
ঢাকা, ২৪ অক্টোবর – বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং এশিয়ার অর্থনৈতিক পরাশক্তি জাপানের সাথে অর্ধশতকের বন্ধুত্বকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে চার দিনের ঐতিহাসিক সরকারি সফরে টোকিও যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বিশেষ আমন্ত্রণে আগামী ২৬ অক্টোবর তিনি এই সফরে রওনা হবেন।
দুই দেশের ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ (Strategic Partnership) শক্তিশালী করার লক্ষ্যে এই সফরে চারটিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। সফর শেষে দুই শীর্ষ নেতার যৌথ স্বাক্ষরে প্রকাশিত হবে একটি গতিশীল ‘যৌথ বিবৃতি’ (Joint Statement), যা আগামী দিনগুলোতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বা রোডম্যাপ নির্ধারণ করবে।
প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারক ও সহযোগিতার ক্ষেত্রসমূহ:
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম নিশ্চিত করেছেন, দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট মোট ৮টি দলিল চূড়ান্তকরণের প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বড় ক্ষেত্রগুলো হলো:
কৃষি ও মৎস্য সম্পদ: উন্নত প্রক্রিয়াজাতকরণ, আধুনিক সংরক্ষণাগার ও গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ।
মানবসম্পদ ও দক্ষতা বৃদ্ধি: জাপানি শিল্প খাতের চাহিদানুযায়ী বাংলাদেশি দক্ষ কর্মীদের কারিগরি প্রশিক্ষণ ও ভাষা শিক্ষা প্রদান।
অন্যান্য কৌশলগত ক্ষেত্র: বেসামরিক বিমান চলাচল, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রসারণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী মন্তব্য করেছেন, জাপানি উন্নত প্রযুক্তির সাথে স্থানীয় খাতের এই মেলবন্ধন দেশের কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতায় অভূতপূর্ব প্রভাব ফেলবে। বড় বিনিয়োগের পাশাপাশি জাপানের মাঝারি আকারের কোম্পানির সাথে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের (SME) যৌথ অংশীদারত্ব জোরদারের ওপর তাগিদ দেন তিনি।
অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (EPA) ও মেগা প্রজেক্টের অর্থায়ন:
চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি’ (EPA) বাস্তবায়ন এবং জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের সুনির্দিষ্ট প্রবেশাধিকার সুনিশ্চিত করার বিষয়ে এ সফরে বিষদ আলোচনা হবে।
একই সাথে, ঢাকায় চলমান এমআরটি লাইন-১ (ব্যয় বৃদ্ধি ৮৩%) এবং এমআরটি লাইন-৫ (ব্যয় বৃদ্ধি ১১৩%)-এর মতো মেগা প্রকল্পগুলোর বর্ধিত ব্যয় এবং জাপানি ঋণের সুদের হার কমানোর বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে গুরুত্বের সাথে উত্থাপিত হবে। এ ছাড়া হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৩য় টার্মিনাল, গভীর সমুদ্রবন্দর মাতারবাড়ী এবং ‘বিগ-বি’ (Big-B) ফ্রেমওয়ার্কের সার্বিক অগ্রগতি পর্যালোচিত হবে।
কর্মসূচির হাইলাইটস ও কারখানা পরিদর্শন:
২৭ অক্টোবর: প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সাথে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও রাষ্ট্রীয় মধ্যাহ্নভোজ।
বাণিজ্যিক সম্মেলন: ‘জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে’ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন; পাশাপাশি জাইকা (JICA), জেবিআইসি (JBIC) ও জেট্রো (JETRO) প্রধানদের সাথে রুদ্ধদ্বার আলোচনা।
শিল্প পরিদর্শন: চিবায় অবস্থিত বিশ্বমানের এলএনজি (LNG) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং নাগোয়ার বিখ্যাত ‘টয়োটা’ (Toyota) কারখানা পরিদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই সফরের ৩টি বড় ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য:
বাণিজ্য বাড়াতে ইপিএ (EPA) বাস্তবায়ন: জাপানের বাজারে তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশী পণ্যের প্রবেশাধিকার সহজ করা এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর মোক্ষম সুযোগ।
অবকাঠামো অর্থায়নে স্বস্তি: মেগা প্রজেক্টে ঋণের সুদের হার কমানো বা শর্ত শিথিলের আলোচনা দেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমাবে।
আঞ্চলিক শান্তি ও রোহিঙ্গা কূটনীতি: অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা এবং রোহিঙ্গা প্রবাসীদের নিজ দেশে টেকসই প্রত্যাবাসনে জাপানের জোরালো সমর্থন আদায় করা।
এনএন/ ২৪ অক্টোবর ২০২৬



