আমাদের এই জাতিগত ইতিহাস এসব সামষ্টিক ঐতিহাসিক স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার ধারণা নিয়ে আমাদের মানসপটে আবির্ভূত হয়। যে সামষ্টিক স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমাদের দেশপ্রেমের ভিত্তি রচিত হয়। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী অ্যান্থনি ডি. স্মিথের ‘মিথস অ্যান্ড মেমোরিজ অব দ্য নেশন’ বইয়ের ধারণা খুবই প্রাসঙ্গিক, যেখানে তিনি বলেন একটি জাতির ভিত্তি গড়ে ওঠে তার ঐতিহাসিক মিথ, সূর্যসন্তানদের বীরত্বগাথা ও সামষ্টিক ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ধারণার মধ্য দিয়ে।
এর সঙ্গে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে একটি দেশের জাতীয় পতাকা, আচার-প্রথা যেমন জাতীয় সংগীতসহ জাতীয় বীরদের বীরত্বগাথার প্রতীকী উদ্যাপন ও সম্মান প্রদর্শনের প্রক্রিয়া। এসব মিথ, স্মৃতি ও প্রতীক মানুষের মধ্যে একটি সমষ্টিগত অন্তর্ভুক্তির অনুভূতির বোধ সৃষ্টি করে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়। ফলে জাতীয় পরিচয় শুধু সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা মানুষের আবেগ ও কল্পনার আরও গভীরে প্রোথিত হয়ে দীর্ঘস্থায়ী শক্তি অর্জন করে।
এই দেশপ্রেমের নানা প্রতীকীর বহিঃপ্রকাশ ঘটে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে জাতীয় সংগীতের সম্মানের মধ্য দিয়ে, কেননা জাতীয় অধিকাংশ কার্যক্রম শুরু হয় জাতীয় পতাকার প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান এবং দেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের মধ্য দিয়ে। আবার আমাদের দেশের স্কুলের প্রতিটি দিন শুরু হয় জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে, যা আমাদের শিক্ষা কার্যক্রমের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর মধ্য দিয়ে শিশুকাল থেকেই দেশের প্রতি ভালোবাসা যেন প্রতিটি শিশু শিখতে পারে।
দেশপ্রেমও যে একটা শেখার বিষয়, সেটি হয়তো অনেকেই উপলব্ধি করতে পারেন না। যে কারণে আমরা অনেককেই দেখি জাতীয় সংগীত থেকে শুরু করে জাতীয় পতাকার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন না করতে। অনেকে আবার সেই সম্মান প্রদর্শনে তেমন কোনো ইতিবাচক তাগিদও অনুভব করেন না, যা বিভিন্ন সময় আমাদের জনপরিসরে দৃশ্যমান। এ হেন চর্চা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য একটি লজ্জার বিষয়। তবে দুঃখের বিষয় হলো, এটি যে একটি লজ্জার বিষয়, সেটিও তাঁরা অনুধাবন করতে পারেন না।
দেশকে ভালোবাসা চর্চার বিষয়, নিয়মিত চর্চার মাধ্যমেই তা পরিপক্বতা পায়।
-
বুলবুল সিদ্দিকী অধ্যাপক, রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
-
মতামত লেখকের নিজস্ব



