জুলাই গণঅভ্যুত্থান অংশগ্রহণকারীদের সুরক্ষায় বিল পাস

জুলাই গণঅভ্যুত্থান অংশগ্রহণকারীদের সুরক্ষায় বিল পাস

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার, নতুন মামলা যাতে না হয় তার ব্যবস্থা এবং হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উঠলে তার তদন্ত জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মাধ্যমে করার বিধান রেখে অন্তর্বর্তী সরকার যে অধ্যাদেশ জারি করেছিল, তা জাতীয় সংসদে বিল আকারে পাস হয়েছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান অংশগ্রহণকারীদের সুরক্ষায় বিল পাস

বিলে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই ও অগাস্টে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যেই এ আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে।

বুধবার বিরতির পর সাড়ে ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) বিল, ২০২৬’ উত্থাপনের অনুমতি চান।

এ সময় আপত্তি তোলেন জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির সদস্য আবুল হাসনাত (হাসনাত আবদুল্লাহ)। তবে কণ্ঠভোটে তার আপত্তি নাকচ হয়। পরে বিলটি সংসদে উত্থাপিত হলে তা সংসদ সদস্যদের সায় পায়।

বিলটি এখন রাষ্ট্রপতির কাছে যাবে, তিনি স্বাক্ষর করলে তা আইন হিসেবে কার্যকর হবে।

প্রস্তাবিত এই আইনের সংজ্ঞা অংশে ‘গণঅভ্যুত্থানকারী’ বলতে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিকে, বোঝানো হয়েছে। আর ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ বলতে ২০২৪ সালের জুলাই ও অগাস্টে ছাত্র-জনতার সম্মিলিত আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানকে বোঝানো হয়েছে।

প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের কারণে গণঅভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা প্রত্যাহার করা হবে। একই সঙ্গে ধারা ৫-এর বিধান সাপেক্ষে এ ধরনের ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে নতুন কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা দায়েরও আইনত বারিত থাকবে।

তবে মামলা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে সরকারের প্রত্যয়ন লাগবে। সরকার যদি প্রত্যয়ন করে যে কোনো গণঅভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়ার কারণে দায়ের করা হয়েছে, তাহলে পাবলিক প্রসিকিউটর বা সরকারনিযুক্ত আইনজীবী সংশ্লিষ্ট আদালতে আবেদন করবেন।

বিলে বলা হয়েছে, ওই আবেদন দাখিলের পর আদালত আর মামলা বা কার্যধারা সম্পর্কে কোনো পদক্ষেপ নেবে না, তা প্রত্যাহার হয়েছে বলে গণ্য হবে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি অবিলম্বে অব্যাহতিপ্রাপ্ত বা ক্ষেত্রমতে খালাসপ্রাপ্ত হবেন।

তবে বিলটিতে একটি ব্যতিক্রমও রাখা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে কোনো গণঅভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ থাকলে তা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে দাখিল করা যাবে এবং কমিশন ওই অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা নেবে।

তবে যে ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তি কোনো প্রতিষ্ঠান বা বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠান বা বাহিনীতে বর্তমানে বা আগে কর্মরত এমন কাউকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। তদন্ত চলাকালে কাউকে গ্রেপ্তার বা হেফাজতে নেওয়ার প্রয়োজন হলে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখিয়ে কমিশনের পূর্বানুমোদন নিতে হবে।

বিলে ‘বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অপরাধমূলক অপব্যবহার’ এবং ‘রাজনৈতিক প্রতিরোধ’ আলাদা করে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।

‘রাজনৈতিক প্রতিরোধ’ বলতে ফ্যাসিস্ট শাসকের পতন ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে সংঘটিত কার্যাবলি বোঝানো হয়েছে। আর ‘বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অপরাধমূলক অপব্যবহার’ বলতে রাজনৈতিক প্রতিরোধের পরিবর্তে সঙ্কীর্ণ ও ব্যক্তিগত স্বার্থে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডকে বোঝানো হয়েছে।

বিল উত্থাপনের সময় আপত্তি তুলে আবুল হাসনাত বলেন, বিলে ‘কমিশন’ বলতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে বোঝানো হয়েছে। আবার সংজ্ঞা অংশে ‘বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অপরাধমূলক অপব্যবহার’ এবং ‘রাজনৈতিক প্রতিরোধ’ আলাদা করে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

এনসিপির এ সদস্যের প্রশ্ন ছিল, সঙ্কীর্ণ ও ব্যক্তিগত স্বার্থে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড আর রাজনৈতিক প্রতিরোধের অংশ হিসেবে সংঘটিত কার্যাবলির মধ্যে পার্থক্য কে নির্ধারণ করবে।

তিনি বলেন, প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী এই নির্ধারণের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপরই পড়ছে। কিন্তু মানবাধিকার কমিশনের বর্তমান কাঠামো যদি সরকারনিয়ন্ত্রিত থাকে, তাহলে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ অনুসন্ধান প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

আবুল হাসনাত বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে মন্ত্রণালয়ের অধীনে রেখে এ ধরনের সংবেদনশীল অনুসন্ধানের দায়িত্ব দিলে তা নিয়ে আস্থা তৈরি হবে না।

কমিশনকে স্বতন্ত্র ও স্বশাসিত করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, তা না হলে এই আইন কাগজে থাকলেও বাস্তবে এর কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাবে।

জুলাই আন্দোলনের সামনের সারির অন্যতম এই নেতা বলেন, সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণের অভিযোগ যখন উঠছে, তখন মানবাধিকার কমিশনও একইভাবে প্রভাবিত হবে না, সেই নিশ্চয়তা নেই।

তার ভাষায়, “কমিশন স্বাধীন না হলে জুলাই-সংক্রান্ত সুরক্ষার এই কাঠামোও কার্যকর হবে না।”

এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের সাংবিধানিক ও আইনি সুরক্ষা দেওয়া এখন জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে।

তার ভাষায়, “জুলাই যোদ্ধাদের দাবির প্রেক্ষিতেই এ উদ্যোগ এসেছে এবং জুলাই জাতীয় সনদেও এ বিষয়ে অঙ্গীকার রয়েছে।”

মন্ত্রী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতার ওপর ‘গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগ এবং তাদের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ নিপীড়ন চালিয়েছিল। প্রতিরোধের মুখে অনেকে প্রাণও হারিয়েছেন। সেই বাস্তবতায় তাদের জন্য আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা দরকার বলেই সরকার এই অধ্যাদেশ জারি করেছিল।

তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বিল নিয়ে কারও সংশোধনী থাকলে তা আগের ধাপে আনা যেত। এই পর্যায়ে এসে মূল নীতিগত প্রশ্ন তুলে বিল উত্থাপন ‘ঠেকানোর’ সুযোগ নেই।

মানবাধিকার কমিশন বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকার একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন করতে চায়। তবে গুমবিরোধী আইন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-সংক্রান্ত আইন এবং মানবাধিকার কমিশনের কাঠামোর মধ্যে কিছু মিল ও ‘ওভারল্যাপ’ আছে। সে কারণে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ কাঠামো চূড়ান্ত করতে হবে।

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা ব্যবস্থার কিছু সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। সেই কারণেই বিলটি আনা হয়েছে।

পরে স্পিকার আপত্তিটি ভোটে দিলে তা কণ্ঠভোটে নাকচ হয়। এরপর বিল উত্থাপনের অনুমতি দেওয়া হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন এবং তা সংসদ সদস্যদের সায় পায়।

প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, তদন্তে যদি প্রতীয়মান হয় অভিযোগসংশ্লিষ্ট কাজটি ‘বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অপরাধমূলক অপব্যবহার’ ছিল, তাহলে মানবাধিকার কমিশন সংশ্লিষ্ট এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতে প্রতিবেদন দেবে। আদালত সেই প্রতিবেদনকে পুলিশ প্রতিবেদন হিসেবে গণ্য করে পরবর্তী কার্যক্রম নেবে।

অন্যদিকে তদন্তে যদি প্রতীয়মান হয় অভিযোগসংশ্লিষ্ট কাজটি ‘রাজনৈতিক প্রতিরোধের’ অংশ ছিল, তাহলে কমিশন উপযুক্ত মনে করলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারকে আদেশ দিতে পারবে। সেক্ষেত্রে ওই কাজ সম্পর্কিত কোনো মামলা আদালতে দায়ের করা যাবে না এবং অন্য কোনো আইনগত কার্যধারাও নেওয়া যাবে না।

বিলে বলা হয়েছে, আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যা-ই থাকুক, এই আইনের বিধানই প্রাধান্য পাবে।

প্রস্তাবিত আইনটি ২০২৬ সালের ২৫ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য হবে এবং ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে বলবৎ হয়েছে বলেও গণ্য হবে।

রহিতকরণ ও হেফাজতের ধারায় বলা হয়েছে, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ রহিত হবে। তবে ওই অধ্যাদেশের অধীনে করা কোনো কাজ, নেওয়া কোনো ব্যবস্থা বা শুরু করা কোনো কার্যধারা এই আইনের অধীনে করা, নেওয়া বা শুরু করা হয়েছে বলে গণ্য হবে।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই ও অগাস্টে ছাত্র-জনতা ‘ফ্যাসিস্ট’ শাসকের পতন ঘটানোর মাধ্যমে ‘গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি সর্বাত্মক গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেয়, যা পরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গণঅভ্যুত্থান চলাকালে “ফ্যাসিবাদী সরকারের নির্দেশে পরিচালিত নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ও সশস্ত্র আক্রমণ প্রতিরোধ এবং জনশৃঙ্খলা পুনর্বহাল ও নিশ্চিত করিবার” প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া গণঅভ্যুত্থানকারীদের সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন বলেই এই বিল আনা হয়েছে।

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

বিলটি পাসের ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশটি সংসদের অনুমোদন পেয়ে আইনে পরিণত হবে।

Scroll to Top