দারুণভাবে ক্রীয়াশীল। সবাইকে ছাপিয়ে কর্ণার বা ফ্রি-কিক থেকে তিনি গোল করতে পাকা। গত বিশ্বকাপে রক্ষণভাগে দুর্দান্ত খেলে সবার নজর কেড়েছিলেন আর্জেটিনার ক্রিশ্চিয়ার রেমেরো, নিকোলাস ওটামেন্ডি, মরক্কোর আশরাফ হাকিমি, ফ্রান্সের থিও হার্নান্দেজ, ক্রোয়েশিয়ার যোশকে গভার্দিওলভ, নেদারল্যান্ডসের ফন ডাইক। এবারও সবাই খেলছেন নিজ নিজ দেশের পক্ষে। গত বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে টাইব্রেকারে মরক্কোর আশরাফ হাকিমির সেই সাহসী ‘পানেঙ্কা’ পেনাল্টি আজও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে।
সাবেক তারকা ফুটবলার বরুণ বিকাশ দেওয়ান লেফটব্যাক হিসেবে জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘদিন খেলেছেন। ফলে বিশ্বকাপের রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের প্রতি তার বিশেষ আকর্ষণ বরাবরই। এবারও রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের খেলা মনোযোগ দিয়ে দেখছেন। তিনি বলেন, ফুটবলে ডিফেন্সের কাজ হল প্রতিপক্ষ দলকে স্কোর তথা গোল করা থেকে বিরত রাখা। ডিফেন্সিভ ফর্মেশনের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু পজিশন থাকে, যেমন লাইনব্যাকার, ডিফেন্সিভ লাইনম্যান এবং ডিফেন্সিভ ব্যাক। একটি ডিফেন্স যেন দলগতভাবে ভালো পারফর্ম করতে পারে, তার জন্য বিভিন্ন দক্ষতার খেলোয়াড়দের সমন্বয় থাকতে হয়। কিছু ডিফেন্সিভ খেলোয়াড়কে রান ঠেকানোর ক্ষেত্রে বেশি দক্ষ হতে হয়, কিছু খেলেয়াড়কে পাস প্রতিরোধে পারদর্শী হতে হয়। তবে বর্তমান সময়ে অনেককিছুই বদলে গেছে। এখন শুধু রক্ষণ নয়, সৃষ্টিও।’
বরুণ বিকাশ দেওয়ান বরাবরই ব্রাজিলের সমর্থক। ইতালির মালদিনিকে খেলেয়াাড়ি জীবনে হৃদয়ে ধারণ করতেন। এবারের বিশ্বকাপের প্রতিটি খেলাই দেখার চেষ্টা করছেন। তবে তার মতে, এখন পর্যন্ত তার মনে হয়েছে দলগত বিবেচনায় মরক্কো ও স্পেনের রক্ষণভাগ অনেকবেশি শক্তিশালী। ব্রাজিলের সাথে ম্যাচে মরক্কোর রক্ষণভাগের খেলোয়াড়রা চমৎকার খেলেছে। এখন পর্যন্ত রক্ষণভাগে নেদারল্যান্ডসের ফন ডাইক, মরক্কোর আশরাফ হাকিমি স্পেনের মার্ক কুকুরেয়া, আর্জেন্টিনার নিকোলাস ওটামেন্ডির খেলা তার বেশি ভালো লাগছে।
আশরাফ হাকিমি সম্পর্কে তিনি বললেন, ‘হাকিমি মূলত রাইট-ব্যাক হিসেবে খেলেন, তবে উইং-ব্যাক বা ডানপ্রান্তের রক্ষণাত্মক ভূমিকাতেও সমান দক্ষ। তার গতি, আক্রমণে অংশ নেওয়ার ক্ষমতা, ওভারল্যাপ করা, ক্রস দেওয়া এবং রক্ষণে দৃঢ়তার জন্য তিনি আরও বেশি সবার মনোযোগ কাড়বেন। রক্ষণ ও আক্রমণে খুবই সুন্দর সমন্বয় করেন তিনি, যা দ্রুত এবং দেখার মতো।’
নেতৃত্ব ও অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ আর্জেন্টিনার রক্ষণের পরীক্ষিত সৈনিক নিকোলাস ওটামেন্ডিকেও বিশেষ শক্তি হিসেবে দেখছেন বরুণ। তার মতে, গত বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ ভালো ছিল এবং ওটামেন্ডির মতো নিবেদিত প্রাণ ছিল। এবারও আর্জেন্টিনার পক্ষে ওটামেন্ডি নিয়মিত থাকবেন। বাছাই পর্বের খেলায় সে গোলও করেছে। তার হেড ওয়ার্কিং চমৎকার।
সবশেষে বরুণ বললেন, ‘আসলে আধুনিক ফুটবলে এখন আর মনে হয় ফিক্সড কোন পজিশন নেই। ফলে যতই রক্ষণভাগের খেলোয়াড় বলে বলে হোক গোলমুখে আক্রমণে তাদেরকেও যেতে হচ্ছে। ফুটবলের এই রূপান্তর বা বিবর্তন ধীরে ধীরে আরও হচ্ছে। সামনে আরও অনেককিছুর সংযোজন দেখা যাবে। তবে সবকিছুর মধ্যেই ফুটবলের আরও গতি ও উপচে পড়া লড়াই-ই মূল। এই বিশ্বকাপের তাই রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের আরও নতুন নতুন রূপে দেখা যাবে। প্রতিরক্ষা থেকে গোল মুখে আক্রমণ এখন অবিচ্ছেদ্য। রক্ষণভাগের খেলোয়াড়রা এখন আক্রমণে গিয়ে ম্যাচের নতুন ছন্দ তৈরি করে দিচ্ছে।’



