রাজধানীর বেসরকারি উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই অভ্যুত্থানে সোচ্চার শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষকদের হেনস্থা ও চাকরিচ্যুত করায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) এক বিবৃতিতে শিক্ষকরা এ নিন্দা জানান।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, এই ষড়যন্ত্রের সর্বশেষ শিকার জেনারেল এডুকেশন বিভাগের প্রভাষক শ্যামা ভট্টাচার্য্য। কিছুদিন আগে শুধু হেনস্থা ও হয়রানির উদ্দেশ্যে কোনো প্রকার যৌক্তিক কারণ ছাড়াই তাকে বাংলা বিভাগ থেকে একই পদে জেনারেল এডুকেশনে স্থানান্তর করা হয়েছে। এখন তাকে পদত্যাগ করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ইয়াসমীন আরা লেখা ও প্রশাসনের অন্যান্যরা বল প্রয়োগ করে যাচ্ছেন। শ্যামা ভট্টাচার্য্যকে সম্প্রতি পক্ষপাতিত্বমূলকভাবে একটি কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করেছে কর্তৃপক্ষ। যে ঘটনার প্রেক্ষিতে এই নোটিশ, তাতে তার ‘অপরাধ’ হলো, তিনি প্রশাসনের মদদপুষ্ট পেটোয়া বাহিনীর আক্রমণ থেকে একজন শিক্ষার্থীকে রক্ষা করেছিলেন।
কর্মস্থলে নিরাপত্তা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার বদলে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো শিক্ষককে উল্টো প্রশাসনিকভাবে হেনস্থা করার এই উদ্যোগের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক।
বিবৃতিতে আরো জানানো হয়, “শ্যামা ভট্টাচার্য্যের বিরুদ্ধে উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান এই ষড়যন্ত্র কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ভুক্তভোগী শিক্ষকদের মারফত আমরা জেনেছি যে, ঘটনার সূত্রপাত জুলাই আন্দোলনের সময়ে। ১ আগস্ট ২০২৪ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জুলাই আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান না নিতে সতর্ক করে প্রশাসন। এই সিদ্ধান্ত অমান্য করলে সংশ্লিষ্টদের নাম-ঠিকানা রাষ্ট্রীয় সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হবে বলেও সভায় বার্তা দেন উপাচার্য।”
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, “বাংলা বিভাগের শিক্ষকরা সম্মিলিতভাবে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেন এবং শিক্ষার্থীদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাদের পাশে থাকার ঘোষণা দেন। প্রশাসনিক নির্দেশ অমান্য করে বাংলা বিভাগই প্রথম শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পাশে থাকার আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়। মূলত এ কারণেই বাংলা বিভাগের শিক্ষকরা প্রশাসনের চক্ষুশূল হয়ে পড়েন।”
বিবৃতিতে জানানো হয়, আমরা আরও জেনেছি যে, ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী সরকারের কর্মকাণ্ডের প্রতি উপাচার্য অধ্যাপক ইয়াসমীন আরা লেখার আনুগত্যের ইতিহাস দীর্ঘ। গোপালগঞ্জ জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফ বি মোল্লার আপন বোন অধ্যাপক ইয়াসমীন আরা লেখা প্রকাশ্যে ২০২৪-এর একতরফা বিতর্কিত নির্বাচনের পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যবহার করে ‘গো ভোট’ নামক প্রচারণা আয়োজন করেন। এই উপাচার্য ও তার প্রশাসন স্বৈরাচারের দোসর হিসেবেই নানা প্রক্রিয়ায় চব্বিশের জুলাই জুড়ে শিক্ষার্থীদের নিবৃত্ত করার অপচেষ্টা করে গেছেন। যেমন, ১৬ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস বন্ধ করা ও ছাত্রলীগ দিয়ে পাহারা বসানো; ১৭ জুলাই শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত সমন্বয়ক কমিটির বিপরীতে প্রশাসনপন্থিদের দ্বারা ৩ আগস্ট ২০২৪ তারিখে পাল্টা সমন্বয়ক কমিটি গঠন ইত্যাদি।
বিবৃতিতে আরো জানানো হয়, অভ্যুত্থানে এমন শোচনীয় পরাভবের পরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো চৈতন্যোদয় হয়নি। বরং, অভ্যুত্থানোত্তরকালে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসন নতুন ‘ব্যবস্থাপত্র’ গ্রহণ করে। দঙ্গলবাজদের মদদ দিয়ে অভ্যুত্থানের পক্ষে সোচ্চার শিক্ষকদের পূর্ব-বিদ্বেষের রেশ ধরে প্রশাসন হেনস্থা ও হয়রানি করা শুরু করে। যার সর্বশেষ শিকার শ্যামা ভট্টাচার্য্য।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চাকুরিচ্যুত হওয়া শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা জানতে পেরেছি যে, শ্যামা ভট্টাচার্য্য বাংলা বিভাগের একজন শিক্ষার্থী পলাশ হোসেনের ওপর সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদ করেন এবং তার পাশে দাঁড়ান। পলাশ হোসেনের ‘অপরাধ’ ছিল তিনি শিক্ষকদের অযৌক্তিকভাবে চাকুরিচ্যুত করার প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এর ফলস্বরূপ তাকে মৌখিক পরীক্ষা চলাকালে তুলে নিয়ে গিয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে মারধর করে প্রশাসনের পেটোয়া বাহিনী। এই ঘটনায় পলাশ এবং নিরাপত্তার শঙ্কায় ভোগা অন্যান্য শিক্ষার্থী থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে গিয়েও ব্যর্থ হন এবং পরবর্তী সময়ে পলাশকে উপাচার্যের কক্ষে ডেকে নিয়ে গিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষে একটি বানোয়াট বক্তব্য নেওয়া হয়। ঘটনা পরম্পরা বিশ্লেষণের প্রেক্ষিতে আমরা মনে করি, শ্যাম্যা ভট্টাচার্য্য যথার্থই শিক্ষকসুলভ ভূমিকা পালন করেছেন। এ কারণে যদি প্রশাসনের অনুগত শিক্ষক দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে কাউকে চাকুরিচ্যুত কিংবা পদত্যাগে বাধ্য করানো হয়, তাহলে তা হবে নজিরবিহীন এক বিদ্যায়তনিক স্বেচ্ছাচারিতা। তদন্ত কমিটি শ্যাম্যা ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে আচরণবিধি ভঙ্গের। অথচ, বিশ্ববিদ্যালয়টি কখনও কর্মরত শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে কোনো সার্ভিস রুল এবং আচরণবিধি প্রদর্শনই করেনি। আমরা জানতে পেরেছি, আদতে বিশ্ববিদ্যালয়টির এখনও পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক চাকুরিবিধি কিংবা আচরণবিধি নেই!
বিবৃতিতে আরো জানানো হয়, অন্যায্যভাবে শিক্ষকদের চাকুরিচ্যুত করাই উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একমাত্র অপরাধ নয়। তাদের বিরুদ্ধে এন্তার অভিযোগ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ড ও প্রশাসন মিলে পরিবারতন্ত্রের যে ‘কেতাবি দৃষ্টান্ত’ গড়ে তুলেছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর যথাযথ তদন্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে সত্যিকারের বিদ্যায়তনে পরিণত করতে হলে সবার আগে দরকার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। এর আগে ভুক্তভোগীরা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) অভিযোগ জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি এবং এর আগে ইউজিসি কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন বা এ সংশ্লিষ্ট কোনো হালনাগাদ তথ্যও প্রকাশ করা হয়নি। উল্টো অভিযোগকারীদের তথ্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে চলে যাওয়ায় তারা আরও চাপে পড়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ থেকে সহায়তা না পেয়ে অত্যন্ত অমানবিক পরিস্থিতির মধ্যে আছেন এখানকার ভুক্তভোগীরা। পুরো ঘটনায় আমরা অত্যন্ত মর্মাহত, স্তম্ভিত ও সংক্ষুব্ধ।
বিবৃতিতে জানানো হয়, উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার লাগাম টানতে এবং তাদের এই ক্ষমতার উৎস সম্পর্কে অনুসন্ধানের উদ্যোগ নিতে আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের প্রতি দাবি জানাই। একই সঙ্গে, শ্যামা ভট্টাচার্য্যসহ শারীরিক-মানসিক নিপীড়নে ভুক্তভোগী সকলের বিরুদ্ধে অনতিবিলম্বে হয়রানিমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করারও দাবি জানাই। আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করার পরও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন এই ঘটনায় কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করে উল্টো অভিযোগকারীদের ভোগান্তি বাড়তে দিয়েছে, সেটিরও আমরা যথাযথ ব্যাখ্যা চাই।


