কেন একই বৃত্তে আটকে আছে রপ্তানি বাজার | চ্যানেল আই অনলাইন

কেন একই বৃত্তে আটকে আছে রপ্তানি বাজার | চ্যানেল আই অনলাইন

‘রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ ও পণ্যের বহুমুখীকরণ’— এই দুই লক্ষ্য প্রায় দুই দশক ধরে নীতিনির্ধারণী টেবিলে গালগল্প হয়ে আছে। বাস্তবতার ধারেকাছে নেই। কেবল শ্লোগান হয়ে থাকা এই কথাগুলো রপ্তানী বাজারে এক অবিশ্বাসের নাম।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সংসদে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর শামা ওবায়েদ ইসলাম যে উত্তর দেন তাও ছিলো গতানুগতিক চর্চাই। আসলে কোথায় দাড়িয়ে বাংলাদেশের রপ্তানী বাণিজ্য, কোথাও কতটা উন্নতি প্রয়োজন কিংবা কেন প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে একই বৃত্তে আটকে আছে রপ্তানি বাজার; এ নিয়েই আমাদের আজকের এক্সপ্লেইনার।

গত এক দশকে রপ্তানী পরিমানে বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু কাঠামোগতভাবে খুব বেশি বদলায়নি। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের বার্ষিক রপ্তানি আয় প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের মতো। যার প্রায় ৮০ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। অর্থাৎ, সোজাসাপ্টা বললে, বাংলাদেশের রপ্তানি আয় মূলত তৈরি পোশাকের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে। এই চিত্র দীর্ঘ সময় ধরে অপরিবর্তিত।

বাজার বিশ্লেষণ করলেও আছে হতাশা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর যুক্তরাষ্ট্র— এই দুই বাজারেই যায় মোট রপ্তানির বড় অংশ। বাজার সম্প্রসারণের নামে সভা-সমাবেশ আর সরকারী কর্মকর্তাদের দৌড়ঝাপ যতটা; অর্থমূল্যে ততটাও সম্প্রসারিত হয়নি রপ্তানি বাজার। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা কিংবা পূর্ব ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা কেবল কথা কথা হয়ে থেকে গেছে। ওই বাজারগুলোতে বাংলাদেশের পণ্য সীমিত এবং বিচ্ছিন্ন।

কেন উন্নতি নেই? কী পদক্ষেপ নিলো সরকার, আর কী নেওয়া উচিত ছিলো?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনেক পাওয়া গেলেও মূলত উত্তর একটিই; রাজনৈতিক সদিচ্ছ। এই যেমন বহু বছর ধরে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য ঘুরপাক খাচ্ছে তৈরি পোশাক খাতে। অথচ সম্ভাবনাময় তথ্য-প্রযুক্তি, ওষুধ, চামড়া, কৃষিপণ্য ভরসা হয়ে উঠতে পারছে না। যদিও নিন্দুকেরা বলেন, এই খাতগুলোকে বড় হয়ে উঠতে দেওয়া হচ্ছে না; এমন অভিযোগ এই খাত সংশ্লিষ্টদের। তাদের অভিযোগ; যতটা সুযোগ-সুবিধা তৈরি পোশাক শিল্প পাচ্ছে তার ছিঁটেফোটাই কেবল মেলে এই খাতগুলোতে। নেই তৈরি পোশাকের মতো প্রণোদনাও।

যে কারণে আন্তর্জাতিক মানের পণ্য তৈরি কিংবা সার্টিফিকেশন ও ব্র্যান্ডিংয়ের সুযোগ কম। তার ওপর আছে কূটনৈতিক তৎপরতার অভাব। কিছুক্ষেত্রে আছে চুক্তির বাধাও। এর সঙ্গে বন্দর জট, পরিবহন ব্যয়, কাস্টমস জটিলতা মিলিয়ে নতুন পণ্যগুলো ঠিক ভরসার নাম হয়ে উঠতে পারছে না।

এসব নিয়ে ওঠা প্রশ্নের উত্তরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানলেন; নতুন বাজার অনুসন্ধানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের উদীয়মান অর্থনীতির সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা চলছে।

সম্ভাবনাময় দেশসমূহের সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি, অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা কিংবা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সই নিয়েও ভাবছে সরকার।

তিনি প্রধানমন্ত্রীর শ্লোগান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন; বহুমুখী রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের জন্য বাংলাদেশ দূতাবাসগুলো নিয়মিত প্রদর্শনী আয়োজন করছে। স্বাগতিক দেশের মেলাগুলোতে অংশ নিচ্ছে।

তাছাড়া বাংলা-বিজ নামের পোর্টালের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ওয়ান স্টপ ডিজিটাল সেবা, কর রেয়াত, মূলধন ও লভ্যাংশ প্রত্যাবাসনের সীমা বাড়ানো, উপযুক্ত প্রণোদনা দেওয়ার কথাও মনে করিয়ে দেন তিনি।

এর বাইরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাসমূহের সাথে সমন্বয় করে দূতাবাসগুলো ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ, ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল বিনিময় এবং কনস্যুলার সেবা উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি। জানান বন্দর ও কাস্টমস-সংক্রান্ত ইস্যুতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সাথে কূটনৈতিক সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে।
এসব উদ্যোগের আন্তর্জাতিক প্রচারের ব্যবস্থা করতে চান তারা। সেজন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ মিলে ‘ইনভেস্টমেন্ট রোডশো’, সেমিনার এবং ম্যাচ-মেকিং করার কথা জানান তিনি। সেই সঙ্গে প্রবাসী উদ্যোক্তাদের নিয়ে ‘ডায়াসপোরা এনগেজমেন্ট’ কার্যক্রম শুরু করা হচ্ছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।

যদিও এই কথা ও কাজগুলোও পুরোনো। এসব আলোচনা হয়েছে অনেক। প্রয়োজন কাজের কাজ। অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে দ্রুত সেই পথে হাঁটা জরুরী।
বিশেষজ্ঞরা বারবার তাগিদ দিয়েছেন তৈরি পোশাকের বাইরে নতুন খাতকে বড় হতে প্রণোদনা দেওয়া, প্রযুক্তি দক্ষতা বাড়ানো, নতুন বাজারে শুল্ক সুবিধা নিশ্চিত করা, বন্দর ও সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং সর্বোপরি নতুন বাজারে প্রবেশে প্রবাসীদের ব্যবহার।
সত্যিকার অর্থে তখনই কেবল সুফল আসবে রপ্তানি বাণিজ্যে। সেই ভালো দিনের প্রত্যাশা সবার।

Scroll to Top