
‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ ছোট্ট একটি বাক্য। অর্থ, ‘আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।’ মুসলমানদের মধ্যে এটি খুব পরিচিত একটি জিকির। ভুল বা গুনাহ হয়ে গেলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে ইস্তিগফার করা হয়। তবে কোরআন-হাদিসে ইস্তিগফারের গুরুত্ব শুধু গুনাহ মাফের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে তওবা, আল্লাহর রহমত এবং কল্যাণের আশার কথাও এসেছে।
ইস্তিগফার বলতে কী বোঝায়?
ইস্তিগফার শব্দের অর্থ হলো আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। কোনো ভুল বা গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এর মূল উদ্দেশ্য।
কোরআনে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ক্ষমা চাইতে উৎসাহিত করেছেন। সূরা নূহে হজরত নূহ (আ.) তাঁর সম্প্রদায়কে বলেন, “তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই তিনি মহাক্ষমাশীল।”
—সূরা নূহ, ৭১:১০
এর পরের আয়াতগুলোতে বৃষ্টি, সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির মাধ্যমে কল্যাণ দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। —সূরা নূহ, ৭১:১১–১২
শুধু গুনাহ মাফের জন্য?
ইস্তিগফারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য অবশ্যই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া। তবে সূরা নূহের আয়াতগুলোতে ইস্তিগফারের সঙ্গে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের কল্যাণের কথাও এসেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কেউ শুধু ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বললেই নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ, সম্পদ বা কোনো চাওয়া নিশ্চিতভাবে পেয়ে যাবে। কোরআনের আয়াতের মূল শিক্ষা হলো আল্লাহর কাছে ফিরে আসা, তাঁর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং তাঁর রহমতের আশা রাখা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও বেশি ইস্তিগফার করতেন
ইস্তিগফারের গুরুত্ব বোঝাতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও নিয়মিত আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন।
সহিহ বুখারিতে এসেছে, নবীজি (সা.) বলেছেন, তিনি দিনে ৭০ বারের বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ও তওবা করতেন। অন্য একটি সহিহ বর্ণনায় ১০০ বার ইস্তিগফারের কথাও এসেছে।
এ থেকে বোঝা যায়, ইস্তিগফার শুধু গুনাহগার মানুষের জন্য নয়, বরং আল্লাহর নৈকট্য ও তাঁর দিকে ফিরে থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল।
ভুলের পর ফিরে আসার সুযোগ
মানুষ ভুল করবেই। কিন্তু ভুলের পর কীভাবে ফিরে আসবে, ইসলাম সেটিও শেখায়।
কোরআনে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন।” —সূরা আয-যুমার, ৩৯:৫৩
এই আয়াতের আগে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তাঁর রহমত থেকে নিরাশ না হতে বলেছেন। অর্থাৎ গুনাহ হয়ে গেলে হতাশ হয়ে যাওয়ার পরিবর্তে তওবা ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার শিক্ষা রয়েছে।
ইস্তিগফার শুধু মুখের উচ্চারণ নয়
শুধু মুখে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলা আর আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়া এক বিষয় নয়। তওবার ক্ষেত্রে গুনাহ থেকে ফিরে আসা, অনুতপ্ত হওয়া এবং আবার সেই কাজে না ফেরার চেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ।
আর কোনো মানুষের অধিকার নষ্ট হয়ে থাকলে শুধু মুখে ইস্তিগফার করাই যথেষ্ট নয়, সম্ভব হলে তার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষতিপূরণ করার চেষ্টা করাও জরুরি।
প্রতিদিনের জীবনে ইস্তিগফার
ইস্তিগফারের জন্য নির্দিষ্ট কোনো একটি সময়েই সীমাবদ্ধ থাকতে হয় না। নামাজের পর, ঘুমানোর আগে, কাজের ফাঁকে কিংবা কোনো ভুল মনে পড়লে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া যায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, মানুষ যেন ভুলের পর আল্লাহর দিকে ফিরে আসে এবং তাঁর রহমত থেকে নিরাশ না হয়।
তাই ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ শুধু একটি জিকির নয়, এটি নিজের ভুল স্বীকার করে আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার একটি পথ।
ইস্তিগফারের মূল অর্থ ক্ষমা চাওয়া। তবে এর ভেতরে রয়েছে আত্মশুদ্ধিরও একটি শিক্ষা। মানুষ যখন নিজের ভুল স্বীকার করে, তখন তার মধ্যে সংশোধনের সুযোগ তৈরি হয়।
তাই প্রতিদিন কিছু সময় আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া, নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং ভালো পথে থাকার চেষ্টা করা একজন মুমিনের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ আমল হতে পারে।
ইস্তিগফার আমাদের শুধু অতীতের ভুলের দিকে তাকাতে শেখায় না, বরং ভুল থেকে ফিরে নতুনভাবে শুরু করার আশাও দেয়।
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…

