
গ্রিক পুরাণে চিকিৎসাবিদ্যার দেবতা অ্যাসক্লেপিয়াসের দুই কন্যা হাইজিয়া ও প্যানাসিয়া। প্রাচীন গ্রিক সংস্কৃতিতে সুস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের দুটি ভিন্ন ধারণার প্রতীক ছিলেন তারা। বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্যের এই দুই ধারণার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। হাইজিয়া হলেন সুস্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা ও রোগ প্রতিরোধের দেবী। তার নাম থেকেই এসেছে ইংরেজি ‘হাইজিন’(Hygiene) শব্দটি। অর্থাৎ রোগ হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা—হাইজিয়ার মূল দর্শন।
অন্যদিকে প্যানাসিয়া হলেন সব রোগ নিরাময় বা আরোগ্যের দেবী। তার নাম থেকেই এসেছে ‘Panacea’ শব্দটি, যার অর্থ: ‘সর্ব রোগের ওষুধ’ কিংবা এমন কোনো উপায়, যা সব সমস্যার সমাধান করতে পারে। অর্থাৎ অসুস্থ হওয়ার পর রোগ সারিয়ে তোলাই প্যানাসিয়ার দর্শন। এই প্যানাসিয়া থেকেই চিকিৎসক, ক্লিনিক, হাসপাতাল ইত্যাদির প্রবর্তন হয়েছে—এমনটা বললেও খুব বেশি অত্যুক্তি হবে না।
বর্তমানে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে হাইজিয়া দেবীকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হলেও বাংলাদেশে ঠিক তার উল্টো চিত্র। এখানে হাইজিয়া বলতে গেলে একেবারেই গুরুত্বহীন। তাই দেশময় অপরিচ্ছন্নতার যে উৎসব, তা সর্বত্র দৃশ্যমান। অফিস-আদালত, চত্বর, রাস্তাঘাট, বাড়ির আঙিনা, খোলা মাঠ, নদী-নালা কোনো জায়গাই বাদ নেই। সব স্থানই যেন রোগ উৎপাদন ও বিস্তারের উর্বর শস্যক্ষেত্র। রোগ প্রতিরোধের চেয়ে রোগ সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরিতেই যেন আমাদের জাতীয় দক্ষতা বেশি। অবশ্য এই প্রচেষ্টা যে কোনো কারণ ছাড়াই করা হয়, তা নয়। হাইজিয়ার নীতি অনুসরণ করলে বিনামূল্যে সুস্থ থাকা সম্ভব। অর্থাৎ এতে কারও আয় হবে না, কমিশন হবে না, বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হবে না।
জাতি হিসেবে তাই আমরা প্যানাসিয়ার অনুসারী। রোগ হলেই টাকা, ডাক্তার, নার্স, আয়া, ওয়ার্ডবয়, ওয়ার্ডমাস্টার থেকে শুরু করে অধ্যাপক, পরিচালক, মহাপরিচালক, ঠিকাদার, দফাদার, বাবুর্চি, মশালচি সবারই আয়-রোজগারের সুযোগ সৃষ্টি হয়। রোগ যত বাড়ে, প্যানাসিয়ার অনুসারীদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও তত বাড়ে।
সম্প্রতি এর সত্যতা আরও সুস্পষ্টভাবে দর্শনীয় হয়েছে। আমরা দেখেছি, প্যানাসিয়ার ভীষণ অনুরক্ত দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন। অক্লান্ত পরিশ্রম করে তিনি হাসপাতালের ডালে লবণ চেখে দেখছেন। আর তিনপেয়ে লাঠির মাথায় ক্যামেরা লগিয়ে তার পেছনে দূর্বার গতিতে এগিয়ে চলছেন একদল সাংবাদিক। ডালে লাবন চাখার দৃশ্য ধারণ এবং প্রচারে তারা ভীষণ তৎপরতা দেখিযে যাচ্ছেনা। এই তৎপরতা গিনেস বুকে নাম তোলার চাইতে কোন অংশে কম নয়।
তবে মন্ত্রী মহোদয়ের চোখে-মুখের অভিব্যক্তি দেখে বোঝার উপায় নেই ডালে লবণ হয়েছে, নাকি হয়নি!
তাকে দেখে দেশের পাতি মন্ত্রী, উপমন্ত্রী এবং তাদের পর্দাশীল স্ত্রীরা নেমে পড়েছেন ডালে লবণ চাখার প্রতিযোগিতায়। হাসপাতালে পরীক্ষা করে দেখার মতো আরও অনেক কিছু আছে। যেমন শয্য অনুসারে পর্যাপ্ত ডাক্তার, নার্স বা স্বাস্থ্য কর্মী আছেন কিনা, হাসপাতালের যন্ত্রগুলো সচল আছে কিনা, হাসপাতাল পরিস্কার পরিচ্ছন্ন আছে কিনা, দালালের দৌরত্ব আছে কিনা, হাসপাতাল চত্ত্বরে মশার চাষাবাদ ও উৎপাত হচ্ছে কিনা, ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর শয্যায় তেলাপোকারা সজ্যাসঙ্গী হচ্ছে কিনা, রোগীরা ওষুধ পাচ্ছেন কিনা, চিকিৎসকদের বসার, বিশ্রামে ন্যূনতম ব্যবস্থা আছে কিনা? হাসপাতালের আঙ্গীনা পেরোলেই প্রাইভেট ডায়গনস্টিক ক্লিনিকগুলো অপেক্ষমান কিন ইত্যাদি। কিন্তু অদ্ভত বিষয় হলো এগুলোর দিকে নয়, দেশের সবার নজর ডাল আর লবণের দিকে। কিন্তু কেন?
কিছু অর্বাচীন মনে করছেন, হাসপাতালে ডাল ও লবণ যারা খুঁজে বেড়াচ্ছেন, তারা মূলত পরিবার থেকেই এই শিক্ষা পেয়েছেন। আশির দশক কিংবা নব্বইয়ের দশকে দেশের গ্রামের অনেক পরিবারেই ডাল ছিল প্রতিদিনের খাদ্যতালিকার অন্যতম অনুসঙ্গ। পরিবারের কর্তা যদি পরিবারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের ওপর অসন্তোষ প্রকাশের অভিপ্রায় ব্যক্ত করতেন, তাহলে ডালকে লক্ষ্য এবং লবণকে উপলক্ষ বানিয়েই সেই কার্যক্রম শুরু করতেন। ‘ডালে লবণ হয়নি’ এই অভিযোগের পরিণতি অনেক সময় ভাদ্র মাসে পিঠে তাল পতনের মতো বিশেষ অনুভূতির মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হতো। ফলে ডাল-লবণের প্রতি আমাদের এই ঐতিহাসিক আবেগকে একেবারে অমূলক বলা যায় না।
তবে বিজ্ঞজনদের মাধ্যমে জানা গেছে, ওই দেশের মানুষ মূলত প্যানাসিয়ার খোঁজেই হাসপাতালে যান।
কিন্তু দেশের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু না থাকায় হাসপাতালের যন্ত্রপাতি, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ ইত্যাদি কোনো কিছুরই যথেচ্ছ পর্যায়ে কেনাকাটা হচ্ছে না। প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত পরিমাণে তো নয়ই।
শুধু চাল-ডাল আর লবণটাই ঠিকমতো কেনা হচ্ছে।
ফলে প্যানাসিয়াপন্থীরা এখন কড়ির খোঁজে নেমেছেন ডালের হাঁড়িতে লবণের অনুসন্ধানে। কারণ হাসপাতালের যন্ত্রপাতি পাওয়া গেল কি না, ওষুধ এলো কি না, রোগী চিকিৎসা পেল কি না এসবের চেয়ে ডালে লবণ হয়েছে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। আর প্যানাসিয়ার দেশে প্রশ্ন যখন এত বড়, উত্তরও নিশ্চয়ই ছোট হতে পারে না। এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছ থেকে তাল পড়ার আগেই যদি ডালের হাঁড়িতে মিলে যায় সেই অমূল্য রতন লবণ!
তাহলে চিকিৎসাব্যবস্থার আর কী-ই বা প্রয়োজন? হাইজিয়া থাকুক তার পরিচ্ছন্নতা নিয়ে। আমরা বরং প্যানাসিয়ার হাত ধরে ডাল-লবণের দেশেই ভালো থাকার লবণ চেখে কাটিয়ে দেই।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
প্রতিবেদক
রাশেদ রাব্বি
গণমাধ্যমকর্মী ও প্রবন্ধিক
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…