একটু আশ্রয় আর দুবেলা খাবারই এখন বিনোদ বিশ্বাসের শেষ চাওয়া | চ্যানেল আই অনলাইন

একটু আশ্রয় আর দুবেলা খাবারই এখন বিনোদ বিশ্বাসের শেষ চাওয়া | চ্যানেল আই অনলাইন

বাগেরহাট সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের কোড়ামারা গ্রামের বাসিন্দা বিনোদ বিশ্বাসের জীবন যেন বঞ্চনা, কষ্ট আর অসহায়ত্বের এক নীরব কাহিনি। জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শেষ বয়সে এসে তিনি এখন দাঁড়িয়ে আছেন চরম অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। অনাহার, অসুস্থতা ও নিঃসঙ্গতাকে সঙ্গী করে দিন পার করা এই বৃদ্ধ এখন অপেক্ষায় আছেন একটু মানবিক সহায়তা আর মাথা গোঁজার মতো একটি নিরাপদ আশ্রয়ের।

বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর, চোখে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস আর বুকভরা অসহায়ত্ব। যে বয়সে সন্তানের স্নেহ, নিরাপত্তা ও স্বস্তির মধ্যে জীবন কাটানোর কথা, সেই বয়সে মুরগির খোপের মতো একটি জরাজীর্ণ ঝুপড়ি ঘরে মানবেতর জীবন কাটছে ৮০ বছর বয়সী বিনোদ বিশ্বাসের। বৃষ্টি এলে ভিজতে হয়, ঝড় এলে আতঙ্কে নির্ঘুম কাটে রাত।

একসময় পাঁচ সন্তান নিয়ে ছিল তার সুখের সংসার। পরিবারে ছিল হাসি-আনন্দ, ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু সময়ের নির্মম পরিহাসে আজ তিনি প্রায় একা। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে জীবিকার সন্ধানে দুই ছেলে পাড়ি জমিয়েছেন ভারতে। দেশে থাকা আরেক ছেলে মাঝে মধ্যে কিছু খাবারের ব্যবস্থা করলেও অধিকাংশ সময়ই অন্যের সহানুভূতির ওপর নির্ভর করেই কাটে তার দিন।

প্রায় ২০ বছর আগে স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর থেকে নিঃসঙ্গতাই হয়ে ওঠে তার নিত্যসঙ্গী। গ্রামের এক কোণে জরাজীর্ণ একটি ঝুপড়ি ঘরে কাটছে তার দিনরাত। বৃষ্টি, ঝড় কিংবা তীব্র গরম প্রতিটি ঋতুই যেন তার জন্য নতুন দুর্ভোগ বয়ে আনে।

ছবি: প্রতিনিধি

স্থানীয়দের দেওয়া খাবারেই কোনোভাবে চলে তার জীবন। যেদিন কেউ খাবার দিয়ে যায়, সেদিন দুমুঠো ভাত জোটে। আর যেদিন কেউ খোঁজ নেয় না, সেদিন অনাহারেই কাটে দিন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীরের সঙ্গে যোগ হয়েছে এক হাত প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হওয়ার যন্ত্রণা। ফলে এখন আর কোনো ধরনের শ্রমের কাজ করার সামর্থ্য নেই তার।

প্রতিবেশী মামুন শেখ বলেন, বিনোদ বিশ্বাসকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে কষ্ট করতে দেখছি। মানুষের সহায়তায় তার দিন চলে। একটি নিরাপদ ঘর ও সরকারি সহায়তা পেলে শেষ বয়সে তিনি একটু স্বস্তি নিয়ে বাঁচতে পারতেন।

স্থানীয় বাসিন্দা আমিনুল বাবু হাওলাদার বলেন,আমরা গ্রামের মানুষ সাধ্যমতো সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। কিন্তু নিয়মিতভাবে তার খাবার ও থাকার ব্যবস্থা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্যোগ নিলে তিনি উপকৃত হবেন।

কোড়ামারা ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হাফিজুর রহমান মল্লিক বলেন, বিনোদ বিশ্বাস অত্যন্ত অসহায় একজন মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তার পাশে দাঁড়ালে তিনি কিছুটা স্বস্তিতে জীবন কাটাতে পারবেন।

খানজাহান আলী কৃষি ডিপ্লোমা কলেজের শিক্ষক মিজানুর রহমান সাগর বলেন,একজন প্রবীণ মানুষ জীবনের শেষ সময়ে এসে এমন মানবেতর জীবনযাপন করবেন, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। সমাজের সচেতন ও সামর্থ্যবান মানুষদের পাশাপাশি প্রশাসনেরও তার পাশে দাঁড়ানো উচিত। একটি নিরাপদ ঘর ও নিয়মিত সহায়তা তার জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

প্রতিবেশী সাথী বেগম বলেন, চাচাকে প্রায়ই না খেয়ে থাকতে দেখি। অসুস্থ শরীর নিয়ে তিনি খুব কষ্টে দিন কাটান। একটি ঘর আর দুবেলা খাবারের ব্যবস্থা হলে শেষ বয়সে অন্তত একটু শান্তি পেতেন।”

স্থানীয়দের মতে, বয়সজনিত অসুস্থতা ও এক হাত প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হওয়ার কারণে এখন আর কোনো ধরনের উপার্জনমূলক কাজে অংশ নিতে পারেন না বিনোদ বিশ্বাস। ফলে মানবিক সহায়তা ছাড়া তার জীবনযাপন দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

বিনোদ বিশ্বাস বলেন, একসময় আমার সংসার ছিল, স্ত্রী ছিল, ছেলে-মেয়ে ছিল, পরিবারে হাসি-আনন্দ ছিল। কিন্তু আজ বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে আমি একেবারেই একা। পাশে থাকার মতো কেউ নেই। তিন বেলা খাবারের জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে যেতে হয়। কেউ দয়া করে দিলে খেতে পারি, না দিলে না খেয়েই থাকতে হয়।

ছবি: প্রতিনিধি

প্রায় ২০ বছর ধরে এই জরাজীর্ণ ঝুপড়ি ঘরেই জীবন কাটাচ্ছি। অভাব-অনটনের কারণে ছেলেরা আমার খোঁজখবর নিতে পারে না। দুই ছেলে ঋণের চাপে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে গেছে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শরীরও ভেঙে পড়েছে। প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে একটি হাত প্রায় অকেজো হয়ে গেছে। এখন আর কাজ করে দুমুঠো ভাত জোগাড় করার শক্তিও নেই।

চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও নিয়মিত ওষুধ কিনে খাওয়ার সামর্থ্য আমার নেই। অনেক সময় কষ্ট সহ্য করেই দিন পার করতে হয়। জীবনের শেষ সময়ে এসে শুধু একটু নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা আর দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তা চাই। সরকার বা সমাজের বিত্তবান মানুষ যদি আমার দিকে একটু সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেন, তাহলে হয়তো জীবনের শেষ কটা দিন কিছুটা স্বস্তিতে কাটাতে পারব। বাকি জীবন কীভাবে চলবে, তা একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই জানেন।

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বিনোদ বিশ্বাসের চাওয়া খুব বেশি নয়—মাথা গোঁজার জন্য একটি নিরাপদ ঘর, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তা। সমাজের সামান্য সহমর্মিতা, কিছু মানবিক হাত আর রাষ্ট্রের একটু সদিচ্ছাই হয়তো তার জীবনের শেষ অধ্যায়টুকু মর্যাদা ও স্বস্তির সঙ্গে কাটানোর সুযোগ করে দিতে পারে।

Scroll to Top