ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট র‍্যাঙ্কিং নিয়ে যত প্রশ্ন! | চ্যানেল আই অনলাইন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন কিছুর ওপর নিজের নাম জুড়ে দেওয়ায় বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের একটি র‌্যাঙ্কিংও।

সংবাদমাধ্যম সিএনএন এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি গ্রাফিক শেয়ার করে ট্রাম্প নিজেকে সর্বকালের সেরা প্রেসিডেন্ট হিসেবে দাবি করেছেন। তালিকায় তার অবস্থান জর্জ ওয়াশিংটন ও আব্রাহাম লিংকনেরও ওপরে।

তালিকাটি কোথা থেকে এসেছে তা স্পষ্ট নয়। তবে এটি তৈরির ক্ষেত্রে খুব বেশি যাচাই-বাছাই করা হয়নি বলেই মনে হচ্ছে। ট্রাম্পের নাম সবার ওপরে রাখার বিষয়টি ছাড়াও তালিকাটিতে বেশ কিছু অসংগতি রয়েছে। বর্তমানে ট্রাম্পের জনসমর্থনও ৩০ শতাংশের মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছে। তালিকাটি নিয়ে হোয়াইট হাউসের কাছে জানতে চেয়েছে সিএনএন।

এদিকে রক্ষণশীল রাজনৈতিক ভিত্তির সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক যখন নানা প্রশ্নের মুখে, তখন এমন তালিকা প্রকাশ তাদের মধ্যে থাকা কিছু আপত্তিকে আরও জোরালো করতে পারে।

এফডিআর, উইলসন ও জ্যাকসন সেরা কেন?

জর্জ ওয়াশিংটন, আব্রাহাম লিংকন ও থমাস জেফারসনের সঙ্গে ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট, উড্রো উইলসন ও অ্যান্ড্রু জ্যাকসনকে ‘সেরা’ প্রেসিডেন্টদের তালিকায় রাখায় অনেক রক্ষণশীল ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ছিলেন নিউ ডিল নীতির প্রধান উদ্যোক্তা। তার সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা ও পরিধি দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আকারে সম্প্রসারিত হয়।

উড্রো উইলসনও সরকারের পরিধি বাড়ানোর জন্য রক্ষণশীলদের কাছে বিতর্কিত। তার সময়ে ফেডারেল আয়কর চালু হয়। রক্ষণশীল কলামিস্ট জর্জ উইল এমনকি বলেছেন, উইলসন ২০ শতককে ধ্বংস করেছেন।

অ্যান্ড্রু জ্যাকসনও বিতর্কের বাইরে নন। দাস মালিকানা ও আদিবাসীদের প্রতি তার নীতির কারণে ডেমোক্র্যাটরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজেদের তহবিল সংগ্রহের নৈশভোজের নামকরণে তার নাম ব্যবহার থেকে সরে এসেছে।

ট্রাম্পও হয়তো তালিকার অন্তত একজনকে নিয়ে মত বদলেছেন। শুক্রবার সকালে তিনি আরেকটি গ্রাফিক প্রকাশ করেন, যেখানে উইলসনকে সেরা শ্রেণি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। নতুন তালিকায় উইলসনকে আমেরিকাকে ধ্বংস করা পাঁচ প্রেসিডেন্টের একজন হিসেবে দেখানো হয়েছে।

কুলিজ গড়পড়তা কেন?

রক্ষণশীলদের কাছে ক্যালভিন কুলিজকে গড়পড়তা প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখানোও বিস্ময়কর। বরং ডানপন্থীদের কাছে তিনি দীর্ঘদিন ধরে অবমূল্যায়িত একজন প্রেসিডেন্ট এবং অনেকের কাছে রক্ষণশীলদের আইকন।

উড্রো উইলসন ও এফডিআরের সময়কার বড় সরকারের বিপরীতে কুলিজের সীমিত সরকারব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান রক্ষণশীলদের কাছে বিশেষভাবে প্রশংসিত। এমনকি আধুনিক রক্ষণশীলতার উত্থানের পেছনেও কেউ কেউ সাইলেন্ট ক্যাল-এর ভূমিকা দেখেন।

অ্যান্ড্রু জনসন গড়পড়তা তালিকায়

অ্যান্ড্রু জনসনকে সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ব্যর্থ প্রেসিডেন্টদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে গৃহযুদ্ধের পর পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সামলাতে তার ব্যর্থতার কারণে তিনি সমালোচিত। তিনি অভিশংসনেরও মুখোমুখি হয়েছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের নিয়ে নিয়মিত বিশেষজ্ঞ জরিপ পরিচালনা করা সিয়েনা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জরিপে গত ২০ বছর ধরে জনসন সবচেয়ে নিচের অবস্থানে রয়েছেন।

তাহলে ট্রাম্প কেন তাকে তুলনামূলকভাবে ‘খারাপ নন’ বলে মনে করছেন, সেটিও প্রশ্নের বিষয়।

ম্যাককিনলেকে কি ভুলে গেলেন ট্রাম্প?

উইলিয়াম ম্যাককিনলেকেও ট্রাম্পের চোখে যেন অবনমন করা হয়েছে। অথচ ২০২৫ সালের বড় একটি সময়জুড়ে ট্রাম্প ম্যাককিনলেকে ‘মহান’ প্রেসিডেন্ট হিসেবে তুলে ধরেছিলেন এবং শুল্কনীতির মাধ্যমে কীভাবে আমেরিকাকে শক্তিশালী করা যায়, তার উদাহরণ হিসেবে তার প্রশংসা করেছিলেন।

এমনকি ম্যাককিনলেকে মহান প্রেসিডেন্ট আখ্যা দিয়ে আলাস্কার একটি পর্বতের নামও তার নামে ফিরিয়ে দেন ট্রাম্প।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, ম্যাককিনলি ছিলেন একজন মহান প্রেসিডেন্ট, যিনি কখনো প্রাপ্য স্বীকৃতি পাননি।

অথচ নতুন তালিকায় ম্যাককিনলেকেই সেই স্বীকৃতি না দেওয়া প্রেসিডেন্টদের কাতারে রাখা হয়েছে।

গ্রান্টকে ব্যর্থ বলা নিয়েও প্রশ্ন

ইউলিসিস এস. গ্রান্টের প্রেসিডেন্ট হিসেবে সময় তার গৃহযুদ্ধের সময় ইউনিয়ন বাহিনীর নেতৃত্বের মতো প্রশংসিত নয়। রাজনীতিবিদ হিসেবেও তিনি খুব দক্ষ ছিলেন না। তবে তাকে সরাসরি ব্যর্থ বলা কতটা যথাযথ, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

২০২২ সালে রিপাবলিকান সিনেটর টম কটন এক নিবন্ধে গ্রান্টকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাগরিক অধিকারবিষয়ক প্রেসিডেন্ট হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, উদারপন্থীরা একজন আমেরিকান বীরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন।

কটন লিখেছিলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্রান্টকে নিয়ে প্রচলিত নেতিবাচক ইতিহাস নতুন করে মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং ওয়াশিংটন ও লিংকনের মতোই গ্রান্টও আমেরিকার ইতিহাসের অপরিহার্য ব্যক্তিদের একজন।

ট্রাম্পের তালিকায় গ্রান্টকে ব্যর্থ হিসেবে দেখে কটন কী ভাববেন, সেটিও এখন কৌতূহলের বিষয়।

বেশ কয়েকজন প্রেসিডেন্ট তালিকাতেই নেই

ট্রাম্পের প্রকাশিত গ্রাফিকের অন্যতম বড় সমস্যা হলো, এতে অনেক প্রেসিডেন্টকেই র‌্যাঙ্কিংয়ের বাইরে রাখা হয়েছে।

তালিকায় নেই রোনাল্ড রিগ্যান, জেরাল্ড ফোর্ড, রিচার্ড নিক্সন, লিন্ডন জনসন, জন এফ. কেনেডি, ডুইট আইজেনহাওয়ার, হ্যারি ট্রুম্যান এবং জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ও জর্জ ডব্লিউ বুশ।

এর কারণ কী?

গ্রাফিকটি ১৯৪৮ সালে লাইফ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি তালিকার সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায় বলে মনে হচ্ছে। পার্থক্য হলো, ট্রাম্পকে নতুন করে সর্বকালের সেরা শ্রেণিতে যুক্ত করা হয়েছে। বিল ক্লিনটনকে রাখা হয়েছে গড়পড়তা শ্রেণিতে। আর জো বাইডেন, বারাক ওবামা ও জিমি কার্টারকে রাখা হয়েছে ব্যর্থ প্রেসিডেন্টদের তালিকায়।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, আধুনিক সময়ের কিছু প্রেসিডেন্টকে যুক্ত করা হলেও রিগ্যান, নিক্সন বা জর্জ ডব্লিউ বুশের মতো অন্যদের কেন রাখা হলো না?

ট্রাম্প তাদের কোথায় রাখতেন, সেটিও জানার আগ্রহ রয়েছে। আরেকটি প্রশ্ন হলো, ডেমোক্র্যাট ক্লিনটন কেন বাইডেন, ওবামা ও কার্টারের মতো একই পরিণতি পেলেন না? এমনকি তাকে কুলিজেরও ওপরে রাখা হয়েছে।

হয়তো ট্রাম্পের মনে এখনো ক্লিনটনের জন্য কিছুটা আলাদা জায়গা রয়েছে।

Scroll to Top