শারদীয় দুর্গোৎসবের ঢাকের বাদ্যি কানে বাজতেই মন যেন এক অচেনা আনন্দে নেচে ওঠে। পূজার নতুন পোশাক, চকচকে গহনা আর বাহারি রূপচর্চার প্রস্তুতি যখন চূড়ান্ত রূপ নেয়, ঠিক তখনই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মনে প্রশ্ন জাগে অন্য সবার চেয়ে আলাদা আর স্নিগ্ধ দেখানোর মূল রহস্যটি ঠিক কোথায় লুকিয়ে আছে? উত্তরটা একদম সোজা, কোনো কৃত্রিম ধাতব অলংকার নয়, বরং তাজা ফুলের সতেজতা ও মনমাতানো সুবাসই আপনাকে করে তুলতে পারে শারদীয় রূপের অনন্য রূপসী। মণ্ডপে মণ্ডপে আলোর রোশনাইয়ের মাঝে খোঁপায় একগুচ্ছ তাজা শিউলি বা বেলির পরশ থাকলে উৎসবের আনন্দ যেন মুহূর্তের মধ্যেই দ্বিগুণ হয়ে যায়।
আভিজাত্যে ভরা শাড়ির সাথে খোঁপার কারুকাজ
পূজার মূল আকর্ষণ থাকে লাল-সাদা গরদ, তসর, ঢাকাই জামদানি কিংবা সিল্কের শাড়িতে। শাড়ির এই চিরায়ত ঐতিহ্যের সাথে মাথার চুলের বাঁধন যদি সঠিক ফুলের ছোঁয়া পায়, তবে পুরো চেহারায় এক রাজকীয় আমেজ ফুটে ওঠে। মহাঅষ্টমীর সকালে ধূপের ধোঁয়া আর ঢাকের শব্দের মাঝে চুল উঁচুতে বেঁধে নিচু করে আঁটসাঁট খোঁপা করে তার চারপাশে জুঁই বা বেলির ঘন গজরা জড়িয়ে নিলে বাঙালির সনাতন সৌন্দর্য শতভাগ পূর্ণতা পায়। আর যদি আপনার পছন্দ হয় আলগা করে বাঁধা বেণী, তবে প্রতিটি ভাঁজে ছোট ছোট কাঠগোলাপ বা বকুল ফুল গুঁজে দিয়ে মিষ্টি এক হাসিতে মাতোয়ারা করে দিতে পারেন সবাইকে।

আধুনিক লেহেঙ্গা ও গাউনে খোলা চুলের মায়াজাল
পূজার মেলা কিংবা সন্ধ্যার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অনেকেই শাড়ির বদলে জমকালো লেহেঙ্গা বা লখনউই লং গাউন পরতে ভালোবাসেন। এই আধুনিক পাশ্চাত্য ও ফিউশন ধাঁচের পোশাকের সাথে ভারী গজরা না জড়িয়ে বরং খোলা চুলে হালকা ফুলের কারুকাজ চমৎকার মানিয়ে যায়। চুল হালকা কোঁকড়া বা কার্ল করে একপাশে ফেলে রেখে কানের পেছনের অংশে একটি লাল গোলাপ, অর্কিড বা রঙিন চন্দ্রমল্লিকা আটকে দিলে বেশ আভিজাত্য প্রকাশ পায়। আপনি চাইলে মাথার সামনের অংশ থেকে দুই পাশের চুল পেঁচিয়ে পেছনে আটকে সেখানে কিছু তাজা জিপসোফিলার ছোট ছোট কুঁড়ি ছড়াতে পারেন, যা দেখতে ঠিক যেন এক রূপকথার রাজকীয় মুকুটের মতো লাগে।
ফতুয়ার সাথে খোলা চুলে আনকমন ফুলের আমেজ
পূজার আড্ডায় বা ঘুরে বেড়ানোর সময় আরামদায়ক পোশাক হিসেবে সুতির বা সিল্কের ফতুয়া এখন ভীষণ জনপ্রিয়। ফতুয়ার সাথে চুল একদম খোলা রেখে প্রাকৃতিক ও ক্যাজুয়াল লুক ফুটিয়ে তোলার মধ্যে আলাদা এক চঞ্চলতা রয়েছে। একপাশে চুল আলতো করে ফেলে রেখে কানের উপরে একটি মাঝারি আকারের তাজা কাঠগোলাপ, জারবেরা কিংবা রঙিন ডালিয়া গুঁজে দিলে ফতুয়ার সাধারণ পোশাকেও এক অসাধারণ আধুনিক মাত্রা যোগ হয়। আবার চুল সম্পূর্ণ খোলা রেখে মাথার ওপরের অংশে তাজা জিপসোফিলা বা ছোট চন্দ্রমল্লিকা দিয়ে তৈরি হালকা একটি ফুলের রিং বা হেডব্যান্ড পরে নিলে ফতুয়ার সাজটি মুহূর্তেই ভীষণ সতেজ ও প্রাণবন্ত দেখায়।

উৎসবের প্রতিটি দিন ও সময়ের ফুল নির্বাচন
পূজার একেকটি দিনের মেজাজ একেক রকম, তাই সকাল ও সন্ধ্যার সাজে ফুলের রূপেও আসা চাই স্পষ্ট বৈচিত্র্য। মহাসপ্তমী ও মহাঅষ্টমীর তাজা ও স্নিগ্ধ সকালে জুঁই, বেলি, রজনীগন্ধা, শিউলি বা কাঠগোলাপের মতো হালকা সুবাসের সাদা ফুল ব্যবহার করা বেশ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়। আবার মহানবমী বা বিজয়া দশমীর জমকালো সন্ধ্যায় লাল গোলাপ, রক্তজবা, চন্দ্রমল্লিকা কিংবা রঙিন অর্কিডের গাঢ় শেডগুলো দারুণ দ্যুতি ছড়ায়। এছাড়া দশমীর সিঁদুর খেলার আনন্দঘন মুহূর্তে সিন্দুরি লাল শাড়ির সাথে খোঁপায় লাল গোলাপের সাজ বিজয়ার স্মৃতিকে সারাজীবনের জন্য অমর করে রাখে।
ফুলের সাজ দীর্ঘ সময় তরতাজা রাখার কৌশল
মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে ঠাকুর দেখা বা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়ার সময় ফুলের সাজ যাতে শুকিয়ে বা ম্লান হয়ে না যায়, সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখা জরুরি। ফুল কেনার পরপরই তা সামান্য পানির ছিটে দিয়ে পাতলা সুতি কাপড়ে পেঁচিয়ে ফ্রিজের নিচের অংশে রেখে দিলে দীর্ঘক্ষণ তা সতেজ থাকে। চুলে ফুল আটকানোর সময় কখনো সরাসরি সুগন্ধি বা হেয়ার স্প্রে ছিটানো যাবে না, কারণ সুগন্ধির ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান তরতাজা পাপড়িগুলোকে মুহূর্তে কালো ও নিস্তেজ করে দেয়। সম্পূর্ণ সাজগোজ ও চুলে হেয়ার স্প্রে দেওয়া শেষ করে সবশেষে ভালোমানের হেয়ার পিন দিয়ে নিখুঁতভাবে ফুল আটকে নিলে সারাদিন ধরে ধরে রাখা যায় উৎসবের অনাবিল সতেজতা।


