ঢাকার বাস টার্মিনাল বাইরে সরাতে সামনে ৭ বড় চ্যালেঞ্জ | চ্যানেল আই অনলাইন

ঢাকার বাস টার্মিনাল বাইরে সরাতে সামনে ৭ বড় চ্যালেঞ্জ | চ্যানেল আই অনলাইন

রাজধানীর যানজট কমাতে ঢাকার চারটি প্রধান বাস টার্মিনাল শহরের বাইরে স্থানান্তরের সরকারি সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের আগে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদ, যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টরা।

বর্তমানে সায়েদাবাদ, গাবতলী, মহাখালী ও ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল ঘিরে তীব্র যানজট, সড়কে দূরপাল্লার বাসের অপেক্ষা এবং বিশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থাপনা রাজধানীর অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ অবস্থায় গত ১৫ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব টার্মিনাল ঢাকা শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাবতলী টার্মিনাল সাভারের হেমায়েতপুরে, সায়েদাবাদ টার্মিনাল কাঁচপুরে, ফুলবাড়িয়া টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে এবং মহাখালী টার্মিনাল আপাতত পূর্বাচলে স্থানান্তর করা হবে। পরে মহাখালী টার্মিনাল টঙ্গির কাছাকাছি সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু টার্মিনাল সরিয়ে নিলেই যানজট সমস্যার সমাধান হবে না। এজন্য অন্তত সাতটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

বাস্তবায়নে সমন্বয়ের অভাব

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, বাজেট বৃদ্ধি এবং সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল পায় না। অতীতেও ঢাকার বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সহ-সভাপতি শেখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসানের মতে, সম্ভাব্যতা যাচাই, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ছাড়া এ ধরনের প্রকল্প সফল হওয়ার ঝুঁকি কম।

অবকাঠামো নির্মাণের বড় চ্যালেঞ্জ

টার্মিনাল স্থানান্তরের জন্য বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ, আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ, যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা এবং বাস রাখার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল কাজ।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নতুন স্থাপনাগুলোকে যাত্রীবান্ধব টার্মিনালের পাশাপাশি কার্যকর বাস ডিপো হিসেবেও পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে বাসগুলো সড়কে দাঁড়িয়ে থেকে নতুন করে যানজট সৃষ্টি না করে।

টার্মিনাল থেকে ঢাকায় যাতায়াত

শহরের বাইরে নামার পর যাত্রীরা কীভাবে সহজে ও কম খরচে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছাবেন, সেটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শাটল সার্ভিস বা উন্নত সংযোগ পরিবহন ব্যবস্থা ছাড়া টার্মিনাল স্থানান্তর করলে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়তে পারে।

নতুন এলাকায় যানজটের আশঙ্কা

টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়ার ফলে ঢাকার ভেতরের পরিবর্তে শহরের প্রবেশপথগুলোতে যানজটের চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল হক হাদিউজ্জামান মনে করেন, কাঁচপুর বা হেমায়েতপুরের মতো এলাকায় একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক যাত্রী নামলে তারা বিভিন্ন বাহনে করে ঢাকায় প্রবেশের চেষ্টা করবেন, যা নতুন যানজটের জন্ম দিতে পারে।

বাস রুট রেশনালাইজেশন এখনও অসম্পূর্ণ

ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা ও রুট রেশনালাইজেশনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, টার্মিনাল স্থানান্তরের পাশাপাশি বাস পরিচালনা ও রুট ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা না এলে যানজট কমানোর লক্ষ্য পূরণ হবে না।

মালিক-শ্রমিক সংগঠনের প্রভাব

পরিবহন খাতের মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর স্বার্থ, রুট পারমিট, আয়ের কাঠামো এবং বিভিন্ন প্রভাববলয় পরিবর্তনের বিষয়টি বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক চাপমুক্ত থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করাই হবে সবচেয়ে কঠিন প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।

যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা

শহরের বাইরে নতুন টার্মিনালগুলোতে বিশেষ করে রাত ও ভোরের সময় যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, আধুনিক ওয়েটিং লাউঞ্জ, পর্যাপ্ত আলো, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, খাবার ও স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত না হলে যাত্রীরা এসব টার্মিনাল ব্যবহার করতে অনাগ্রহী হতে পারেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, টার্মিনাল স্থানান্তর রাজধানীর যানজট নিরসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলেও সফল বাস্তবায়নের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা, উন্নত গণপরিবহন ব্যবস্থা এবং যাত্রীসেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু স্থান পরিবর্তন নয়, পুরো পরিবহন ব্যবস্থার সংস্কারই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের চাবিকাঠি।

Scroll to Top