কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর)-এর কমিশনারের স্টাফ অফিসার ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) চৌধুরী গোলাম হাসনাইনের বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেন, বন্ড সুবিধার অপব্যবহারে সহযোগিতা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, সাবেক কমিশনার আবু ওবায়দা ও অতিরিক্ত কমিশনার দেলোয়ার হোসেনের দায়িত্বকালে ওই চক্রের প্রভাব বাড়ে। মাসে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও করেছেন সূত্রগুলো। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট আর্থিক নথি, লেনদেনের প্রমাণ বা কোনো তদন্তের ফল পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, উত্তর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটে যোগদানের পর চৌধুরী গোলাম হাসনাইনকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে ওঠে। ওই বলয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন কার্যক্রমে অনিয়ম এবং আর্থিক সুবিধা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। সূত্রগুলোর ভাষ্য, সাবেক কমিশনার আবু ওবায়দা ও সদ্য বিদায়ী অতিরিক্ত কমিশনার দেলোয়ার হোসেনের দায়িত্বকালে এই বলয়ের প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়।
তবে কোন সিদ্ধান্তে কার ভূমিকা ছিল, কোন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে কিংবা কীভাবে কথিত অনিয়ম হয়েছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নথি পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট সাবেক কর্মকর্তাদের বক্তব্যও যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের একটি বড় অংশ বন্ড সুবিধায় পণ্য আমদানি ও বাজারজাতকরণ ঘিরে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বন্ড সুবিধায় পণ্য আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রির সঙ্গে জড়িত কিছু ব্যবসায়ী ও মধ্যস্থতাকারীর সঙ্গে গোলাম হাসনাইনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, অবৈধ সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ লেনদেন হয়ে থাকতে পারে।
বন্ড সুবিধার অপব্যবহার প্রমাণিত হলে শুল্ক-কর ফাঁকি এবং সরকারি রাজস্ব ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের নাম, চালান নম্বর, শুল্ক নির্ধারণের নথি বা রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কথিত সিন্ডিকেটে কয়েকজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সিপাহির সম্পৃক্ততা রয়েছে। সদ্য বিদায়ী অতিরিক্ত কমিশনার দেলোয়ার হোসেন ওই চক্রকে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। কমিশনারের ব্যক্তিগত সহকারী মজনু মিয়াসহ আরও কয়েকজনের নামও অভিযোগে এসেছে।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ, তাঁদের দায়িত্বের সঙ্গে কথিত অনিয়মের সম্পর্ক বা অভিযোগের সমর্থনে কোনো নথি প্রকাশ করা হয়নি। তাঁদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
সূত্রগুলোর আরও দাবি, হাসনাইন এর আগে যেসব কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানেও তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছিল। তবে পূর্ববর্তী কর্মস্থলগুলোর নাম, অভিযোগের প্রকৃতি, বিভাগীয় তদন্তের ফল বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কোনো নথি পাওয়া যায়নি। ফলে অতীতের এসব দাবির ভিত্তিতে বর্তমান অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
উত্তর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কার্যক্রম নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের বাধা ও হুমকির মুখে পড়ার অভিযোগও উঠেছে। একাধিক সংবাদকর্মীর দাবি, তথ্য সংগ্রহের জন্য কার্যালয়ে গেলে তাঁদের গেটে আটকে দেওয়া হয়। অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য নিতে চাইলেও তাঁদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
কয়েকজন সংবাদকর্মী আরও দাবি করেছেন, সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে একটি কথিত ‘লাঠিয়াল বাহিনী’র মাধ্যমে তাঁদের হুমকি ও লাঞ্ছিত করা হয়েছে। তবে এসব ঘটনার নির্দিষ্ট তারিখ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয়, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ বা লিখিত অভিযোগের অনুলিপি পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে নতুন কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে জমা হলে কার্যালয়ের প্রবেশসংক্রান্ত নথি, নিরাপত্তাকর্মীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
চৌধুরী গোলাম হাসনাইনের সম্পদের উৎস নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ঘুষ ও অনিয়মের মাধ্যমে স্বল্প সময়ের চাকরিজীবনে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের নজরে রয়েছে বলেও কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দাবি করেছেন।
তবে তাঁর সম্পদের পরিমাণ, বৈধ আয়ের উৎস, সম্পদ বিবরণী বা দুদকের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান বা তদন্ত শুরুর বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে সম্পদ অর্জনসংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণেও নথিভিত্তিক তদন্ত প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে চৌধুরী গোলাম হাসনাইনের বক্তব্য জানতে তাঁকে ফোন করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে সংবাদ প্রকাশের পর তিনি নিজেই সম্পাদককে ফোন করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ সময় তিনি বলেন, “আমরা সাত ভাই, আমাদের নামে কোনো সম্পত্তি নেই। আমার ওয়াইফ ভালো স্যালারির জব করে।”
পরে উত্তেজিত হয়ে তিনি বলেন, “তোর নামে মামলা করব, তুই কত বড় সাংবাদিক দেখছি আমি, বস্তির টোকাই তোরা।”
সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, উত্তর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটে ওঠা অভিযোগগুলো নতুন কমিশনার নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করবেন। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, শুল্ক-কর ফাঁকি বা ঘুষ লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
তবে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। আর্থিক নথি, আমদানি-রপ্তানির তথ্য, দাপ্তরিক সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য যাচাইয়ের পরই অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণ সম্ভব।



