একজন নিঃসঙ্গ মায়ের মৃত্যু ও আমাদের নৈতিক পরাজয় | চ্যানেল আই অনলাইন

একজন নিঃসঙ্গ মায়ের মৃত্যু ও আমাদের নৈতিক পরাজয় | চ্যানেল আই অনলাইন

ঢাকার একটি ফ্ল্যাটে কয়েক দিন ধরে পড়ে ছিল এক বৃদ্ধ মায়ের নিথর দেহ। পাশের বাসার মানুষ দুর্গন্ধ পেয়ে পুলিশে খবর দেয়। পরে জানা গেল, তিনি একা থাকতেন। সন্তানরা প্রতিষ্ঠিত, কেউ বিদেশে, কেউ ব্যস্ত নিজেদের জীবনে। মৃত্যুর পরও কয়েক দিন কেউ খোঁজ নেয়নি। নূর জাহান বেগমের মৃত্যু। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এই ঘটনা শুধু একটি মৃত্যুর খবর নয়; এটি আমাদের সময়ের নির্মম সামাজিক প্রতিচ্ছবি। এমন এক সমাজের প্রতিচ্ছবি, যেখানে বাবা-মা সন্তানকে মানুষ করতে নিজেদের জীবন শেষ করে দেন, অথচ বার্ধক্যে এসে নিজেরাই হয়ে পড়েন অনাকাঙ্ক্ষিত, অপ্রয়োজনীয়, কখনো বোঝা।
বাংলাদেশের সমাজ একসময় পরিবারকেন্দ্রিক ছিল। যৌথ পরিবার শুধু অর্থনৈতিক কাঠামো ছিল না; এটি ছিল আবেগ, নিরাপত্তা ও সম্পর্কের এক অদৃশ্য আশ্রয়। দাদা-দাদি, নানা-নানি, চাচা-ফুফু, খালা-মামাদের উপস্থিতিতে পরিবার ছিল এক ধরনের সামাজিক বিদ্যালয়। সেখানে বৃদ্ধরা ছিলেন অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার, সিদ্ধান্তের কেন্দ্র এবং শ্রদ্ধার জায়গা। কিন্তু নগরায়ণ, ভোগবাদী সংস্কৃতি, ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবন এবং প্রতিযোগিতামূলক অর্থনৈতিক বাস্তবতা সেই কাঠামোকে ধীরে ধীরে ভেঙে দিয়েছে। এখন একই শহরে থেকেও সন্তানদের সঙ্গে বাবা-মায়ের দূরত্ব কখনো কয়েক কিলোমিটার নয়, কয়েক আলোকবর্ষের মতো।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এই পরিবর্তনকে আমরা এখন স্বাভাবিক হিসেবে নিতে শুরু করেছি। বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়ছে, একাকী বৃদ্ধের সংখ্যা বাড়ছে, বৃদ্ধ নির্যাতনের ঘটনাও বাড়ছে। অথচ এই বৃদ্ধ মানুষগুলোই একসময় সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দিয়েছেন, রাত জেগে অসুস্থ সন্তানের পাশে বসে থেকেছেন, নিজেদের শখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়েছেন। একজন মা তার সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে নিজের ক্ষুধা লুকিয়েছেন, একজন বাবা নিজের স্বপ্ন বিক্রি করে সন্তানের স্বপ্ন কিনেছেন। কিন্তু সেই সন্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর যখন বাবা-মা একা হয়ে যান, তখন প্রশ্ন জাগে—সভ্যতার এই অগ্রগতি আসলে কাদের জন্য?
আজকের সমাজে সফলতার সংজ্ঞাও ভয়াবহভাবে বদলে গেছে। বড় চাকরি, বিদেশে বসবাস, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, দামি গাড়ি এসবকেই আমরা অর্জন হিসেবে দেখি। কিন্তু যে সন্তান বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়াতে পারে না, তার সফলতা কতটা মানবিক? যে সন্তান মায়ের ফোন ধরার সময় পায় না, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটায়, তার আধুনিকতা আসলে কী? প্রযুক্তি আমাদের যোগাযোগ বাড়িয়েছে, কিন্তু সম্পর্ক কমিয়েছে। আমরা এখন প্রতিদিন শত মানুষের সঙ্গে অনলাইনে যুক্ত থাকি, অথচ নিজের মায়ের নিঃসঙ্গতা বুঝতে পারি না।

বৃদ্ধাশ্রমের প্রসঙ্গ এলে অনেকেই যুক্তি দেন—সব সন্তান খারাপ নয়, অনেক সময় পরিস্থিতিও দায়ী। এই কথায় সত্যতা আছে। বাস্তবতার চাপে অনেক পরিবার আলাদা থাকে, কর্মব্যস্ততা থাকে, বিদেশে থাকতে হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দূরে থাকলেই কি দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? একজন বৃদ্ধ মা বা বাবার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সবসময় টাকা নয়; প্রয়োজন খোঁজ নেওয়া, পাশে থাকা, কথা বলা, অনুভব করানো যে তারা এখনও পরিবারের অংশ। মানুষ বয়স বাড়লে শিশুর মতো হয়ে যায়। তখন তাদের অভিমান বাড়ে, ভয় বাড়ে, একাকীত্ব বাড়ে। সেই সময়টাতে সন্তান যদি শুধু দায়িত্ব নয়, ভালোবাসাটুকুও ভুলে যায়, তখন বার্ধক্য হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে নির্মম অধ্যায়।
বাংলাদেশে বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। গড় আয়ু বেড়েছে, কিন্তু সেই সঙ্গে বাড়েনি সামাজিক নিরাপত্তা বা পারিবারিক সংবেদনশীলতা। শহরের অনেক ফ্ল্যাটে এখন বৃদ্ধ বাবা-মা দিন কাটান টেলিভিশন দেখে বা জানালার পাশে বসে। সন্তান সকালে বেরিয়ে যায়, রাতে ফেরে। অনেক ক্ষেত্রে একই বাসায় থেকেও সম্পর্ক থাকে না। কথা হয় প্রয়োজনের বাইরে খুব কম। ধীরে ধীরে তারা নিজেদের অপ্রয়োজনীয় ভাবতে শুরু করেন। এই মানসিক অবহেলাই একসময় শারীরিক অবহেলায় রূপ নেয়।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, এখন বৃদ্ধাশ্রমকে অনেকেই “সমাধান” হিসেবে দেখেন। অথচ বৃদ্ধাশ্রম কোনো বাবা-মায়ের স্বপ্ন নয়। একজন মা সন্তানকে জন্ম দেন এই আশায় নয় যে, জীবনের শেষ সময়টা তিনি অপরিচিত মানুষের মাঝে কাটাবেন। একজন বাবা সন্তানের জন্য সংগ্রাম করেন এই আশায় নয় যে, বার্ধক্যে তাকে একটি আলাদা কক্ষে নিঃসঙ্গ দিন গুনতে হবে। বৃদ্ধাশ্রম হয়তো কিছু মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা হতে পারে, কিন্তু যখন এটি সামাজিক প্রবণতা হয়ে ওঠে, তখন বুঝতে হবে পরিবার নামের প্রতিষ্ঠানটি ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

এই সংকট শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজেরও সংকট। কারণ পরিবার ভেঙে গেলে সমাজের নৈতিক ভিতও দুর্বল হয়। যে শিশু দেখে তার বাবা-মা বৃদ্ধ দাদা-দাদির সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছে, সে ভবিষ্যতে একই আচরণ শিখবে। অবহেলা উত্তরাধিকার হয়ে যায়। মানবিকতার চর্চা পরিবার থেকেই শুরু হয়। তাই বৃদ্ধদের প্রতি অবহেলা আসলে ভবিষ্যৎ সমাজের প্রতিও অবহেলা।
আজকের প্রজন্মের বড় একটি অংশ মনে করে স্বাধীন জীবন মানেই আলাদা জীবন। কিন্তু স্বাধীনতা যদি সম্পর্কহীনতা তৈরি করে, তবে সেটি আত্মকেন্দ্রিকতা ছাড়া আর কিছু নয়। পশ্চিমা বিশ্বের অনুকরণ করতে গিয়ে আমরা অনেক সময় তাদের সামাজিক কাঠামোর বাস্তবতা বুঝি না। সেখানে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী, সামাজিক সেবা বিস্তৃত। কিন্তু বাংলাদেশে এখনও পরিবারই সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা। সেই পরিবারই যদি ভেঙে যায়, তাহলে বৃদ্ধ মানুষের আশ্রয় কোথায়?
এই পরিস্থিতিতে শুধু আবেগ দিয়ে সমাধান হবে না; প্রয়োজন সামাজিক ও নীতিগত উদ্যোগও। পরিবারে ছোটবেলা থেকেই মানবিক শিক্ষা দিতে হবে। সন্তানকে শুধু ভালো শিক্ষার্থী বা সফল পেশাজীবী নয়, ভালো মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে। স্কুলে নৈতিক শিক্ষা, গণমাধ্যমে সচেতনতা, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের ইতিবাচক চর্চা—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে বৃদ্ধদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে হবে।

তবে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আমাদের নিজেদের কাছেই ফিরে আসে। আমরা কি সত্যিই এত ব্যস্ত হয়ে গেছি যে, বৃদ্ধ মা-বাবার পাশে বসার সময় নেই? আমরা কি এতটাই আধুনিক হয়ে গেছি যে, মায়ের নিঃসঙ্গতা বুঝি না? সমাজ যত উন্নতই হোক, মানবিকতা হারিয়ে গেলে সেই উন্নয়ন অর্থহীন হয়ে পড়ে।
একটি মা তার সন্তানের জন্য সারাজীবন দরজা খোলা রাখেন। সেই মা যদি জীবনের শেষ সময়ে একা ঘরে পড়ে থাকেন, তবে সেটি শুধু একটি পরিবারের ব্যর্থতা নয়; এটি পুরো সমাজের নৈতিক পরাজয়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কিংবা আধুনিক নগরজীবন—কোনোটিই তখন আর গৌরবের বিষয় থাকে না। কারণ একটি সমাজের প্রকৃত সভ্যতা নির্ধারিত হয় সে তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষদের কতটা মর্যাদা দেয়, কতটা ভালোবাসে।
আজ যারা নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত, তারাও একদিন বৃদ্ধ হবেন। তখন হয়তো তারাও অপেক্ষা করবেন একটি ফোনকলের জন্য, একটি দরজায় কড়া নাড়ার শব্দের জন্য, কিংবা সন্তানের একটু সময়ের জন্য। জীবন বড় অদ্ভুত চক্রে ঘোরে। আমরা আজ আমাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে যেমন আচরণ করছি, আগামী প্রজন্ম হয়তো আমাদের সঙ্গেও তেমনই করবে। তাই এখনও সময় আছে। বৃদ্ধাশ্রমের দরজায় সমাজকে ঠেলে দেওয়ার আগে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে নিজেদের ঘরের দিকে, নিজেদের সম্পর্কের দিকে, নিজেদের মানবিকতার দিকে।
কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ শুধু অর্থ, সাফল্য বা প্রতিষ্ঠা দিয়ে বাঁচে না; মানুষ বাঁচে সম্পর্কের উষ্ণতায়। আর সেই উষ্ণতা হারিয়ে গেলে সবচেয়ে বড় বাড়িটিও একসময় নিঃসঙ্গ কারাগারে পরিণত হয়।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে ভয়ংকর পরিবর্তনটি ঘটছে মানুষের অনুভূতিতে। আগে সমাজে “বৃদ্ধ” শব্দটির সঙ্গে মমতা, শ্রদ্ধা ও অভিজ্ঞতার সম্পর্ক ছিল। এখন অনেক ক্ষেত্রে এটি হয়ে উঠছে “অতিরিক্ত দায়িত্ব”-এর প্রতিশব্দ। সন্তানদের জীবনে বাবা-মায়ের জায়গা ক্রমশ আবেগের কেন্দ্র থেকে সরে গিয়ে আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। ঈদে একটি ফোনকল, জন্মদিনে একটি ফুল, মাস শেষে কিছু টাকা পাঠানো—অনেকেই এটাকেই দায়িত্ব পালন মনে করেন। অথচ একজন বৃদ্ধ মা-বাবার প্রয়োজন শুধু অর্থ নয়; প্রয়োজন সন্তানের উপস্থিতি, একটু সময়, কিছু কথা, কিছু স্পর্শ।
সমাজবিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই সতর্ক করছেন যে, নগরজীবনের যান্ত্রিকতা মানুষের পারিবারিক সম্পর্ককে দুর্বল করে দিচ্ছে। বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত জীবনে ব্যক্তিস্বাধীনতার ধারণা এমনভাবে প্রবল হয়েছে যে, পরিবার এখন অনেকের কাছে আবেগের জায়গা নয়, বরং ব্যক্তিগত জীবনের একটি “অতিরিক্ত চাপ”। এই প্রবণতা শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বজুড়েই দেখা যাচ্ছে। তবে বাংলাদেশের মতো সমাজে এর প্রভাব আরও গভীর, কারণ এখানে এখনও অধিকাংশ বৃদ্ধ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা পরিবারনির্ভর।
একসময় বার্ধক্য মানেই ছিল পরিবারের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা। নাতি-নাতনিদের গল্প বলা, সংসারের সিদ্ধান্তে মত দেওয়া, পরিবারের ইতিহাস ধরে রাখা—এসবই ছিল বৃদ্ধদের ভূমিকা। এখন সেই মানুষগুলোকে অনেক সময় আলাদা ঘরে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। কেউ কেউ দিনের পর দিন কারও সঙ্গে কথা বলার সুযোগও পান না। একাকীত্ব ধীরে ধীরে তাদের মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, দীর্ঘস্থায়ী নিঃসঙ্গতা হৃদরোগ, বিষণ্নতা ও স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি বাড়ায়। অর্থাৎ অবহেলা শুধু মানসিক কষ্ট নয়; এটি শারীরিক মৃত্যুকেও ত্বরান্বিত করে।
মর্মান্তিক বিষয় হলো, আমাদের সমাজে এখনও অনেক বৃদ্ধ মা-বাবা সন্তানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে চান না। অপমান, অবহেলা, একাকীত্ব—সবকিছু নীরবে সহ্য করেন। কারণ তারা সন্তানকে ছোট করতে চান না। একজন মা শেষ বয়সেও সন্তানের দোষ আড়াল করতে চান। একজন বাবা অপমানিত হয়েও সন্তানের সাফল্যে গর্ব খোঁজেন। এই নিঃশব্দ ভালোবাসার সুযোগই অনেক সময় নেয় স্বার্থপর সমাজ।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বাবা-মায়ের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। ইসলাম ধর্মে মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাতের কথা বলা হয়েছে। বাবা-মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহারকে ইবাদতের সমতুল্য গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলা সংস্কৃতিতেও পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধা অন্যতম নৈতিক মূল্যবোধ। অথচ বাস্তবে আমরা এমন এক সমাজে দাঁড়িয়ে গেছি, যেখানে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কান্না প্রতিবেশী শুনতে পায়, কিন্তু সন্তান শোনে না।
এই সংকটের আরেকটি দিক হলো অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তন। আগে সন্তানরা পরিবারকে কেন্দ্র করে বড় হতো। এখন অনেক ক্ষেত্রে সম্পর্কও হিসাবকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। বাবা-মা যতদিন আর্থিকভাবে সক্ষম, ততদিন তাদের গুরুত্ব থাকে; অসুস্থ বা নির্ভরশীল হয়ে পড়লেই অবহেলা শুরু হয়। এটি শুধু পারিবারিক ব্যর্থতা নয়; এটি মানবিকতার গভীর অবক্ষয়।
তবে আশার কথাও আছে। এখনও অসংখ্য সন্তান আছেন, যারা বাবা-মায়ের জন্য নিজেদের জীবন বদলে দেন। অনেকেই চাকরি, ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য বা বিদেশের সুযোগ ছেড়ে বাবা-মায়ের পাশে থাকেন। সমাজ এখনও পুরোপুরি নিষ্ঠুর হয়ে যায়নি। কিন্তু বিচ্ছিন্ন কিছু মানবিক উদাহরণ দিয়ে সামগ্রিক সংকট আড়াল করা যাবে না। কারণ প্রতিটি একাকী বৃদ্ধ মানুষের গল্প আমাদের সামাজিক ব্যর্থতার গল্প।
গণমাধ্যমে যখন কোনো বৃদ্ধ মা বা বাবার নিঃসঙ্গ মৃত্যুর খবর আসে, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েক দিন আলোচনা হয়, আবেগ তৈরি হয়, ক্ষোভ দেখা যায়। তারপর আবার সব স্বাভাবিক হয়ে যায়। কিন্তু এই ঘটনাগুলোকে শুধুই “ভাইরাল সংবাদ” হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলো আমাদের সমাজের গভীর অসুখের লক্ষণ। যে সমাজে বৃদ্ধরা নিরাপদ নন, সেই সমাজ কখনো প্রকৃত অর্থে সভ্য হতে পারে না।
এখন প্রয়োজন আত্মসমালোচনার। আমরা সন্তানদের কী শেখাচ্ছি? শুধু প্রতিযোগিতা, ক্যারিয়ার আর সাফল্যের শিক্ষা দিলে হবে না; শেখাতে হবে দায়িত্ব, কৃতজ্ঞতা ও মানবিকতা। কারণ প্রযুক্তি মানুষকে দক্ষ করতে পারে, কিন্তু মানবিক করে তুলতে পারে না। সেটি শেখাতে হয় পরিবারে।
একটি বিষয় আমাদের মনে রাখা দরকার—বাবা-মা কখনো সন্তানের কাছে বিলাসিতা চান না। তারা চান না দামি উপহার, বড় আয়োজন বা সামাজিক প্রদর্শনী। তারা শুধু চান, সন্তান যেন পাশে থাকে। বয়স বাড়লে মানুষ আবার ছোট হয়ে যায়। তখন তারা সন্তানের কণ্ঠে ভরসা খোঁজেন, উপস্থিতিতে নিরাপত্তা খোঁজেন। সেই সময়টাতে যদি সন্তান দূরে সরে যায়, তাহলে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষ হয়ে ওঠেন একজন বৃদ্ধ মা বা বাবা।
আজকের শিশুরা আগামী দিনের সমাজ গড়বে। তারা যদি দেখে বৃদ্ধদের অবহেলা করা স্বাভাবিক, তাহলে ভবিষ্যতের সমাজ আরও কঠিন ও সম্পর্কহীন হয়ে উঠবে। তাই এখনও সময় আছে পরিবারকে নতুন করে ভাবার, সম্পর্ককে নতুন করে মূল্য দেওয়ার। কারণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন মানুষকে স্বচ্ছল করতে পারে, কিন্তু মানবিক সম্পর্কই মানুষকে পরিপূর্ণ করে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে মানুষ বৃদ্ধ হলে একা হয়ে যাবে? যেখানে একজন মা মৃত্যুর পর কয়েক দিন পড়ে থাকবেন, আর কেউ জানবেও না? যদি উত্তর “না” হয়, তাহলে পরিবর্তন শুরু করতে হবে এখনই, নিজেদের ঘর থেকেই।
কারণ সভ্যতার প্রকৃত পরীক্ষা হয় বৃদ্ধ মানুষের মুখে হাসি আছে কি না, তাদের চোখে নিরাপত্তা আছে কি না, তাদের শেষ বয়সে পাশে কেউ আছে কি না—সেই প্রশ্নে। আর সেই পরীক্ষায় আমরা যদি বারবার ব্যর্থ হই, তাহলে আমাদের উন্নয়ন, আধুনিকতা ও অগ্রগতির সব দাবি একসময় নিষ্ঠুর ভণ্ডামিতে পরিণত হবে।

Scroll to Top