গ্রামগুলোকে মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে হবে

গ্রামগুলোকে মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে হবে

বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ গ্রামে বাস করে। অথচ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও নীতিনির্ধারণের আলোচনায় গ্রামীণ মানুষের অভিজ্ঞতা ও আকাঙ্ক্ষা সব সময় যথাযথ গুরুত্ব পায় না। গত দুই-তিন দশকে অর্থনীতি সম্প্রসারিত হয়েছে, কৃষি উৎপাদন বেড়েছে এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। তারপরও বহু গ্রামের মানুষের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, স্থায়ী আয় ও ন্যায়বিচারের সুযোগ সীমিত। এই ব্যবধান শুধু আয়বৈষম্যের প্রশ্ন নয়, রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের আস্থা ও অংশগ্রহণের সম্পর্কের সঙ্গেও তা জড়িত।

বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিতে কৃষির অবদান গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত বীজ, সেচ, যান্ত্রিকীকরণ ও কৃষকের পরিশ্রম উৎপাদন বাড়িয়েছে। কিন্তু উৎপাদন বাড়লেই কৃষকের আয় একই হারে বাড়ে না। উৎপাদন খরচ, মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব, সংরক্ষণব্যবস্থার ঘাটতি এবং বাজারে দর-কষাকষির সীমিত ক্ষমতা কৃষকের লাভ কমিয়ে দিতে পারে। জমির খণ্ডীকরণ ও জনসংখ্যার চাপও কৃষিনির্ভর পরিবারের জীবিকা কঠিন করে তুলছে। ফলে কৃষকের অনেক সন্তান কৃষিতে ভবিষ্যৎ না দেখে শহরমুখী হচ্ছে। কিন্তু শহরেও সবার জন্য পর্যাপ্ত ও মানসম্মত কাজ তৈরি হচ্ছে না।

কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে শিল্প ও সেবানির্ভর অর্থনীতিতে উত্তরণ উন্নয়নের স্বাভাবিক ধাপ। কিন্তু এই পরিবর্তনের ব্যয় যেন সীমিত আয়ের মানুষকে একা বহন করতে না হয়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি, সামাজিক সুরক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানকে তাই বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে নয়, সমন্বিত নীতি হিসেবে দেখতে হবে।

দুর্নীতি, দুর্বল তদারকি ও জবাবদিহির অভাবে অনেক সময় সরকারি কর্মসূচির সুফল প্রত্যাশিত মানুষের কাছে পৌঁছায় না। ইউনিয়ন পরিষদ, স্থানীয় প্রশাসন, আদালত ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা যদি হয় হয়রানি, দীর্ঘসূত্রতা বা প্রভাবশালীদের সুবিধা, তবে রাষ্ট্রের উপস্থিতি সেবার বদলে দূরত্বের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।

গ্রামীণ মানুষকে অবজ্ঞা বা করুণার চোখে নয়, সমান অধিকারসম্পন্ন নাগরিক ও উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। তাঁদের কথা শোনা ও সে অনুযায়ী নীতি বদলানো সম্ভব হলে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা বাড়বে, আর গ্রাম-শহরের ব্যবধান কমানোর পথও সুগম হবে।

এ কারণে শুধু বরাদ্দ বাড়ানো যথেষ্ট নয়; সেবা প্রদানের মান, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং অনিয়মের প্রতিকারও নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য প্রকাশ ও সামাজিক নিরীক্ষা এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

গ্রামীণ উন্নয়নে এনজিওগুলোর অবদানও গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষুদ্রঋণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে বহু সংস্থা কাজ করেছে। তবে উন্নয়নের পরিধিতে কারা বাদ পড়ছেন, সেই প্রশ্নও জরুরি। অনেক গ্রামীণ তরুণ-তরুণী নিজেদের দক্ষতা অনুযায়ী কাজ বা উদ্যোগ শুরু করার সুযোগ পান না। বিশেষ করে কৃষির বাইরে বিকল্প কর্মসংস্থান, কারিগরি প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন এবং স্থানীয় শিল্পের সঙ্গে বাজারের সংযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।

গ্রামাঞ্চলে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও নেতারা অনেক মানুষের আস্থা ও সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই বাস্তবতাকে অবজ্ঞা না করে শিক্ষা, দক্ষতা ও নাগরিক অংশগ্রহণের সুযোগ বিস্তৃত করতে হবে। মাদ্রাসাশিক্ষাসহ সব শিক্ষাব্যবস্থায় মানসম্মত সাধারণ শিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানে প্রবেশের পথ আরও সুগম করা প্রয়োজন।

রাষ্ট্রের সঙ্গে গ্রামের মানুষের দূরত্বের আরেকটি দিক রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব। ভোটের সময় যোগাযোগ থাকলেও স্থানীয় মানুষের মতামত বাজেট, উন্নয়ন প্রকল্প ও সেবার অগ্রাধিকারে কতটা প্রতিফলিত হয়, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কৃষক, শ্রমিক, খেতমজুর ও তরুণদের অভিজ্ঞতা রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় সরকারের সিদ্ধান্তে যথাযথভাবে জায়গা না পেলে নীতির সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক থেকেই যায়। প্রতিনিধিত্ব শুধু নির্বাচিত পদে কারা আছেন, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, জনপ্রতিনিধির জবাবদিহি এবং নিয়মিত জনশুনানিও এর অংশ।

তাই গ্রামীণ উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় মানুষের মতামতকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করা দরকার। কোন এলাকায় সেচ, সড়ক, সংরক্ষণাগার, বাজারসংযোগ, ইন্টারনেট বা স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি সবচেয়ে বেশি, তা স্থানীয় তথ্য ও পরামর্শের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা উচিত। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য পেতে উৎপাদক সমবায়, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ এবং সরাসরি বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকারকে প্রয়োজনীয় অর্থ, দক্ষ জনবল ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিতে হবে।

এ ক্ষেত্রে উন্নয়নের সাফল্য শুধু কত টাকা ব্যয় হলো বা কতটি অবকাঠামো নির্মিত হলো, তা দিয়ে মাপা উচিত নয়। বরং কত মানুষের আয় স্থায়ীভাবে বেড়েছে, কত তরুণ প্রশিক্ষণ শেষে কাজ পেয়েছেন, কৃষক উৎপাদিত পণ্যের কতটা ন্যায্য দাম পেয়েছেন এবং সেবাকেন্দ্রে মানুষের ভোগান্তি কতটা কমেছে—এসব সূচকও বিবেচনায় নিতে হবে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নীতি প্রণয়নের পাশাপাশি উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ফলাফল প্রকাশের ব্যবস্থা থাকলে স্থানীয় জনগণও অগ্রগতি যাচাই করতে পারবেন। এতে বরাদ্দের অপচয় কমানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অগ্রাধিকার বদলানো সহজ হবে। এ ধরনের জবাবদিহি উন্নয়নকে প্রকল্পনির্ভরতা থেকে বের করে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করবে।

গ্রামকে উন্নয়নের প্রান্তে রেখে জাতীয় অগ্রগতি টেকসই করা যাবে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু সহায়তা দেওয়া নয়; মানুষের সক্ষমতা বাড়ানো, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং উন্নয়নের সুফলে অংশ নেওয়ার বাস্তব সুযোগ তৈরি করা। সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, কৃষকের ন্যায্য আয় এবং তরুণদের কাজের সুযোগ—এসবকে একই পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। গ্রামীণ মানুষকে অবজ্ঞা বা করুণার চোখে নয়, সমান অধিকারসম্পন্ন নাগরিক ও উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। তাঁদের কথা শোনা ও সে অনুযায়ী নীতি বদলানো সম্ভব হলে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা বাড়বে, আর গ্রাম-শহরের ব্যবধান কমানোর পথও সুগম হবে।

  • মামুন রশীদ অর্থনীতি বিশ্লেষক। ফিন্যান্সিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের লিড পার্টনার

Scroll to Top