মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র কি আমূল বদলে যাওয়ার পথে? ২০২৬ সালের শুরু থেকেই তেহরান ও তেল আবিবের মধ্যে যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছে, তা যেকোনো মুহূর্তে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘তৃতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধে’ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক মহড়া এবং তেহরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে।
কূটনীতির আড়ালে পরিকল্পিত ফাঁদ?
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জেনেভা ও ওমানে ইরান এবং পশ্চিমা শক্তিগুলোর মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অত্যন্ত গঠনমূলক আলোচনা চললেও, পর্দার আড়ালে যুদ্ধের দামামা বেজেছে। ইরান একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছিল যে, তারা উচ্চমাত্রাসমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতে কমিয়ে আনবে। কিন্তু এই আলোচনার টেবিলে যখন সমাধানের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল, তখনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান সমঝোতাকে ভেস্তে দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আলোচনাগুলো সম্ভবত একটি কৌশলগত সময়ক্ষেপণ ছিল। গত বছরের জুনেও যখন আলোচনার টেবিল উত্তপ্ত ছিল, তখনও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে সীমিত পরিসরে সাইবার ও ড্রোন হামলা চালিয়েছিল। এতে স্পষ্ট হয় যে, ওয়াশিংটন ও তেল আবিব কূটনৈতিক পথের চেয়ে সামরিক বিকল্পকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং মোসাদের সমন্বিত তৎপরতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
ট্রাম্পের ‘রেজিম চেঞ্জ’ নীতি ও কৌশলগত স্ববিরোধিতা
এই সম্ভাব্য সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা অত্যন্ত কৌতূহলপূর্ণ। ট্রাম্প ঐতিহাসিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর সরাসরি হস্তক্ষেপ বা ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’ (শাসন পরিবর্তন) নীতির বিরোধী ছিলেন। ২০২৩ সালে নিউ হ্যাম্পশায়ারের নির্বাচনী সমাবেশে তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, তিনি ওয়াশিংটনের ‘যুদ্ধবাজ’ রাজনীতিবিদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেবেন। এমনকি রিয়াদে দেওয়া ভাষণেও তিনি অন্য দেশ পুনর্গঠনের (নেশন বিলিন্ডিং) নামে ধ্বংসের রাজনীতির সমালোচনা করেছিলেন। তার মূলমন্ত্র ছিল ‘আমেরিকা ফার্স্ট’।
অথচ বর্তমানে ট্রাম্পের প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে এক বড় ধরণের যুদ্ধের পটভূমি তৈরি করছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যেকোনো সম্ভাব্য হামলাকে ‘প্রতিরোধমূলক’ (প্রি-ইম্পিটিভ) বলে রক্ষা করার চেষ্টা করলেও, ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘ চার দশক ধরে ইরানকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন। তার কৌশল হলো ইরানকে আঞ্চলিকভাবে একঘরে করে দেওয়া।
‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ও নতুন আঞ্চলিক আধিপত্যের নীল নকশা
এই উত্তেজনার লক্ষ্য কেবল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে এক সুদূরপ্রসারী ভূ-রাজনৈতিক পরিকল্পনা। ইসরায়েলি কট্টর ডানপন্থী নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ইদানীং ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ বা বৃহত্তর ইসরায়েলের ধারণাটি নিয়ে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। যদিও এটি কোনো দাপ্তরিক নীতি নয়, তবে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এবং কিছু ইসরায়েলি রাজনৈতিক নেতার বক্তব্যে ভূখণ্ডগত প্রভাব বিস্তারের প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামো দুর্বল করে দেওয়ার মাধ্যমে ইসরায়েল মূলত মধ্যপ্রাচ্যে তার একক সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত করতে চায়। বিশ্লেষকদের মতে, লক্ষ্য কেবল শাসক পরিবর্তন নয়, বরং ইরানকে একটি দুর্বল ও অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্ত রাষ্ট্রে পরিণত করা। এমনটি ঘটলে কুর্দিস্তান এবং বেলুচিস্তানের মতো সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা নতুন করে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
নতুন কৌশলগত অক্ষ: ভারত ও ইসরায়েলের সমীকরণ
এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে একটি নতুন এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে ভারতের উত্থান ঘটেছে। গত এক দশকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ইসরায়েলের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। গবেষক আজাদ এসার মতে, পশ্চিমা বিশ্বের বাইরে বর্তমানে ইসরায়েলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র হলো ভারত। ভারত বর্তমানে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে উন্নত সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন করছে। গাজা যুদ্ধের পর ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের প্রবেশ সংকুচিত হলে সেই শূন্যস্থান পূরণে ভারত থেকে শ্রমিক পাঠানোর বিষয়টিকেও একটি বড় কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারতের এই বিশাল জনশক্তি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ইসরায়েলের জন্য এক নতুন ‘কৌশলগত ঢাল’ হিসেবে কাজ করছে।
বাংলাদেশের ওপর প্রভাব
ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে তার প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইরান পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে রেখেছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ (২০% বা তার বেশি) এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। কাতারের গ্যাস রপ্তানি ব্যাহত হলে জ্বালানি বাজারে বিশ্বব্যাপী হাহাকার শুরু হবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির ওপর তার আঘাত হবে মারাত্মক। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনকে (বিপিসি) তখন তেল বিক্রির ওপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে, যা সরাসরি পরিবহন খরচ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে।
অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে যাত্রা
মধ্যপ্রাচ্য এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ইরানের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ, হয় তারা কূটনীতির মাধ্যমে নিজেদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো রক্ষা করবে, অথবা এক দীর্ঘমেয়াদী অরাজকতার দিকে ধাবিত হবে। যদি এ অঞ্চলে দীর্ঘ মেয়াদি বড় কোনো যুদ্ধ শুরু হয়, তবে এর ফলে তৈরি হওয়া শরণার্থী সংকট ইউরোপ ও এশিয়ার স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলবে। মার্কিন ভোটাররা হয়তো তখন প্রশ্ন তুলবেন, কেন যুক্তরাষ্ট্র আবারও এমন এক যুদ্ধে জড়াল যা এড়ানো সম্ভব ছিল। সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দেওয়ার এই ‘নীল নকশা’ বিশ্বকে এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা: লেখাটি ডেভিড হার্স্টের (সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক, মিডল ইস্ট আই) মূল বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে রচিত, যা প্রথম আলোতে ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত আকারে প্রকাশিত হয়েছে। সমসাময়িক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় অতিরিক্ত তথ্য ও উপাত্ত সংযোজিত হয়েছে।




