ক্ষমতার অপব্যবহার করে একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে ৫৪৫ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদনের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, তার ছেলে আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমানসহ ২৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সালমান এফ রহমান ছাড়া মামলার অন্য আসামিরা হলেন ব্যাংকটির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও সালমান এফ রহমানের ছেলে আহমেদ সায়ান ফজলুর রহমান, স্কাইমার্ক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুল্লাহ আল-মনজুর ও পরিচালক ইশরাত জাহান লাইজু।
এ ছাড়া আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক পরিচালক সুধাংশু শেখর বিশ্বাস, শাহ মনজুরুল হক, এ আর এম নজমুস ছাকিব, কামরুন নাহার আহমেদ, মো. গোলাম মোস্তফা, মো. জাফর ইকবাল ও রাবেয়া জামালী মামলার আসামি।
আসামিদের মধ্যে আরও রয়েছেন ব্যাংকটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) সৈয়দ মনসুর মোস্তফা, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহ আলম সারোয়ার, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম, তৎকালীন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নুরুল হাসনাত ও উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মনিতুর রহমান।
এ ছাড়া হেড অব ট্রেজারি মোহাম্মদ শাহিন উদ্দিন, হেড অব ক্রেডিট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সৈয়দ হাসানুজ্জামান, সাবেক হেড অব অপারেশন হেলাল আহমেদ, সাবেক ডিএমডি, সিসিও ও সিআরও ইকবাল পারভেজ চৌধুরী, সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ মো. মঈনউদ্দিন, তৎকালীন চিফ ম্যানেজার হোসাইন শাহ আলী ও মো. জুলফিকার আলী চাকদার, রিলেশনশিপ ম্যানেজার তাসলিমা আক্তার এবং তৎকালীন রিলেশনশিপ ম্যানেজার সালমান মাহবুব মামলার আসামি।
দুদকের মামলার নথি ও কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, স্কাইমার্ক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের নামে তিন দফায় ৫৪৫ কোটি টাকা ওভারড্রাফট (ওডি) ঋণ অনুমোদন করা হয়। এর মধ্যে ৫৩৮ কোটি ১৬ লাখ ২৪ হাজার ৪৮২ টাকা বিতরণ বা উত্তোলন করা হয়েছে। ব্যাংকিং আইন লঙ্ঘন করে এক দিনে সর্বোচ্চ ২৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করা হয় বলে অভিযোগ করেছে দুদক।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১-এ মামলাটি দায়ের করেন সংস্থাটির উপপরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০ ও ১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
দুদকের অভিযোগ, স্কাইমার্কের নামে অনুমোদিত ঋণের অর্থ ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার না করে আত্মসাৎ করা হয়েছে। পরে অর্থের প্রকৃতি, উৎস ও গন্তব্য আড়াল করতে তা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর দুদকের করা মামলার নথিতে বলা হয়, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে মাত্র তিন দিনে স্কাইমার্কের নামে অনুমোদিত ঋণ থেকে নগদে ৫২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। এমনকি ব্যাংকিং আইন না মেনে এক দিনে সর্বোচ্চ ২৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত তোলা হয়েছে।
দুদকের অভিযোগ, ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার না করে ওই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। পরে আত্মসাৎ করা অর্থের গন্তব্য আড়াল করতে প্রায় পুরো অর্থই সালমান এফ রহমানের মালিকানা বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট এবং বেক্সিমকোসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে জমা করা হয়।
তিন দফায় ঋণ অনুমোদন
দুদকের নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৩ আগস্ট স্কাইমার্ক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের নামে ৯০ কোটি টাকার ওভারড্রাফট ঋণ অনুমোদন করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালের ১০ জানুয়ারি ঋণের সীমা বাড়িয়ে ১৪৫ কোটি টাকা করা হয়।
দুদকের অভিযোগ, আগের ৯০ কোটি টাকার ঋণের যথাযথ ব্যবহার, প্রতিষ্ঠানের হিসাবের লেনদেন, ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য যথাযথভাবে যাচাই না করেই ঋণের সীমা বাড়ানোর সুপারিশ ও অনুমোদন দেওয়া হয়।
ঋণের সীমা বাড়ানোর পর ২০২৩ সালের ১২, ১৫ ও ১৭ জানুয়ারি স্কাইমার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালকের যৌথ স্বাক্ষরিত চেকের মাধ্যমে তিন দিনে নগদে ৫২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়।
দুদকের অভিযোগ, এ অর্থ ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার না করে আত্মসাৎ করা হয়। পরে একই শাখা থেকে উত্তোলন করা অর্থের প্রায় পুরোটাই আইএফআইসি ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট এবং বেক্সিমকো লিমিটেডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চলতি, ঋণ ও অন্যান্য হিসাবে জমা করা হয়।
অর্থাৎ, স্কাইমার্কের নামে ঋণ অনুমোদন ও নগদ উত্তোলনের পর অর্থটি কোম্পানিটির ব্যবসায়িক কার্যক্রমে না গিয়ে সালমান এফ রহমানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে যাওয়ার অভিযোগই দুদকের নথিতে গুরুত্ব পেয়েছে। এসব অর্থ স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে মানিলন্ডারিং করা হয়েছে বলেও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর ২০২৪ সালের ২৫ জুন আইএফআইসি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৮৮৯তম সভায় স্কাইমার্কের ঋণসীমা ১৪৫ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫৪৫ কোটি টাকা করার অনুমোদন দেওয়া হয়।
দুদকের অভিযোগ, এ ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত ব্যবসায়িক সক্ষমতা, আগের ঋণের ব্যবহার, ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য এবং পর্যাপ্ত জামানত যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি।
ঋণসীমা বাড়ানোর পর মাত্র চার কার্যদিবসে বর্ধিত ৪০০ কোটি টাকার প্রায় পুরো অর্থ উত্তোলন করা হয়। নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৭ ও ৩০ জুন এবং ৩ ও ৭ জুলাই- এই চার দিনে স্কাইমার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালকের যৌথ স্বাক্ষরিত চেকের মাধ্যমে নগদে ৩৯৪ কোটি টাকা এবং ট্রান্সফার চেকের বিপরীতে পে-অর্ডারের মাধ্যমে আরও ১ কোটি ৫৬ লাখ ৮৯ হাজার ৮৮২ টাকা উত্তোলন করা হয়। চার কার্যদিবসে মোট ৩৯৫ কোটি ৫৬ লাখ ৮৯ হাজার ৮৮২ টাকা উত্তোলন বা বিতরণ করা হয়।
দুদকের অভিযোগ, নগদে উত্তোলন করা ৩৯৪ কোটি টাকা সালমান এফ রহমানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বেক্সিমকো লিমিটেডসহ গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে আইএফআইসি ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় পরিচালিত চলতি, ঋণ ও অন্যান্য হিসাবে জমা করা হয়।
নথিতে বেক্সিমকো লিমিটেড, বেক্সটেক্স লিমিটেড, বেক্সিমকো ফ্যাশন লিমিটেড, অ্যাপট্রিন ট্রেডিং লিমিটেড, টিখ বিল্ড কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড, ব্রাইটস্টার লিমিটেড, এক্সিস বিজনেস লিমিটেড, সানস্টার বিজনেস লিমিটেড, ফারইস্ট বিজনেস লিমিটেড, আলফা এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড, নর্থস্টোন ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড, আর অ্যান্ড আর হোল্ডিংস লিমিটেড, ক্রিস্টাল কনস্ট্রাকশন ও সেন্ট্রাল ল্যান্ডসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। দুদকের নথিতে এসব অর্থ স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের নথিতে বলা হয়, ৫৪৫ কোটি টাকার ওভারড্রাফট ঋণের বিপরীতে নতুন করে ৬৫০ শতাংশ জমি জামানত হিসেবে প্রস্তাব করা হলেও ওই জমির মালিকানা ও তফসিলের পরিচয় সুস্পষ্ট ছিল না। ডেফারেল মর্টগেজ রেখে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করা হলেও পরবর্তী সময়ে ওই জমির বন্ধক গ্রহণ করা হয়নি বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এতে ব্যাংকের ঋণ আদায় অনিশ্চিত হয়ে আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে দুদক।
ঋণের বিপরীতে তৃতীয় পক্ষের মালিকানাধীন বেক্সিমকো লিমিটেডের ১ কোটি ৩৫ লাখ শেয়ার লিয়েন রাখার কথাও নথিতে উল্লেখ রয়েছে। ২০২৬ সালের ২ আগস্টের বাজারমূল্য অনুযায়ী, এসব শেয়ারের মূল্য ছিল ৩১ কোটি ২০ লাখ টাকা।
সব মিলিয়ে তিন দফায় স্কাইমার্ক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের নামে ৫৪৫ কোটি টাকা ওভারড্রাফট ঋণ অনুমোদন করা হয়। এর মধ্যে নগদে ৫৩৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকা এবং ট্রান্সফারের মাধ্যমে ২ কোটি ২৮ লাখ ২৪ হাজার ৪৮২ টাকা-মোট ৫৩৮ কোটি ১৬ লাখ ২৪ হাজার ৪৮২ টাকা বিতরণ বা উত্তোলন করা হয়েছে বলে দুদকের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এতে ব্যাংকের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও বেড়েছে। নথি অনুযায়ী, অনুমোদিত ৫৪৫ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে ২০২৬ সালের ২৩ জুলাই পর্যন্ত সুদ ও অন্যান্য চার্জসহ স্কাইমার্কের ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬০৪ কোটি ৬৯ লাখ ৬৫ হাজার ৪৭৬ টাকা।
দুদকের সার্বিক অনুসন্ধানে স্কাইমার্কের ব্যবস্থাপনা এবং আইএফআইসি ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখা, প্রধান কার্যালয়ের ক্রেডিট কমিটি, ব্যবস্থাপনা, নির্বাহী কমিটি ও পরিচালনা পর্ষদের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে যোগসাজশ, প্রতারণা, জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে।
ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক অস্তিত্ব, পূর্ববর্তী ঋণের ব্যবহার, আর্থিক সক্ষমতা, জামানত, ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য যথাযথভাবে যাচাই না করেই ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
যা বলছে দুদক
এ বিষয়ে দুদকের কর্মকর্তা মো. সাইদুর রহমান খান বলেন, তিন দফায় মোট ৫৪৫ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন করা হয়। এর বিপরীতে ৫৩৮ কোটি ১৬ লাখ ২৪ হাজার ৪৮২ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। সুদ ও অন্যান্য চার্জসহ আইএফআইসি ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৬০৪ কোটি ৬৯ লাখ ৬৫ হাজার ৪৭৬ টাকা।
মো. সাইদুর রহমান খান বলেন, ঋণের অর্থ বিতরণের পর এক দিনে সর্বোচ্চ ২৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করা হয়েছে, যা ব্যাংকিং আইনবিরোধী। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যাংকিং আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে।
দুদকের এ কর্মকর্তা বলেন, সালমান এফ রহমান স্কাইমার্ক নামে একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠান গঠন করে তিন দফায় মোট ৫৪৫ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন করেন। এর বিপরীতে ৫৩৮ কোটি ১৬ লাখ ২৪ হাজার ৪৮২ টাকা বিতরণ করে আত্মসাৎ করা হয়। ওই অর্থ সালমান এফ রহমানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে দুদকের অভিযোগ। এসব কর্মকাণ্ড বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইন ও আইএফআইসি ব্যাংকের নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।



