দাম কমায় ইউরোপের বাজারে পোশাক রপ্তানিতে বড় ধাক্কা

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক থেকে রপ্তানি আয় ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ কমেছে। চলতি বছর জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ১ হাজার ১৯৩ কোটি ইউরো মূল্যের পোশাক আমদানি করেছে ইইউ। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৫০ কোটি ইউরো। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ১৫৮ কোটি ইউরো।

রপ্তানিতে বড় ধাক্কা

ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বাংলাদেশের পোশাকের রপ্তানি পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অন্যদিকে, প্রতি কেজি পোশাকের গড় দাম কমেছে ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ। গত বছরের জানুয়ারি-আগস্টে প্রতি কেজি পোশাকের গড় দাম ছিল ১৪ দশমিক ৮৭ ইউরো, যা চলতি বছরের একই সময়ে কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরোতে।

তবে আগস্টের হিসাব কিছুটা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। ওই মাসে গত বছরের আগস্টের তুলনায় ইইউর মোট পোশাক আমদানি বেড়েছে শূন্য দশমিক ৭২ শতাংশ। আমদানির পরিমাণ কমলেও গড় দাম বেড়েছে ১ দশমিক ২৯ শতাংশ। ফলে সাম্প্রতিক মাসে বাজারে কিছুটা উন্নতির আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামগ্রিকভাবে ইইউর বাজারে পোশাক আমদানি কমে যাওয়ার পাশাপাশি দামের চাপও রয়েছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রপ্তানি পরিমাণের তুলনায় গড় দাম বেশি কমেছে। আগস্টের পরিসংখ্যানে কিছুটা উন্নতি দেখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা ঘুরে দাঁড়িয়েছে কি না, তা বুঝতে পরবর্তী মাসগুলোর রপ্তানি আয়, সরবরাহের পরিমাণ ও গড় দামের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

চাহিদা সংকোচনের প্রভাবে ইইউর পোশাক আমদানি কমেছে: চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বিশ্ববাজার থেকে ৬ হাজার ২৯ কোটি ইউরোর পোশাক আমদানি করেছে জোটটি। গত বছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ২৬৯ কোটি ইউরো। সে হিসাবে আমদানি কমেছে ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

এ সময়ে পোশাক আমদানির পরিমাণ কমেছে ২ দশমিক ৫৭ শতাংশ। পাশাপাশি প্রতি কেজি পোশাকের গড় দাম ১৯ দশমিক ৯১ ইউরো থেকে কমে ১৯ দশমিক ৬৫ ইউরো হয়েছে। অর্থাৎ ইইউর বাজারে পোশাক আমদানির পরিমাণ কমার পাশাপাশি গড় দামও নিম্নমুখী ছিল।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই দুই প্রভাবের মধ্যে দাম কমার প্রভাবই বেশি। রপ্তানির পরিমাণ ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ কমলেও গড় দাম কমেছে ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ফলে তুলনামূলক কম পোশাক রপ্তানি করে আগের চেয়ে অনেক কম আয় পেয়েছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল জানান, একদিকে ইউরোপের বাজারে চাহিদার সংকোচন। গড় দাম কমে যাওয়ার চাপ। পোশাক খাতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে চলেছে; কিন্তু ইউরোপীয় ক্রেতারা পোশাকের বাড়তি দাম দিতে চাচ্ছে না, উল্টো দাম পণ্যের দাম কমানোর চাপ দিচ্ছেন। এতে রপ্তানিকারকদের ওপর ব্যবসায়িক চাপ বেড়েছে।

বেশিরভাগ দেশের রপ্তানিতে পতন: বাংলাদেশের পাশাপাশি ইইউর বাজারে অন্যান্য প্রধান সরবরাহকারী দেশের রপ্তানি আয়ও কমেছে। এ সময়ে তুরস্কের রপ্তানি আয় কমেছে ১১ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ, ভারতের ১০ দশমিক ৮৪ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ১১ দশমিক ১২ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার ১১ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ, পাকিস্তানের ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ, মরক্কোর ৬ দশমিক ১০ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ।

তবে এসব দেশের রপ্তানি আয়ের পতনের পেছনে কারণ এক নয়। পাকিস্তানের পোশাক সরবরাহের পরিমাণ ৩ দশমিক ৮২ শতাংশ বাড়লেও প্রতি কেজির গড় দাম কমেছে ১২ দশমিক ৯৬ শতাংশ। ফলে দেশটির রপ্তানি আয় কমেছে। বিপরীতে, কম্বোডিয়ার পোশাক সরবরাহের পরিমাণ কমেছে ১১ দশমিক ৬৩ শতাংশ। তবে প্রতি কেজির গড় দাম ৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ বেড়েছে।

রপ্তানির বেড়েছে চীনের, ভিয়েতনামের বেড়েছে আয়: ইইউর বাজারে বড় সরবরাহকারীদের মধ্যে চীন একমাত্র দেশ, যার রপ্তানি আয় ও পরিমাণ—দুটিই বেড়েছে। বছরের প্রথম আট মাসে চীন থেকে ১ হাজার ৯৭১ কোটি ইউরোর পোশাক আমদানি করেছে ইইউ, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেশি। এ সময়ে চীনের পোশাক সরবরাহের পরিমাণ বেড়েছে ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ। তবে প্রতি কেজি পোশাকের গড় দাম কমেছে ১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ।

অন্যদিকে, ভিয়েতনামের রপ্তানি আয় বেড়েছে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। দেশটি থেকে ইইউর আমদানি দাঁড়িয়েছে ৩০০ কোটি ইউরোতে। তবে ভিয়েতনামের পোশাক সরবরাহের পরিমাণ কমেছে ৫ দশমিক ১৩ শতাংশ। গড় দাম ১০ দশমিক ১১ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় কম পরিমাণ পোশাক রপ্তানি করেও দেশটি বেশি আয় করেছে।

ইপিবি হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বিশ্ববাজারে রপ্তানি ইতিবাচক, দ্বিমত খাত সংশ্লিষ্টদের: রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানি ইতিবাচক ধারায় রয়েছে; এ সময় রপ্তানি আয় ৬ দশমিক ১০ শতাংশ বেড়েছে। এ সময় এ খাতে ১ হাজার ৫৮ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৯৯৭ কোটি ডলার। সর্বশেষ সেপ্টেম্বর মাসেও আগের বছর একই মাসের তুলনায় ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ বেশি রপ্তানি হয়েছে।

কিন্তু খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংকটের মুখে অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রপ্তানি বাড়েনি। বছরের ব্যবধানে হিসাব করায় রপ্তানি বেশি দেখাচ্ছে। কারণ আগের বছর এ সময়ে রপ্তানি কম ছিল। ইপিবির আলোচ্য তিন মাসের তথ্য বলছে, মাসের ব্যবধানে রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে কমেছে। চলতি বছর জুলাই মাসে যেখানে ৩৮৮ কোটি ৬৭ লাখ ডলারের রপ্তানি হয়েছে, সেখানে আগস্টে হয়েছে ৩৬০ কোটি ৮৮ লাখ ডলার। অর্থাৎ ৭ দশমিক ১৫ শতাংশ কমেছে। পরের মাস সেপ্টেম্বরেও ১৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ কমে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩০৮ কোটি ২৯ লাখ ডলারে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, দেশের পোশাক খাত একের পর এক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে এ খাতের রক্তক্ষরণ হলেও, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নানা উপায়ে, বাড়তি খরচ করেও রপ্তানি ধরে রেখেছেন। এ জন্য তাদের আর্থিক ক্ষতি মেনে নিতে হচ্ছে। কিন্তু ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো পারছে না, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে বিশ্ব বাজারে চাহিদা কমে গেছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলেও ক্রেতারা দাম বাড়াতে চান না। সবমিলিয়ে কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে।

Scroll to Top