আগামীকাল পরীক্ষা। বই খুলেছ, কিন্তু হঠাৎ মনে হলো, একবার ইউটিউবে ঢুঁ মেরে আসি। শুরু করলে একের পর এক ভিডিও দেখা। এর মধ্যে বন্ধুর মেসেজ পেলে। চল গেম খেলি। শুরু করলে গেম খেলা। এর মধ্যে হুট করে কখন যে রাত রাত হয়ে গেল, টেরই পেলে না। এসব করার পর মনে হয়, ইশ, বিকেলেই যদি পড়তে বসতাম!
এমনটা কি শুধু তোমার সঙ্গেই ঘটে? উত্তর হলো, একদমই না। পৃথিবীর প্রায় সবাই জীবনের কোনো না কোনো সময়ে জরুরি কাজ পরে করার অভ্যাসে ভোগে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম প্রোক্রাস্টিনেশন। বাংলায় যাকে বলে গড়িমসি।
অলসতা আর প্রোক্রাস্টিনেশন এক নয়
শুনতে কাছাকাছি মনে হলেও অলসতা আর প্রোক্রাস্টিনেশন এক জিনিস নয়। অলস মানুষ কাজ করতেই চায় না। কিন্তু যে প্রোক্রাস্টিনেশন করে, সে জানে কাজটি জরুরি। এমনকি কাজটি করতেও চায়। তবু কোনো না কোনো কারণে শুরু করতে পারে না। কাজ যত পেছাতে থাকে, ততই বাড়তে থাকে চাপ আর দুশ্চিন্তা।
মনোবিজ্ঞানী টিমোথি পিচিলের মতে, প্রোক্রাস্টিনেশন আসলে সময় ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়, বরং আবেগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা। কোনো কাজ কঠিন, বিরক্তিকর বা ভয়ের মনে হলে আমরা সেটি এড়িয়ে এমন কিছু করতে চাই, যা সঙ্গে সঙ্গে ভালো লাগা এনে দেয়।

মস্তিষ্ক কেন এমন করে?
ধরো, সামনে দুটি বিকল্প আছে। একদিকে গণিতের কঠিন অধ্যায় চর্চা করতে হবে, অন্যদিকে মোবাইলে মজার ভিডিও দেখা যাবে। আমাদের মস্তিষ্ক সাধারণত তাৎক্ষণিক আনন্দকেই আগে বেছে নিতে চায়। কারণ, ভবিষ্যতের বড় লাভের চেয়ে বর্তমানের ছোট্ট আনন্দ অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়। তাই পরীক্ষার প্রস্তুতির বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করতে করতেই কেটে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
কাজ ফেলে রাখার কারণ
প্রোক্রাস্টিনেশনের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। অনেক সময় ব্যর্থতার ভয় আমাদের শুরুই করতে দেয় না। মনে হয়, যদি ভালো না হয় বা ভুল হয়ে যায়! আবার কেউ কেউ সবকিছু নিখুঁতভাবে করতে চান। সেই চেষ্টায় কাজ শুরু করতেই দেরি হয়ে যায়। বড় কোনো কাজও অনেকের কাছে পাহাড়সম মনে হয়। পুরো বই একসঙ্গে পড়ার কথা ভাবলেই উৎসাহ হারিয়ে যায়। এর সঙ্গে যোগ হয় মোবাইলের নোটিফিকেশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের টান কিংবা নিজের ওপর আস্থার অভাব। সব মিলিয়েই জরুরি কাজটি বারবার পিছিয়ে যেতে থাকে।
এর প্রভাব কী?
কাজ ফেলে রাখলে শুরুতে একটু স্বস্তি লাগতে পারে। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ থাকে না। পরে কাজ জমে যায়, চাপ বাড়ে, ঘুম কমে যায়, অস্থিরতা তৈরি হয়। শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়া করে কাজ করতে গিয়ে ভুলও বেশি হয়। সবচেয়ে বড় কথা, নিজের ওপর বিশ্বাস ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে।
কীভাবে এই অভ্যাস বদলাবে?
ভালো খবর হলো, এই অভ্যাস বদলানো সম্ভব। শুরুটা হতে পারে খুব ছোট একটি পদক্ষেপ দিয়ে। নিজেকে বলো, মাত্র পাঁচ মিনিট পড়বে। অনেক সময় শুরু করাটাই সবচেয়ে কঠিন অংশ। একবার শুরু করতে পারলে কাজ এগিয়ে নেওয়া সহজ হয়ে যায়।
বড় কাজকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করাও কার্যকর একটি উপায়। পুরো অধ্যায়ের বদলে প্রথম পাঁচ পৃষ্ঠা পড়ার লক্ষ্য ঠিক করতে পারো। পড়ার সময় মোবাইল দূরে রাখো বা নোটিফিকেশন বন্ধ করে দাও। একটি লক্ষ্য পূরণ হলে নিজেকে ছোট্ট কোনো পুরস্কারও দিতে পারো। আর যদি কোনো দিন সময় নষ্ট হয়, তাহলে নিজেকে দোষারোপ না করে পরের দিন নতুন করে শুরু করো। একটি খারাপ দিন মানেই সব শেষ নয়।
মনে রাখবে
প্রোক্রাস্টিনেশন কোনো চারিত্রিক সমস্যা নয়। এটি এমন একটি অভ্যাস, যা আমাদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক প্রবণতা, ভয়, চাপ ও আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাই নিজেকে দোষারোপ না করে ধীরে ধীরে ছোট ছোট পরিবর্তন আনাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
হয়তো এ মুহূর্তেও তোমার একটি বাড়ির কাজ অসমাপ্ত পড়ে আছে। এই লেখা শেষ করেই খাতাটা খুলে বসতে পারো। কারণ, বড় পরিবর্তনের শুরু হয় খুব ছোট একটি সিদ্ধান্ত থেকে।



