কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করছে ভারত-আমিরাত

কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করছে ভারত-আমিরাত

ইউরোপ সফরের পথে মে মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সম্ভাব্য সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ।

কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করছে ভারত-আমিরাত

সাম্প্রতিক মার্কিন ইরান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে উপসাগরীয় রাষ্ট্রটির প্রতি সংহতি প্রকাশের পাশাপাশি এই সফর ইঙ্গিত দেয় দুই দেশের সম্পর্ক এখন জ্বালানি, বিনিয়োগ এবং বৃহৎ প্রবাসী জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে আরও বিস্তৃত ও গভীর মাত্রা পাচ্ছে।

বাস্তবতা হলো, ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভবিষ্যৎ ক্রমেই পরস্পরনির্ভর ও আন্তঃসংযুক্ত হয়ে উঠছে।

কৌশলগত অংশীদারিত্ব

আজকের প্রেক্ষাপটে সংযুক্ত আরব আমিরাত ভারতের জন্য পূর্ণাঙ্গ অর্থেই একটি কৌশলগত অংশীদার। সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ মোকাবিলায় আবুধাবি ও নয়াদিল্লি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে। আমিরাতে বসবাসরত ভারতীয় প্রবাসীরা এখন কেবল শ্রমশক্তি নয়; বরং তারা দেশটির বৃহত্তম প্রবাসী সম্প্রদায় হিসেবে অর্থনীতি ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে, পাশাপাশি ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করছে।

দুই দেশের সহযোগিতা শুধু পশ্চিম এশিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা বিস্তৃত হয়েছে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও। এক দশক আগেও যেখানে প্রতিরক্ষা খাতে যৌথ উদ্যোগের কথা কল্পনা করা কঠিন ছিল কারণ আবুধাবি দীর্ঘদিন ধরে ক্রেতা–বিক্রেতা ভিত্তিক নীতি অনুসরণ করত সেখানে আজ পরিস্থিতি বদলে গেছে।

বর্তমানে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ধারাবাহিকভাবে বিস্তৃত হচ্ছে এবং তা মন্ত্রণালয় পর্যায়ের যৌথ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। উভয় দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের মধ্যে অংশীদারিত্ব ও যৌথ উদ্যোগ গঠনে নতুন উদ্যম লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো ভারত আমিরাত প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতা ফোরাম আয়োজন করা হয়, যেখানে দুই দেশের শিল্পপতি ও নীতিনির্ধারকেরা প্রতিরক্ষা উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের ভারত সফরের সময় একটি কৌশলগত প্রতিরক্ষা কাঠামো গঠনের লক্ষ্যে অভিপ্রায়পত্র স্বাক্ষরিত হয়, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার পথ প্রশস্ত করেছে।

অর্থনৈতিক বন্ধন

গত এক দশকে ভারত–আমিরাত সম্পর্ক এক আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। ২০২২ সালে স্বাক্ষরিত সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

সত্তরের দশকে যেখানে বার্ষিক বাণিজ্য ছিল মাত্র ১৮ কোটি ডলার, সেখানে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০০.০৬ বিলিয়ন ডলারে।

বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাত ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য। একইসঙ্গে ভারতও আমিরাতের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য অংশীদার।

দুই দেশের বাণিজ্য তালিকায় রয়েছে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য, রত্ন ও গয়না, খাদ্যপণ্য, বস্ত্র, রাসায়নিক দ্রব্য ও প্রকৌশল পণ্যসহ বহুবিধ খাত। উভয় দেশ ২০৩২ সালের মধ্যে এই বাণিজ্য দ্বিগুণ করে ২০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

বিনিয়োগ ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০০০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত আমিরাত থেকে ভারতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২.৮৪ বিলিয়ন ডলার, যা দেশটিকে ভারতের সপ্তম বৃহত্তম বিনিয়োগকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই বিনিয়োগ আবাসন, অবকাঠামো, জ্বালানি, আর্থিক সেবা ও ব্যক্তিমালিকানাধীন তহবিলসহ নানা খাতে বিস্তৃত।

আমিরাতের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলও ভারতে সক্রিয় উপস্থিতি তৈরি করেছে। আবুধাবি বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে গুজরাটের গিফট সিটিতে তাদের শাখা কার্যালয় স্থাপন করেছে।

অন্যদিকে, ভারতীয় বিনিয়োগও কম নয়। অসংখ্য ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আমিরাতে যৌথ উদ্যোগ বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে উৎপাদন ইউনিট স্থাপন করেছে, যেখানে সিমেন্ট, নির্মাণসামগ্রী, বস্ত্র, প্রকৌশল পণ্য ও ভোক্তা ইলেকট্রনিকস উৎপাদিত হচ্ছে।

পাশাপাশি পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও খুচরা বাণিজ্য খাতেও ভারতীয় বিনিয়োগ বিস্তৃত হয়েছে।

ভবিষ্যতের অংশীদারিত্ব

প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের গণ্ডি ছাড়িয়ে ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন দ্রুত একটি উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর জোটে পরিণত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সুপারকম্পিউটিং ও মহাকাশ প্রযুক্তি এই নতুন ক্ষেত্রগুলোতে দুই দেশের সহযোগিতা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।

যৌথভাবে একটি বৃহৎ ক্ষমতাসম্পন্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সুপারকম্পিউটার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে আমিরাতের বিনিয়োগ ও ভারতের প্রযুক্তিগত দক্ষতা একত্রিত হচ্ছে। একইসঙ্গে মানবকেন্দ্রিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল উন্নয়ন ও গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের কাজও এগোচ্ছে।

ডিজিটাল অবকাঠামো শক্তিশালী করা, তথ্যকেন্দ্র গড়ে তোলা এবং আন্তঃদেশীয় লেনদেন সহজ করতে ভারতের ইউনিফায়েড পেমেন্ট ব্যবস্থা আমিরাতের প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ছোট আকারের পারমাণবিক রিয়্যাক্টর ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায়ও যৌথ সম্ভাবনা অনুসন্ধান চলছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত যেখানে তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে, সেখানে ভারত খুঁজছে অবকাঠামোগত বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা। এই পারস্পরিক প্রয়োজনে গড়ে উঠছে এক শক্তিশালী ‘প্রযুক্তি–জোট’।

তবে এই সম্পর্ককে বৃহত্তর পশ্চিম এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকার প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা জরুরি। একইসঙ্গে নয়াদিল্লিকে সতর্ক থাকতে হবে যাতে আঞ্চলিক ভূরাজনীতির জটিলতায় জড়িয়ে না পড়ে এবং বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে।

ভারত আমিরাত সম্পর্ক আজ আর কেবল কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক সীমায় আবদ্ধ নয়, এটি এক বহুমাত্রিক অংশীদারিত্ব যার ভিত শক্ত, আর দৃষ্টি ভবিষ্যতের দিকে নিবদ্ধ।

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

দ্য সেক্রেটারিয়েট থেকে কলামটি অনুবাদ করেছেন- মিশর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী- জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

Scroll to Top