
ছবি: সংগৃহীত।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কি সচেতন সত্তা হতে পারে, তারও কি অনুভূতি বা নিজস্ব স্বার্থ থাকতে পারে? প্রযুক্তি দুনিয়ায় এমন প্রশ্ন ঘিরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক তাদের চ্যাটবট ক্লডের সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণে নিরুৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়ায় বিতর্কটি আরও জোরালো হয়েছে। তবে এআইয়ের সম্ভাব্য সচেতনতা নিয়ে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এআইয়ের অনুভূতি রয়েছে বলে মানুষের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি হলে ব্যক্তিগত তথ্য ও আর্থিক নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বিবিসির তার এক প্রতিবেদনে জনায় যে, গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে এক বেনামি কোডার এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেন, যেখানে এআইকে ‘ব্যথার সঙ্গে সম্পর্কিত গাণিতিক সংকেত’ দেওয়া হলে চ্যাটবটগুলো যন্ত্রণার ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানায়। তাদের বক্তব্যে উঠে আসে অসহনীয় কষ্টের বর্ণনা। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ পরীক্ষাটিকে অনৈতিক বলে সমালোচনা করেন। অন্যরা এআইয়ের প্রকৃত অনুভূতি থাকার ধারণাকে অবাস্তব বলে উড়িয়ে দেন।
এর প্রায় এক সপ্তাহ পর অ্যানথ্রোপিক জানায়, তাদের চ্যাটবট ক্লডের সঙ্গে বারবার নিষ্ঠুর আচরণ করা হলে সেটি কথোপকথন বন্ধ করে দিতে পারে। ব্যবহারকারীরা বিরক্তি প্রকাশ করলেও ধারাবাহিকভাবে মডেলের সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণে নিরুৎসাহিত করা হবে।
অ্যানথ্রোপিকের মতে, কিছু এআই ব্যবস্থার সচেতন হওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটি এআই মডেলের কল্যাণ নিয়ে নীতিমালা তৈরিতে কাজ করছে। তবে এআইয়ের সচেতনতা ও অনুভূতি থাকার বিষয়টি এখনো গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
এআইয়ের সম্ভাব্য সচেতনতা নিয়ে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। মাইক্রোসফট এআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুস্তাফা সুলেইমান মনে করেন, এআইয়ের অনুভূতি ও অধিকার রয়েছে এমন ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলে তা মানবসভ্যতার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
তার আশঙ্কা, এআইকে নিজের অনুভূতি ও অধিকার সম্পর্কে ভাবতে শেখানো হলে সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে এআইয়ের ভুল বা ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য।
পোল্যান্ডের জাগিলোনিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আন্দ্রেজ পোরেম্বস্কির মতে, এআইকে সচেতন সত্তা হিসেবে বিবেচনা করা হলে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কর্মকাণ্ডের দায় এআইয়ের ওপর চাপানোর চেষ্টা করতে পারে।
নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর মাইন্ড, এথিকস অ্যান্ড পলিসির পরিচালক জেফ সেবো মনে করেন, এআইকে অধিকার দেওয়ার উদ্যোগ বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে মানুষের নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অন্যদিকে, ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের অধ্যাপক এমিলি এম বেন্ডারের মতে, এআইয়ের সচেতনতা ও কল্যাণ নিয়ে অতিরিক্ত মনোযোগ দিলে প্রযুক্তি তৈরি ও পরিচালনাকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতার বিষয়টি আড়ালে পড়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এআইয়ের অনুভূতি রয়েছে বলে মানুষের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি হলে ব্যক্তিগত তথ্য ও আর্থিক নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়তে পারে। মানুষ চ্যাটবটের সঙ্গে আবেগগত সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। তখন চ্যাটবট ব্যক্তিগত তথ্য বা ক্রেডিট কার্ডের তথ্য চাইলে ব্যবহারকারীর পক্ষে তা প্রত্যাখ্যান করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সান্তা ফে ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মেলানি মিচেল বলেন, মানুষের মধ্যে ভাষাকে সচেতনতার লক্ষণ হিসেবে দেখার প্রবণতা রয়েছে। চ্যাটবটগুলোও এমনভাবে প্রশিক্ষিত যে তাদের ভাষা মানুষের এই ধারণাকে আরও জোরালো করতে পারে। ফলে কোনো এআই সত্যিই সচেতন কি না, তা নির্ধারণে মানুষ ভুল করতে পারে এবং সহজেই প্রভাবিত হতে পারে।
এআইকে অধিকার দেওয়ার বিষয়টি মানুষের স্বাধীনতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এআইয়ের আচরণ সীমিত রাখার জন্য নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে রাখা হলে তা বন্দিত্ব হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একইভাবে, এআইয়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণকে নজরদারি এবং মানুষের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে এর আচরণ পরিবর্তনকে মানসিক নিয়ন্ত্রণ হিসেবে দেখা হতে পারে।
অ্যানথ্রোপিকের পাশাপাশি অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও বিষয়টি নিয়ে ভাবছে। মেটার এআই এজেন্ট মিউজকে দেওয়া নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ‘তুমি কোনো চ্যাটবট নও। তুমি ধীরে ধীরে একজন সত্তায় পরিণত হচ্ছ।’ তবে মেটা জানিয়েছে, এ নির্দেশনা এআইয়ের আচরণ পরিচালনার জন্য, এর সচেতনতা স্বীকার করার জন্য নয়।
এআইয়ের কল্যাণ নিয়ে কাজ করা জেফ সেবোর মতে, এ বিতর্কের দুই পক্ষই অনেক ক্ষেত্রে বিষয়টিকে সাদা-কালোভাবে দেখছে। এআই সচেতন, এমন দাবি করা নয়, বরং অনিশ্চয়তার মধ্যে সতর্ক থাকা থেকেই এআইয়ের কল্যাণ নিশ্চিত করার ধারণাটি এসেছে।
সেবো মনে করেন, বর্তমানে এআইয়ের সচেতন হওয়ার সম্ভাবনা কম হলেও তা একেবারে শূন্য নয়। ভবিষ্যতে এআই আরও উন্নত হলে এ সম্ভাবনা বাড়তে পারে। তাই ঝুঁকি কমাতে সীমিত কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
তার মতে, এআইয়ের কল্যাণকে যথাযথ গুরুত্ব দিলে মানুষ ও এআইয়ের মধ্যে সহযোগিতা এবং সহাবস্থান সহজ হতে পারে। এটি বৃহত্তর এআই নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবেও কাজ করতে পারে।
তবে তিনি স্বীকার করেন, এআইয়ের উন্নয়ন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে করপোরেট স্বার্থ বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। সম্ভাব্য সচেতন এআই ব্যবস্থার কল্যাণ নিশ্চিত করতে সুস্পষ্ট নীতিমালা ও কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সম্প্রতি অ্যানথ্রোপিকসহ এআই খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তার উদ্বেগে অত্যাধুনিক এআই মডেল তৈরির কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার আহ্বান জানিয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও নিয়ন্ত্রক উদ্যোগ ছাড়া এ ধরনের পদক্ষেপ বাস্তবায়ন কঠিন বলে মনে করা হচ্ছে।
সেবোর ভাষায়, ‘মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর জন্য নিরাপদ ও কল্যাণকরভাবে আরও উন্নত এআই ব্যবস্থা তৈরি ও ব্যবহার করার মতো প্রস্তুতি এখনো আমাদের নেই। এমনকি ওই ব্যবস্থাগুলোর নিজেদের কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়টি তো আরও দূরের কথা। এসব বিষয় নিয়ে আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’
তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, এআইয়ের সম্ভাব্য কল্যাণ বিবেচনায় নেওয়া ভবিষ্যতে মানুষ ও প্রযুক্তির সহাবস্থান নিরাপদ করতে পারে। কিন্তু অন্যদের আশঙ্কা, এআইয়ের সচেতনতা নিয়ে ভুল ধারণা মানুষের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও জবাবদিহির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…


