আমি এবারে আসি দুর্গের একেবারে মধ্যিখানে। সিনেমায় দেখানো হয়েছিল, এখানেই জড়ো করা ছিল নাৎসি বাহিনীর সাঁজোয়া ট্রাক। আর চারদিকের ভবনগুলোতে ছিল নাৎসি বাহিনীর ব্যারাক। এখনকার এই সময়ে ভবনগুলো সবই আছে, তবে নেই কেবল কোনো ব্যারাক, সেনাদের হাঁকডাক। একেবারেই কিছু নেই, তা অবশ্য নয়। একটা জাদুঘর আছে। আর আছে টিকেট বেচবার ছোট্ট ঘর।
টিকেট কেটে ভেতরের চত্বরে ঢুকতে দেখি, ভবনের বিভিন্ন কোণে বেশ কিছু গোলাকার বল সাজিয়ে রাখা। যেন সেই মোগল আমলের কামানের গোলা। প্রস্তরনির্মিত। হাজার দুয়েকের বেশি বছর আগে গ্রিকরা কেন এমন নিখুঁতভাবে পাথর কেটে গোলাকার বল নির্মাণ করেছিল, তার সঠিক কারণ আজও অজানা।
সেই দুই হাজারের বেশি আগের সময়ে পৃথিবীতে যে কয়টি জাতি মূর্তি গড়ায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিল, তাদের মধ্যে ছিল মিসরীয়, এসিরিয়ান, গ্রিক আর ভারতীয়রা। এরা সবাই দুর্দান্ত সব মূর্তি গড়লেও একেকটি জাতি ব্যবহার করেছে একেক ধরনের পাথর। যেমন মিসরীয়রা ব্যবহার করত বেলেপাথর বা গ্রানাইট। এসিরীয়রা জিপসাম। ভারতীয়রা ব্যবহার করত বেলেপাথর আর কষ্টি পাথর। অন্যদিকে গ্রিকরা মূলত ব্যবহার করত মার্বেল পাথর।
গ্রিকদের মার্বেল পাথর দিয়ে মূর্তি গড়ার কারণ গ্রিসে মার্বেল পাথরের সহজলভ্যতা। পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট মার্বেল পাথরের খনি ছিল গ্রিসে। পেন্তেলিকাস পাহাড় কিংবা পার্স দ্বীপে ছিল বিশাল মজুত। এসব খনিতে এখনো মার্বেল পাথরের মজুত পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি। যদিও আগেকার সেই কারিগর আর নেই। তারা হারিয়ে গেছে।
খ্রিষ্টপূর্ব এক থেকে তিন দশক আগেকার মূর্তিগুলোয় আমরা দেখি—সুন্দর, সুঠাম দেহের সব নারী-পুরুষ। তারা কেউ রুগ্ণ নয়। যেন ব্যায়াম করে পিটিয়ে তোলা স্বাস্থ্য। আসলে সেই সময়কালেও গ্রিকরা ছিল খেলাধুলা, খাবার আর শরীরচর্চার প্রতি যত্নশীল। যে কারণে আজও জনপ্রিয় বহু খেলার উৎপত্তিস্থল হিসেবে গ্রিসের নাম উঠে আসে। গ্রিসের খাদ্য সংস্কৃতিকে এখনো পৃথিবীর অন্যতম স্বাস্থ্যকর হিসেবে মনে করা হয়।
মূর্তি যাঁরা গড়তেন, তাঁরা অনেকেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন বিশাল এই দেশের নানা বিচ্ছিন্ন দ্বীপে। যদিও এথেন্সে গিয়ে পারথেনন দেখে অনেকেই ভেবে বসতে পারে, কেবল এথেন্সেই ছিল সব ভাস্কর্যশিল্পীর মিলনমেলা। বাস্তবে, গ্রিসের সেরা শিল্পীরা ছিলেন ক্রিট, মাইলো, রোডস—এমন সব বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা।
রোডস দ্বীপটির কথা এক্ষেত্রে বিশেষভাবে বলতে হয়। ভূমধ্যসাগরে জেগে থাকা, আজকের তুরস্কের একেবারে সীমান্তের কাছাকাছি এ দ্বীপে জন্মেছিলেন কিছু সাড়া জাগানো ভাস্কর্যশিল্পী। তাঁদেরই একজন দিওদিলসাস। আর তাঁরই এক অমর কীর্তি ভেনাস অব রোডস।
ভেনাসকে বলা হয় প্রেম আর সৌন্দর্যের দেবী। কেউ প্যারিসের ল্যুভর মিউজিয়ামে গেলে এই ভেনাসের আরেকটি ভাস্কর্য দেখতে পাবেন, সেটিও গ্রিসের মাইলো দ্বীপে গড়া। সে কারণে ওটির নাম—ভেনাস অফ মাইলো। যদিও ভেনাস অব রোডস ভিন দেশের মিউজিয়ামে না গিয়ে কপাল গুণে শোভা পাচ্ছে নিজের জন্মভূমি রোডস দ্বীপের এই জাদুঘরেই।



