মনজুর রশীদ বিদ্যুৎ: নিঃসঙ্কোচে বলা যায়, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এনজিওদের ভুমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজসমূহ বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে দেশের কয়েক লক্ষ নারী-পুরুষ। যারা কেবল চাকুরি হিসেবে এই সেক্টরকে বেছে নেয়নি, বাক্তিগত ও সামাজিক দায়বদ্ধতা যাদেরকে অনুপ্রাণিত করেছে দেশের দুঃস্থ ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে সহায়ক হিসেবে দাঁড়াতে।
সরকারের সহযোগি হিসেবে সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠিকে কেবল ত্রাণ ও পুণর্বাসনের কর্মকান্ডের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত না রেখে দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলার লক্ষ্যে এনজিওদের ভুমিকা সবার জানা।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পয়ঃনিস্কাশন, নারীর ক্ষমতায়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জোরালো ভূমিকা পালন করা ছাড়াও সমাজ ও জাতীয় জীবনে নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করে সমঅংশগ্রহণের হার বৃদ্ধি ও নারীদেরকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপকভাবে যুক্ত করা, সাধারণ মানুষ তথা সুবিধাবঞ্চিতদের ক্ষমতা কাঠামোর অংশীদার অর্থাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্র তৈরিতে এনজিও কর্মীদের নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়া বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নে বড় ঘটনা।
এছাড়াও সকল ক্ষেত্রে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য এডভোকেসির মাধ্যমে জোরালো ভূমিকা পালন, উন্নয়ন চাহিদা অনুযায়ী গ্রামীণ জনসাধারণ বিশেষ করে নিরক্ষরতামুক্ত দেশ গড়তে বিভিন্ন উদ্ভাবনিমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করে আশাতীত সাফল্য অর্জনে সরকারকে সহায়তা করা, শিশু ও মাতৃ মৃত্যুর হার হ্রাসে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান, ডায়রিয়া ও অপুষ্টিজনিত শিশু মৃত্যুর হার হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান, যে কোন দুর্যোগ মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও জনসক্ষমতা সৃষ্টি করা, জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণ ও পুর্নবাসন কার্যক্রম গ্রহণ ও জোরদার করা, খাস জমিতে প্রকৃত ভূমিহীনদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, বস্তিবাসীদের উন্নয়ন ও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, আদিবাসী ও সমাজের অপরাপর ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠির অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রে ন্যায় বিচার প্রাপ্তির লক্ষ্যে কাজ করা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা, নারী নির্যাতন বন্ধ, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারী ও শিশুর প্রতি সকল প্রকার যৌন হয়রানি বন্ধ করা, ব্যাপকভিত্তিক কার্যক্রম নিয়ে রোহিঙ্গা শরনার্থীদের পাশে দাঁড়ানো, জলবায়ূ পরিবর্তনজনিত কারণে পরিবেশের বিরুপ প্রভাব মোকাবেলাসহ নানা ক্ষেত্রে এনজিওদের অসাধারণ দায়িত্ব পালনের কথা সর্বজন বিদিত।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারিতে হঠাৎ করেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নব নির্বাচিত রাস্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক ঘোষণায় সকল প্রকার কার্যক্রম বিশ্বজুড়ে স্থগিত হওয়ার ফলশ্রুতিতে রাতারাতি বেকার হয়ে পড়ে আমাদের দেশের হাজার হাজার উন্নয়ন কর্মী। অথচ, বাংলাদেশের শুরু থেকে আজ অবধি উন্নয়ন সেক্টরের প্রধান দাতাই হল ইউএসএআইডি।
ইতিপূর্বে করোনাকালীন সময়ে বেশিরভাগ দাতাগোষ্ঠি ব্যয় সংকোচনের নীতি অনুসরণ করায় কয়েক হাজার এনজিও কর্মী রাতারাতি চাকরি হারিয়ে দূর্বিষহ জীবনের মুখোমুখি হয়। আজও তাদের বেশিরভাগই বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি লাভ করতে পারেনি। তার ওপর বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের শাসনামল থেকেই দ্রুত উন্নয়নশীল দেশে রুপান্তরের ফাঁপা বুলির কারণে বেশিরভাগ দাতাগোষ্ঠি বাংলাদেশ থেকে তাদের আর্থিক সহযোগিতা শিথিল করতে শুরু করে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের চলমান কর্মসূচি আর চালিয়ে যেতে পারেনি। ফলে এ সময়টাতেও ক্রমান্বয়ে কর্মহীন হতে শুরু করে এই সেক্টরের হাজার হাজার উন্নয়ন কর্মী।
উন্নয়ন কর্মীদের জন্য সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি হল এই সেক্টরে কর্মরতদের জন্য দুর্দিন-দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর মত কেউ নেই। কৃষক, শ্রমিক, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এমনকি বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকুরিজীবীরাও তাদের অধিকার আদায়ে বা যে কোন বিপদকালীন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের/ট্রেড ইউনিয়ন সমূহের এমনকি দেশের প্রচলিত শ্রম আইন থেকেও জোরালো সমর্থন পেয়ে থাকেন। কিন্তু ডেভেলপমেন্ট প্রফেশনাল হিসেবে পরিচিত এনজিও কর্মীরা কোন কারণে বিপদগ্রস্ত হলে তারা কাউকে তাদের পাশে পায়না।
এমনকি অন্যায়ভাবে চাকুরি হারালে, ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হলে, প্রতিষ্ঠানের উর্ধ্বতন বসদের বিরাগভাজন হলে তাদেরকে পরিবার-পরিজন নিয়ে যে কি এক ভয়ংকর দূরাবস্থার মধ্যে পরতে হয়, তা কেবল ভুক্তভোগিরাই অনুধাবণ করতে পারবে।
এমনিতেই বেকরত্বের মুখে পরা এসব কর্মীদের এই সেক্টরে কাজের পরিধি অনেকটাই সীমিত হয়ে আসছে, সামনের দিনগুলোতে এ সঙ্কট আরও বাড়বে বলেই মনে হচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বেড়ে গেছে। সেই তুলনায় এনজিওরা একসময় এগিয়ে থাকলেও এখন একেবারেই তলানিতে আছে। তার ওপর অধিকাংশ চাকুরিই যেহেতু এখানে প্রকল্প নির্ভর, ফলে কোন নিশ্চয়তা নেই প্রকল্প শেষে হলে তাদের ভবিষ্যত কি।
এছাড়া মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার ঘোষণার পর থেকে তার নেতিবাচক প্রভাব কতটা তীব্রতর হতে শুরু করেছে তা ইতিপূর্বেও একবার উল্লেখ করা হয়েছে।
এখন বাস্তবতা হল বৈদেশিক সাহায্য ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার ফলে চলমান দারিদ্র্য দূরীকরণসহ উল্লেখিত বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ে যেসব উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতা অর্জনকারী উন্নয়নকর্মীদের দক্ষতা ও সেবা থেকে বঞ্চিত হবে দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম। এখন এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উদ্যোগে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে।
মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা সহ বর্তমান কেবিনেটে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এনজিও নেতা রয়েছেন এবং আমি নিশ্চিত এ বিষয়গুলো তারা আমাদের চেয়েও বেশ ভালো জানেন এবং বোঝেন। ফলে তাদেরকেই আসন্ন বাজেটে এমনকিছু জনকল্যাণমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, যাতে করে উন্নয়ন গতিশীলতায় চলমান বাঁধা শুধু দূর করাই নয় – সেই সাথে বিপর্যস্ত হাজার হাজার শিক্ষিত নিবেদিতপ্রাণ সমাজ ও উন্নয়নকর্মীরা যেন কর্মসংস্থান খুঁজে পেয়ে এতদিনকার অর্জিত অভিজ্ঞতা ও পেশাদারিত্ব জাতির কল্যাণে উৎসর্গ করতে পারে।
সেই সাথে বিভিন্ন বেসরকারি ও কর্পোরেট সংস্থাগুলোও এনজিও কর্মীদের এমন দুঃসময়ে তাদের সহকর্মী হওয়ার সুযোগ দিয়ে মানবিকতার হাত প্রসারিত করবেন – এই প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)



