উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার: অভিজ্ঞতা, সততা, নৈতিকতার অগ্রপথিক | চ্যানেল আই অনলাইন

উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার: অভিজ্ঞতা, সততা, নৈতিকতার অগ্রপথিক | চ্যানেল আই অনলাইন

বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার একজন সুপরিচিত প্রশাসক, নীতিনির্ধারক এবং সমাজচিন্তক।

দীর্ঘ সরকারি চাকরিজীবনে অর্জিত বাস্তব অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক প্রজ্ঞা এবং জনগণের কল্যাণে অঙ্গীকার তাঁকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এক নির্ভরযোগ্য মুখে পরিণত করেছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন থেকে শুরু করে আজকের দিনে খাদ্য ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, তাঁর ক্যারিয়ার একাধারে প্রশাসনিক সাফল্য, নৈতিক দায়িত্ববোধ এবং জনকল্যাণে নিবেদিত এক অটুট কর্মযাত্রার প্রতিচ্ছবি।

আলী ইমাম মজুমদারের কর্মজীবনের সূচনা হয় প্রশাসনিক ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা হিসেবে। মাঠ প্রশাসনে দায়িত্ব পালনকালে তিনি সরাসরি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা লাভ করেন। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি স্থানীয় জনসংখ্যার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে সক্ষম হন। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে সরকারের নীতি বাস্তবায়ন ও জনসেবা কার্যক্রমে আরও কার্যকরী করে তোলে।

জেলা ও বিভাগীয় প্রশাসনের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনকালে তিনি নেতৃত্ব, সমন্বয় ক্ষমতা এবং বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা প্রদর্শন করেন। এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁকে ধাপে ধাপে উচ্চ পদস্থ প্রশাসনিক দায়িত্বে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে।

আলী ইমাম মজুমদার ১৯৫০ সালে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের কুমিল্লা জেলার নানুয়া দিঘিরপাড়ে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে ১৯৬৯ সালে স্নাতক ও ১৯৭৩ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী সম্পন্ন করেন।

তিনি ১৯৭৭ সালের বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের প্রশাসন ক্যাডারের সদস্য হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। চাকরিজীবনে তিনি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে সহকারী কমিশনার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটসহ উপজেলা ও জেলায় বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মূখ্য সচিব ও পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব, সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় আলী ইমাম মজুমদার রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রীয় দায়িত্বে ছিলেন।

সরকারের নীতি বাস্তবায়ন, মন্ত্রিপরিষদ ও অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে সমন্বয়, এবং জটিল প্রশাসনিক সমস্যার সমাধান, সব ক্ষেত্রেই তিনি দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন।

সহকর্মীরা তাঁকে একজন নির্ভীক, সুশৃঙ্খল প্রশাসক এবং কার্যকর সমন্বয়কারী হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি, নিরপেক্ষতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা জটিল প্রশাসনিক সমস্যার ক্ষেত্রে প্রশংসিত হয়। এই সময়ে তিনি সরকারের নীতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি জনগণের ক্ষুদ্রতম চাহিদা ও অভিযোগকেও গুরুত্ব দিয়েছেন, যা তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়েছে।

সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পরও আলী ইমাম মজুমদার সমাজে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ট্রাস্টি বোর্ডের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ দায়িত্বে তিনি সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং দুর্নীতি দমনের আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করেছেন। দুর্নীতি প্রতিরোধ, প্রশাসনিক সংস্কার, এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির গুরুত্ব নিয়ে তিনি নিয়মিত গণমাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছেন।

তাঁর দৃঢ় অবস্থান প্রমাণ করেছে, সরকারি চাকরিজীবনের পরও তিনি সমাজে নৈতিকতা ও সুশাসনের জন্য নিরলসভাবে কাজ করছেন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তিনি জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)-এর পরামর্শক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে সহায়ক করেছে।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি এবং নীতি নির্ভর সমাধান বাস্তবায়নে তাঁর অভিজ্ঞতা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করার মাধ্যমে কার্যকর ফলাফল নিশ্চিত করেছেন।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারে আলী ইমাম মজুমদারকে প্রথমে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

পরে তাঁকে উপদেষ্টার মর্যাদা প্রদান করা হয়। শুরুতে তিনি দপ্তর ছাড়াই সরকারের নানা কাজে যুক্ত ছিলেন। পরে তাঁকে খাদ্য উপদেষ্টার দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও তাঁর ওপর অর্পিত হয়।

খাদ্য উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি সম্প্রসারণের ঘোষণা দেন, যাতে আরও পাঁচ লাখ পরিবার যুক্ত হয়। দেশের মোট ৫৫ লাখ পরিবার স্বল্পমূল্যে চাল পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “সরকারি গুদামের চালের মান এখন আগের মতো নয়, বাজারে যে চাল ৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়, ওএমএস ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে মানুষ একই চাল ৩০ ও ১৫ টাকায় পাবে।”

এটি তাঁর বাস্তবমুখী নীতি ও সাধারণ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতিফলন।

তিনি আরও বলেন, “খাদ্য মজুত রয়েছে ২২ লাখ মেট্রিক টন, যার মধ্যে ২০ লাখ মেট্রিক টনের বেশি চাল। আমন ফসল ভালো হলে আমদানির প্রয়োজন কমবে।”

ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি ভূমি খাতে সংস্কার ও স্বচ্ছতা আনতে অটোমেটেড ভূমি সেবা সিস্টেম চালুর উদ্যোগ নেন। দেশে শতকরা ৯০ ভাগ বিরোধের উৎস ভূমি—এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে তিনি প্রযুক্তি ব্যবহার এবং মানবসম্পদের দক্ষতা ও জবাবদিহিতার ওপর জোর দেন।

ফেনী জেলায় এই প্রকল্পকে পাইলট হিসেবে চালু করা হয়েছে ইউএনডিপির সহায়তায়।

তিনি কর্মশালায় বলেন, “ভূমি খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা মানে শুধু প্রযুক্তি নয়, মানুষের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যারা ভালো কাজ করবে, তাদের সহযোগিতা করা হবে; অন্যরা আইন ভঙ্গ করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সাম্প্রতিক সময়ে তিনি ফেনী ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিভিন্ন সভা, কর্মশালা ও সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে বলেন, “ভূমি খাতের ডিজিটালাইজেশন মানে পুরোপুরি সমস্যা সমাধান নয়; মানুষের সচেতনতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতার সমন্বয় প্রয়োজন। আমাদের লক্ষ্য হলো প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ মিলিয়ে জনগণের জন্য দ্রুত ও সুষ্ঠু সেবা নিশ্চিত করা।”

তিনি কৃষকদের পুনর্বাসন, বাঁধ মেরামত, এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরাসরি তদারকি করছেন এবং বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত ও হতদরিদ্রদের পাশে থাকা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব।”

আলী ইমাম মজুমদার নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ রাখেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষক, দরিদ্র পরিবার এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেন, সমস্যা চিহ্নিত করেন এবং সমাধান প্রক্রিয়ায় দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। খাদ্য নিরাপত্তা, পুনর্বাসন, ভূমি খাতে ডিজিটাল রূপান্তর—সব ক্ষেত্রেই তিনি ফলপ্রসূ নীতি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে কাজ করেন।

তিনি দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সর্বদা সোচ্চার। তাঁর বক্তব্যে প্রতিফলিত হয় সাধারণ মানুষের সমস্যার প্রতি আন্তরিকতা।

বাস্তবায়নযোগ্য নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে তিনি কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছেন। খাদ্য নিরাপত্তা ও ভূমি সংস্কার—দুটি খাতেই তাঁর নেতৃত্ব দেশের জনগণের প্রত্যাশা পূরণে নতুন দিক উন্মোচন করেছে।

আলী ইমাম মজুমদারের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, সততা, নৈতিকতা এবং কর্মনিষ্ঠা তাঁকে সমসাময়িক বাংলাদেশে এক নির্ভরযোগ্য নীতিনির্ধারক, প্রশাসক এবং সমাজচিন্তকে পরিণত করেছে। তাঁর ক্যারিয়ার প্রমাণ করে, রাষ্ট্রের জন্য নিবেদিত এক প্রশাসকের অবদান অবসরের পরও দেশের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকতে পারে।

Scroll to Top