মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক তৎপরতা আপাতত স্থির থাকলেও সেটিকে ঝড়ের আগের নীরবতা বলে ইঙ্গিতপূর্ণ সতর্কবার্তা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সময়ে তার শীর্ষ উপদেষ্টাদের সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় বিমান হামলা শুরুর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
নিজের সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ছবিতে ট্রাম্পকে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (মাগা) টুপি পরে দেখা যায়। তার পাশে ছিলেন মার্কিন নৌবাহিনীর এক অ্যাডমিরাল। ছবির পটভূমিতে উত্তাল সমুদ্র, বজ্রপাত, একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এবং দূরে ইরানি জাহাজ দেখা যায়।
ছবিটির সঙ্গে দেওয়া বার্তায় লেখা ছিল, এটি ছিল ঝড়ের আগের নীরবতা। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইরানের প্রতি এক ধরনের সতর্ক সংকেত। কারণ, মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কূটনৈতিক অচলাবস্থা ভাঙতে প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের বিষয়ে ট্রাম্প তার শীর্ষ উপদেষ্টাদের সঙ্গে আলোচনা করছেন।
এমন এক সময় এই বার্তা দিয়েছেন ট্রাম্প, যখন মধ্যপ্রাচ্যে ৮ এপ্রিল কার্যকর হওয়া নাজুক যুদ্ধবিরতি এখনও বহাল রয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন নেতার সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করছেন ট্রাম্প।
ইরানের সঙ্গে দ্রুত শান্তি চুক্তি না হলে দেশটি খুব খারাপ সময়ের মুখোমুখি হবে বলেও সতর্ক করেছেন ট্রাম্প। ফরাসি সম্প্রচারমাধ্যমকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তাদের (ইরানের) একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর স্বার্থ রয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি শুক্রবার (১৫ মে) জানান, ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে নতুন আলোচনা শুরু করার আগ্রহের বার্তা পেয়েছে তেহরান। তবে ওয়াশিংটনের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে অবিশ্বাস এখনো রয়ে গেছে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
গত মাসে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও স্থায়ী শান্তি চুক্তি এখনো অনিশ্চিত। এই সময়েও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারস্পরিক হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র তার গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন বজায় রেখেছে। যদিও বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড ১১ মাসের দীর্ঘ মোতায়েন শেষে দেশে ফিরেছে, যা ভিয়েতনাম যুদ্ধ পরবর্তী সময়ের মধ্যে দীর্ঘতম।
গত মাসে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হয়। কারণ, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষ ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই সামুদ্রিক পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
এ বিষয়ে ট্রাম্প চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সঙ্গে আলোচনা করেছেন। শিগগিরই তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলেও জানা গেছে। ইরানের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে চীন হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
চীন সফর শেষে প্রেসিডেন্টের সরকারি বিমান এয়ার ফোর্স ওয়ান-এ সাংবাদিকদের ট্রাম্প দাবি করেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে। পাশাপাশি তিনি বলেন, মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে গত আড়াই সপ্তাহে ইরানের প্রতিদিন প্রায় ৫০ কোটি ডলার ক্ষতি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখন বহু দেশের অংশগ্রহণে বিস্তৃত হয়েছে। শনিবার (১৬ মে) আলোচনা সহজ করতে তেহরানে পৌঁছেছেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি। এর কয়েকদিন আগে দেশটির সেনাপ্রধান অসীম মুনির সফর করেন।
এদিকে, ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ গত মঙ্গলবার (১২ মে) সতর্ক করে বলেন, তেহরানের ১৪ দফা শান্তি প্রস্তাব গ্রহণ ছাড়া অন্য কোনো উদ্যোগ সম্পূর্ণ অকার্যকর হবে। একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনার জন্য একটি পেশাদার কাঠামো চালুর ঘোষণা দেয় ইরান।
ইরানি পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আজিজি সামাজিক মাধ্যমে জানান, নির্ধারিত রুটে প্রজেক্ট ফ্রিডম-এর অপারেটরদের জন্য পথ বন্ধই থাকবে। তবে ইরানের সঙ্গে সহযোগিতাকারী বাণিজ্যিক জাহাজ এ সুবিধা পাবে এবং বিশেষায়িত সেবার জন্য নির্ধারিত ফি আদায় করা হবে বলেও জানান তিনি।




