ঠাকুরগাঁওয়ে মহা ধুমধামে বট-পাকুড়ের বিয়ে | চ্যানেল আই অনলাইন

ঠাকুরগাঁওয়ে মহা ধুমধামে বট-পাকুড়ের বিয়ে | চ্যানেল আই অনলাইন

কনেপক্ষের বাড়িতে তখন উলুধ্বনির রোল। বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগে শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে চলছে মন্ত্রপাঠ। প্যান্ডেলের নিচে উপচে পড়া ভিড়, আমন্ত্রিতদের জন্য ভুরিভোজের এলাহি আয়োজন। বর-কনেকে আশীর্বাদ করতে হাজির হয়েছেন কয়েকশ প্রতিবেশী।

এ পর্যন্ত দৃশ্যপট অত্যন্ত চেনা ঠেকলেও, চমক ছিল অন্যত্র। কারণ এই বিয়ের পাত্র ‘পাকুড়’ এবং পাত্রী ‘বট’।

​শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার চিলারং ইউনিয়নের কিসমত পাওয়ার ভাঙ্গা এলাকায় গ্রামবাংলার লুপ্তপ্রায় এক লোকজ ঐতিহ্যের সাক্ষী হলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দুই গাছের এই পরিণয়কে কেন্দ্র করে এলাকাজুড়ে তৈরি হয়েছিল উৎসবমুখর পরিবেশ।

​পুরোহিত শুভন চক্রবর্তীর বিধান মেনে ঠিক যেভাবে মানুষের বিয়ে হয়, সেভাবেই সম্পন্ন হলো সব আচার।

ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, বট এবং পাকুড় গাছ যদি পাশাপাশি ১ দশমিক ৫ থেকে ২ ফুটের ব্যবধানে থাকে, তবে তাদের বিয়ে দেওয়া বিধেয়।

পুরোহিতের কথায়, ‘‘সমস্ত বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করেই এই বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। এই আয়োজন সংশ্লিষ্ট পরিবার ও এলাকার জন্য মঙ্গলদায়ক বলেই আমাদের বিশ্বাস।’’

​এই বিরল বিয়ের সাক্ষী হতে আয়োজনের ত্রুটি রাখেননি উদ্যোক্তারা। কনে বটগাছের ‘পিতা’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন স্থানীয় ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা পরিমল চন্দ্র বর্মন। তিনি জানালেন, বছর চারেক আগে তিনি বটটি লাগিয়েছিলেন। তার বছরখানেক পর পাশেই মাথা তোলে পাকুড়। প্রবীণদের পরামর্শে প্রকৃতির মঙ্গল কামনায় তিনি এই বিয়ের আয়োজন করেন।

অন্যদিকে, ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বলরাম সরকার সামলেছেন বরপক্ষ অর্থাৎ পাকুড় গাছের যাবতীয় দায়িত্ব। বলরামবাবুর কথায়, ‘‘পরিবারের বড়দের সঙ্গে নিয়ে মহাসমারোহে এই বিয়ে দিচ্ছি। আত্মীয়-স্বজন ও এলাকাবাসী মিলিয়ে প্রায় ৪০০ পরিবারকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে।’’

​আধুনিকতার চাপে যখন সবুজ ধ্বংসের কারবার চলছে চারদিকে, তখন দুই বৃক্ষের এই মিলন দেখতে কৌতূহলী মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।

প্রাক্তন ইউপি সদস্য রেজাউল ইসলাম আপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘‘জীবনে প্রথম গাছের বিয়ে দেখলাম। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আর উৎসবের মেজাজ সত্যিই মুগ্ধ করার মতো।’’

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একাংশের বিশ্বাস, বট-পাকুড়ের এই মিলন গ্রাম থেকে অশুভ শক্তিকে দূরে রাখে। তবে ধর্মীয় বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে উঠে প্রকৃতির প্রতি মানুষের এই সযত্ন মমত্ববোধ এবং শিকড় সন্ধানী সংস্কৃতিই এখন সুধী মহলে প্রশংসিত হচ্ছে।

ঠাকুরগাঁওয়ের এই ‘গাছ-বিয়ে’ কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং প্রকৃতির প্রতি মানুষের ভালোবাসার এক অনন্য স্মারক হয়ে রইল।

Scroll to Top