জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর: নারী, পাহাড় ও রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে ‘ন্যারেটিভ আলাপ’ অনুষ্ঠিত | চ্যানেল আই অনলাইন

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর: নারী, পাহাড় ও রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে ‘ন্যারেটিভ আলাপ’ অনুষ্ঠিত | চ্যানেল আই অনলাইন

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে নারী, পাহাড় ও রাষ্ট্র সংস্কারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর: নারী, পাহাড় ও সংস্কার প্রশ্ন’ শীর্ষক ন্যারেটিভ আলাপ। ন্যারেটিভ এবং ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসির (আইআইএলডি) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সংবিধান সংস্কার, গণতন্ত্র, নারীর অংশগ্রহণ, পাহাড়-সমতলের অন্তর্ভুক্তি এবং রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে আলোচনা করেন দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা।

অনুষ্ঠানে সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ও সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার ইমরান আব্দুল্লাহ সিদ্দিক বলেন, রাষ্ট্রের মূল সংকট ছিল ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ। তিনি বলেন, “আমাদের মূল সমস্যা ছিল যে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ। এই কাঠামোটা কীভাবে ভেঙে ফেলা যায়, কীভাবে আমরা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করব, কীভাবে আমরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংবিধানে ভারসাম্য সৃষ্টি করতে পারি সেটাই ছিল মূল লক্ষ্য।” তিনি প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদ নির্ধারণ এবং সংসদে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন। ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে, যাতে গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনতে আমাদের আবার অধিক মূল্য দিতে না হয়। কারণ সেই মূল্য সবসময় তরুণরাই দেয়।”

আইনজীবী ও অ্যাক্টিভিস্ট হাবিবুর রহমান বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম অর্জন হলো উন্মুক্ত আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি হওয়া। তার ভাষায়, “আমরা যে এখন আলোচনা করছি, একটা প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি এটাই হচ্ছে জুলাইয়ের সফলতা, কারণ জুলাইয়ের পূর্বে আমরা এভাবে কথা বলতে পারতাম না।” সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তিনি সংসদীয় প্রক্রিয়া ও সংবিধান সংশোধনকে সবচেয়ে টেকসই এবং আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য পথ হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি সংবিধানের ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ নিয়েও বক্তব্য দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জ্যোতিষী চাকমা জুলাই আন্দোলনে পাহাড় ও সমতলের মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, “আমরা যখন জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস স্মরণ করি, তখন সমতলের জনগণের পাশাপাশি পাহাড়ি নারী-পুরুষের অবিচ্ছেদ্য অংশগ্রহণ ছিল।” তিনি পাহাড়ি নারীদের শুধু উন্নয়নের সুবিধাভোগী নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি কল্পনা চাকমার বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান। তিনি বলেন, “জুলাই আন্দোলনের সফলতা তখনই নিশ্চিত হবে, যখন পাহাড়ি-সমতলের নারী-পুরুষ, সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু সবাই নিরাপত্তা ও মর্যাদা পাবে।”

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সংসদ সদস্য বীথিকা বিনতে হোসাইন বলেন, দলের মূল দর্শন হলো ধর্ম, শ্রেণি, পাহাড়, সমতল এবং ক্ষুদ্র-বৃহৎ সব জাতিগোষ্ঠীর মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক, অংশীদারিত্বমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। তিনি সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন এবং নারীদের নিজস্ব অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ডেইলি ওয়াদা পত্রিকার সম্পাদক শফিকুল আলম রাষ্ট্রে নাগরিকের সমঅধিকার নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে বলেন, “একজন নাগরিক হিসেবে আমার অধিকারগুলো যেন সুরক্ষিত হয়। আমি হিন্দু হতে পারি, বৌদ্ধ হতে পারি, আস্তিক কিংবা নাস্তিক হতে পারি।” তিনি আরও বলেন, “খুন কিংবা গুমের রাজনীতি যাতে না ফিরে আসে এমন সংস্কার প্রত্যাশা করি। আমরা এমন একটা দেশ যেন পাই যেখানে সবার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।”

আলোচনার শেষ পর্যায়ে বক্তারা নারী, পাহাড় ও রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে নিজেদের আশা-প্রত্যাশা তুলে ধরেন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অর্জন, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে মতবিনিময় করেন। তারা একটি অংশগ্রহণমূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংস্কার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

Scroll to Top