দীর্ঘ দুই দশক পর ইরাক ছাড়ল শেষ মার্কিন সেনা: মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত – DesheBideshe

দীর্ঘ দুই দশক পর ইরাক ছাড়ল শেষ মার্কিন সেনা: মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত – DesheBideshe


দীর্ঘ দুই দশক পর ইরাক ছাড়ল শেষ মার্কিন সেনা: মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত – DesheBideshe

বাগদাদ, ৩০ সেপ্টেম্বর – দীর্ঘ ২২ বছরের সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ইরাক থেকে নিজেদের সমস্ত সৈন্য পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। নির্ধারিত সময়সীমার ঠিক এক দিন আগেই, মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬) মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতময় এই দেশটির মাটি ছেড়েছেন শেষ মার্কিন সেনাসদস্যরা।

ইরাক সরকার এই পদক্ষেপকে দেশের পূর্ণাঙ্গ জাতীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এক ‘ঐতিহাসিক মাইলফলক’ হিসেবে উদযাপন করলেও, দেশের সাধারণ নাগরিক এবং স্থানীয় গোত্রপতিদের একাংশ সেনা পরবর্তী নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

দীর্ঘ দুই দশকের সামরিক অধ্যায় ও পটভূমি

২০০৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের নেতৃত্বে ‘অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম’-এর মাধ্যমে সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ইরাকে প্রবেশ করেছিল মার্কিন বাহিনী। পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালে চরমপন্থী জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) উত্থান ঘটলে তাদের দমন করতে আন্তর্জাতিক সামরিক জোটের অংশ হিসেবে পুনরায় ভারী সেনা মোতায়েন করা হয়।

সর্বশেষ ২০২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সাথে বাগদাদের ঐতিহাসিক চুক্তির পর ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হয়, যার চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল এ সপ্তাহে।

‘নতুন দিনের সূচনা’ বনাম আঞ্চলিক শঙ্কা: কে কী বলছেন?

মার্কিন বাহিনীর এই পূর্ণাঙ্গ বিদায়কে স্বাগত জানিয়ে ইরাকের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি এটিকে দেশের ইতিহাসে এক নতুন প্রত্যুষ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আজকের এই দিনটি ইরাকের ইতিহাসে এক স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আমরা এখন সম্পূর্ণ বিদেশি সামরিক মুক্ত এবং একটি পূর্ণ সার্বভৌম স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণ করব।”

তবে সরকারি মহলে উদযাপনের আবহ থাকলেও মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তাহীনতার ভয় প্রকট। বিশেষ করে একসময় আইএসের সাথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত থাকা ফালুজা অঞ্চলের প্রভাবশালী আদিবাসী নেতা আবদুল রহমান আল-জোবায়ের তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তাঁর মতে, ইরাকের নিজস্ব সামরিক ও গোয়েন্দা বাহিনী একা পুরো দেশের নিরাপত্তা ধরে রাখার জন্য এখনো শতভাগ প্রস্তুত নয়। মার্কিন সৈন্যদের এই আকস্মিক ও পূর্ণাঙ্গ বিদায় দেশের নিরাপত্তা বলয়ে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করবে, যা আবার সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ করে দিতে পারে।

আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি: সবচেয়ে বেশি লাভবান ইরান?

ইরাকে অবস্থানরত ইরান সমর্থিত সশস্ত্র শিয়া গোষ্ঠীগুলো, বিশেষ করে ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স’ এই প্রত্যাহারকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের ‘ঐতিহাসিক জয়’ বলে আখ্যায়িত করেছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলির বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাগদাদ থেকে ওয়াশিংটনের বিদায়ে সবচেয়ে বড় কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছে গেল প্রতিবেশী তেহরান। গত দুই দশক ধরে মার্কিন বাহিনী ইরাকের মাটিতে ইরানের প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে একটি প্রাকৃতিক ভারসাম্য বা ‘বাফার’ হিসেবে কাজ করছিল।

এখন সেই বাধা অপসারিত হওয়ায়:

১. ইরাকের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তেহরানের পরোক্ষ প্রভাব কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।

২. তেহরান-সমর্থিত স্থানীয় মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো আরও বেপরোয়া ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠতে পারে।

৩. পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ইরান তার প্রক্সি নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী করার বাড়তি সুবিধা পাবে।

দীর্ঘ দুই দশকের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, হাজার হাজার সেনার প্রাণহানি এবং বিলিয়ন ডলার খরচের পর যুক্তরাষ্ট্রের এই চূড়ান্ত প্রস্থান কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রেই পরিবর্তন আনছে না, বরং ইরাকের ভবিষ্যৎকে এনে দাড় করেছে এক বিরাট পরীক্ষার মুখে।

এনএন/ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Scroll to Top