মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ে পদ্মা নদী থেকে ভাসমান অবস্থায় একটি মৃতদেহ উদ্ধার করেছে নৌ-পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। ধারণা করা হচ্ছে দেহটি গাজীপুরের কাপাসিয়ায় স্ত্রী, তিন মেয়ে ও শ্যালকসহ পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত প্রধান অভিযুক্ত ফোরকান মোল্লার। তবে মরদেহের পরিচয় পুরোপুরি নিশ্চিত হতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট অথবা লাশ অর্ধগলিত থাকায় সেটি না করা গেলে ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত করা হবে।

শনিবার (১৬ মে) বেলা আড়াইটার দিকে উপজেলার ঘোরদৌড় বাজার এলাকা থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মুন্সিগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম ও লৌহজংয়ের মাওয়া নৌ-পুলিশ ফাঁড়ি (ইনচার্জ) মো. ইলিয়াস।
ফায়ার সার্ভিস জানায়, পদ্মা সেতু থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে লৌহজং উপজেলা ভূমি অফিস সংলগ্ন বাজারের পাশে দুপুরে পদ্মায় একটি ভাসমান মরদেহ দেখে স্থানীয়রা নৌ-পুলিশকে খবর দেয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতায় মাওয়া নৌ-পুলিশ নিহতের মরদেহটি উদ্ধার করে।
এরপর গাজীপুরের আলোচিত ৫ খুনের মামলার প্রধান অভিযুক্ত ফোরকান মোল্লার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তার ভাই আব্দুল জব্বার ও কাপাশিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক তদন্ত জুবায়ের রহমান উদ্ধার হওয়া মরদেহটি অভিযুক্ত ফোরকানের বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করেন। মরদেহটি উদ্ধার শেষে গাজীপুরের পুলিশের হেফাজতে তুলে দেয় মুন্সিগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস।
এসব তথ্য নিশ্চিত করে মুন্সিগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ সফিকুল ইসলাম বলেন, সরকারিভাবে চিঠি দিয়ে অভিযুক্ত ফোরকানের মরদেহ পদ্মা নদী থেকে উদ্ধার করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়। চিঠিতে পদ্মা সেতুর উপর থেকে লাফ দিয়ে আলোচিত হত্যা মামলার আসামি ফোরকানের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি উল্লেখ করে দ্রুত ব্যবস্থার গ্রহণের নির্দেশনা আসে। বিষয়টি আমলে নিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করে মুন্সিগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস।
অন্যদিকে, মাওয়া নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইলিয়াস জানান, শনিবার দুপুরে স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে লাশটি উদ্ধার করে পুলিশ। পরে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় খবর পাঠানো হলে মামলার বাদী, নিহতের পরিবারের সদস্য ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা লাশটি ফোরকানের বলে ধারণা করেন।
নৌ-পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও জানান, তবে পুরোপুরি পরিচয় নিশ্চিতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট অথবা লাশ অর্ধগলিত থাকায় সেটি না করা গেলে ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত করা হবে।
এর আগে, গত বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বিকেল সাড়ে ৩টায় নিজ কার্যালয়ে গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দীন সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানান, অভিযুক্ত ফোরকান মোল্লা পদ্মা সেতু থেকে নদীতে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন বলে ধারণা করছে পুলিশ।
ওইদিন গাজীপুরে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার আরও জানিয়েছিলেন, পদ্মা সেতুর সিসিটিভি ফুটেজে এক ব্যক্তিকে নদীতে ঝাঁপ দিতে দেখা গেছে, যাকে দেখে ফোরকান বলে ধারণা করছেন তার পরিবার ও মামলার বাদী। তবে মরদেহ উদ্ধার ও ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
এছাড়া পুলিশ সুপার জানিয়েছিলেন, পাঁচ খুনের ঘটনার পরপরই প্রধান আসামি ফোরকানকে গ্রেপ্তারে তিনটি দল অভিযানে নামে। একটি দল গোপালগঞ্জে ফোরকানের গ্রামের বাড়ি এবং অন্য একটি দল বেনাপোলে যায় যাতে সে সীমান্ত পার হতে না পারে। পরে গত সোমবার (১১ মে) মেহেরপুরে একটি যাত্রীবাহী বাসের হেলপারের কাছ থেকে নিহত অভিযুক্ত ফোরকানের মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে ওই হেলপার জানান, তিনি মোবাইলটি পদ্মা সেতু থেকে পেয়েছেন। এরপর পুলিশের একটি দল পদ্মা সেতুতে গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে। ফুটেজে দেখা যায়, প্রাইভেটকার থেকে এক ব্যক্তি নেমে হাতের মোবাইলটি ফুটপাতের উপর রাখেন। এরপর দুই থেকে তিন মিনিট অপেক্ষা করে রেলিং টপকে নদীতে লাফ দেন।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার আরও বলেছিলেন, বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য মামলার বাদী (নিহত শারমিনের বাবা) এবং গোপালগঞ্জে ফোরকানের ভাই জব্বারসহ স্থানীয় কয়েকজনকে ভিডিওটি দেখানো হয়। তারা পুরোপুরি নিশ্চিত না হলেও তাদের কাছে মনে হয়েছে ভিডিওর ওই ব্যক্তিটিই ফোরকান। তবে চেহারা স্পষ্টভাবে দেখা না যাওয়ায় শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পুলিশ জানিয়েছে, ভিডিওর প্রাইভেটকারটি ঢাকার পল্টনের একটি রেন্ট-এ-কার থেকে ভাড়া করেছিলেন ফোরকান। চালককে তিনি বলেছিলেন, এক আত্মীয় মারা যাওয়ায় সেখানে যাওয়ার জন্য তিনি গাড়িটি নিচ্ছেন। তবে অল্প সময়ের জন্য দেখায় চালক ফোরকানকে পুরোপুরি শনাক্ত করতে পারেনি।
ওইদিন পুলিশ সুপার আরও জানান, উদ্ধার হওয়া মোবাইলটি যে ফোরকানের, তা ইতোমধ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ফোরকান ছাড়া এই হত্যাকাণ্ডে দ্বিতীয় কারো সংশ্লিষ্টতা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। দেশের বিভিন্ন থানায় বার্তা দেয়া হয়েছে, যাতে কোনও অজ্ঞাতনামা মরদেহ পাওয়া গেলে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা যায়।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
এর আগে, গত শনিবার (৯ মে) সকালে কাপাসিয়ার রাউৎকোনা গ্রামে একটি বহুতল বাড়ি থেকে ওই পাঁচ জনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতরা হলেন- গোপালগঞ্জ সদরের পাইককান্দি গ্রামের শাহাদাত হোসেন মোল্লার মেয়ে শারমিন খানম (৩০), নাতনি মীম খানম (১৫), উম্মে হাবিবা (৮), ফারিয়া (দেড় বছর) ও ছেলে রসুল মোল্লা (২৩)। এর মধ্যে শারমিন ফোরকান মোল্লার স্ত্রী। মীম, হাবিবা ও ফারিয়া তাদের সন্তান। রসুল মোল্লা নিহত শারমিনের ছোট ভাই।




