ইসরায়েলের একটি পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রের নিকটবর্তী শহর আরাদ এবং দিমোনায় ইরানের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা কৌশল নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ইস্পাহান প্রদেশে অবস্থিত ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরায়েলি হামলার জবাবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান।
শনিবারের এই হামলায় অন্তত ১৮০ জন আহত হয়েছেন এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই শহরগুলো থেকে শত শত মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে; যার মধ্য দিয়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের এই যুদ্ধ আপাতদৃষ্টিতে আরও বেশি প্রাণঘাতী এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এই পরিস্থিতিকে তাদের “ভবিষ্যতের জন্য লড়াইয়ে একটি অত্যন্ত কঠিন সন্ধ্যা” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলে অন্তত ৪ হাজার ৫৬৪ জন আহত হয়েছেন।
ইসরায়েল নিয়মিতভাবে গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর, লেবানন এবং অন্যান্য স্থানে সামরিক অভিযান চালালেও, গত তিন সপ্তাহে ইসরায়েলি জনগণ যেভাবে যুদ্ধের প্রভাব অনুভব করছে, তা অনেকটাই বিরল। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে, বিশেষ করে গাজায়, ইসরায়েলি বাহিনী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অসামঞ্জস্যপূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করেছে; যেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সাধারণত ইসরায়েলে হামলা চালানোর জন্য সাধারণ প্রযুক্তির রকেট ব্যবহার করে থাকে। গাজায় ইসরায়েলের এই যুদ্ধকে অনেক পণ্ডিত এবং মানবাধিকার গোষ্ঠী ইতিমধ্যে ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
শনিবারের এই বিপুল হতাহতের পরিসংখ্যান এবং আরাদ ও দিমোনায় হামলার পর একটি বড় প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে: ইসরায়েল কি ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করেছে?
ইরান কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করছে?
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় এবং বৈচিত্র্যময়। কয়েক দশক ধরে গড়ে তোলা এই অস্ত্রভাণ্ডারে ব্যালিস্টিক এবং ক্রুজ উভয় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রই রয়েছে এবং মূলত একটি আধুনিক বিমানবাহিনীর অভাব পূরণ করতেই তেহরান এই দীর্ঘপাল্লার হামলা সক্ষমতা তৈরি করেছে।
ইরানের কাছে স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার পাশাপাশি দূরপাল্লার ল্যান্ড-অ্যাটাক (ভূমিতে আঘাত হানতে সক্ষম) এবং অ্যান্টি-শিপ (জাহাজ বিধ্বংসী) ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। ইরানের স্বল্প-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পাল্লা আনুমানিক ১৫০ কিলোমিটার থেকে ৮০০ কিলোমিটারের (৯৩ থেকে ৫০০ মাইল) মধ্যে এবং এগুলো মূলত কাছাকাছি থাকা সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে দ্রুত ও আঞ্চলিক হামলার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো ‘ফাতেহ’ সিরিজের বিভিন্ন সংস্করণ: যেমন, জুলফাগার, কিয়াম-১ এবং পুরনো শাহাব-১ ও ২ ক্ষেপণাস্ত্র। কোনো সংকটময় মুহূর্তে এই স্বল্প পাল্লার অস্ত্রগুলো বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। এগুলোকে একসঙ্গে ঝাঁকে ঝাঁকে নিক্ষেপ করা যায়, ফলে শত্রুপক্ষের সতর্ক হওয়ার সময় কমে যায় এবং আগে থেকে হামলা ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে।

মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে শাহাব-৩, ইমাদ, গদর-১, খোররামশহর ভ্যারিয়েন্ট এবং সেজিল। এছাড়া তাদের কাছে খাইবার শেকান এবং হজ কাসেম-এর মতো নতুন প্রযুক্তিও রয়েছে। ইরানের ল্যান্ড-অ্যাটাক এবং অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সুমার, ইয়া-আলি এবং কুদস ভ্যারিয়েন্ট, হোভেইজেহ, পাভেহ এবং রাদ।
তাদের সবচেয়ে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘সুমার’-এর পাল্লা প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার (১ হাজার ২৪৩ থেকে ১ হাজার ৫৫৩ মাইল)। তবে একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে বা শুক্রবার ভোরে ভারত মহাসাগরে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ঘাঁটি দিয়েগো গার্সিয়াতে দুটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছিল, যার দূরত্ব ইরান থেকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার (২ হাজার ৪৮৫ মাইল)। যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে এই হামলা ব্যর্থ হয়েছে, এবং একজন ইরানি কর্মকর্তা এই ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি এর আগে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ পাল্লা ২ হাজার ২০০ কিলোমিটার (১ হাজার ৩৬৭ মাইল) পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন, কিন্তু গত জুনে ইরানের ওপর ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধের পর তিনি সেই সীমাবদ্ধতা তুলে নেন। ওই যুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রও যোগ দিয়েছিল এবং তারা ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় এক দিনব্যাপী হামলা চালিয়েছিল।
ইসরায়েলের ওপর হামলায় ইরান ক্লাস্টার মিউনিশন বা গুচ্ছবোমাও ব্যবহার করেছে। জেরুজালেম ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড সিকিউরিটির সিনিয়র ফেলো এবং ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কর্মসূচির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক উজি রুবিন মার্কিন সংবাদমাধ্যম মিডিয়া লাইনকে জানিয়েছেন, “ইরানিরা যেসব ওয়ারহেড ব্যবহার করছে, তার প্রতিটিই ক্লাস্টার ওয়ারহেড”।
ক্লাস্টার মিউনিশন বা ওয়ারহেড কী?
একটি ক্লাস্টার ওয়ারহেড বা গুচ্ছবোমা সাধারণ কোনো একক বিস্ফোরকের পরিবর্তে নিজের ভেতর থেকে একাধিক ছোট ছোট বোমা (বোমলেট) ছড়িয়ে দেয়। উজি রুবিন বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, “এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের অগ্রভাগে বড় কোনো বিস্ফোরক ভর্তি ব্যারেল থাকার বদলে এমন একটি মেকানিজম থাকে, যা অনেকগুলো ছোট বোমা ধারণ করে। যখন ক্ষেপণাস্ত্রটি লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন এর বাইরের আবরণ খুলে যায় এবং এটি ঘুরতে থাকে, যার ফলে ভেতরের ছোট বোমাগুলো মহাশূন্যে মুক্ত হয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ে”। তিনি আরও যোগ করেন যে, ক্ষেপণাস্ত্রের ধরন অনুযায়ী ইরানের ক্লাস্টার ওয়ারহেডগুলোতে ২০ থেকে ৩০টি অথবা ৭০ থেকে ৮০টি পর্যন্ত ছোট বোমা থাকতে পারে।
এই ধরনের যুদ্ধাস্ত্র ইরানের জন্য নতুন কিছু নয়। ১২ দিনের সেই যুদ্ধেও ইরান ক্লাস্টার মিউনিশন ব্যবহার করেছিল বলে খবর পাওয়া গেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সেই যুদ্ধে ইরানের ক্লাস্টার মিউনিশনের ব্যবহারকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছিল, অন্যদিকে লেবাননে গুচ্ছবোমা ব্যবহারের জন্য ইসরায়েলও অভিযুক্ত হয়েছে।
২০০৮ সালে ‘কনভেনশন অন ক্লাস্টার মিউনিশন’ গৃহীত হওয়ার সময় গুচ্ছবোমা নিষিদ্ধ করা হয়। তবে ইরান বা ইসরায়েল কেউই এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি।
এগুলো কেন এখন প্রভাব ফেলছে?
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় থাকা সত্ত্বেও তারা আরাদ এবং দিমোনায় আঘাত হানা বেশ কয়েকটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আটকাতে বা ইন্টারসেপ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি জানান, ইরানের এই অস্ত্রগুলো “অত্যন্ত বিশেষ বা অপরিচিত” কিছু নয় এবং এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। তাহলে এই ক্লাস্টার মিউনিশনগুলো কেন এখন এতটা প্রভাব ফেলছে? এর পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে।
গুচ্ছবোমাবাহী কোনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে সফলভাবে ধ্বংস করতে হলে, এর ভেতরের মূল পেলোডটি খুলে ছোট বোমাগুলো ছড়িয়ে পড়ার আগেই তা করতে হবে। একবার পেলোডটি খুলে গেলে, ক্ষেপণাস্ত্রটি একটি নির্দিষ্ট একক লক্ষ্যবস্তু থেকে একাধিক আক্রমণের বিন্দুতে পরিণত হয়, যা ঠেকানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
বৃহস্পতিবার, টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে যে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী তাদের ইন্টারসেপ্টরগুলো (ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী ব্যবস্থা) সংরক্ষণ করতে শুরু করবে। সামরিক কর্মকর্তারা সেসময় জানিয়েছিলেন যে, সাধারণ মানুষ যদি নিরাপদ আশ্রয়ে থাকে, তবে ইরানি ক্লাস্টার বোমাগুলো খুব একটা বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারবে না; তাই তারা কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা থেকে বিরত থাকতে পারে।
পরবর্তী পরিস্থিতি কী হতে পারে?
যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোতে হামলা অব্যাহত রাখতে পারে। ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শনিবার যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। মধ্য ইরানে অবস্থিত এই স্থাপনাটি দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র, যা রাজধানী তেহরান থেকে প্রায় ২২০ কিলোমিটার (১৩৫ মাইল) দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। এর জবাবেই ইরান ইসরায়েলের প্রধান পারমাণবিক স্থাপনার নিকটবর্তী আরাদ এবং দিমোনায় হামলা চালিয়েছে।
ইসরায়েল এর আগে তেহরানের জ্বালানি মজুদ স্থাপনাগুলোতে আঘাত হেনেছিল, যার ফলে ইরানের রাজধানীর আকাশে বিশাল ও বিষাক্ত ধোঁয়ার কুণ্ডলী তৈরি হয়েছিল। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এর আগে ইরানের তেল রপ্তানির মূল কেন্দ্র ‘খারগ আইল্যান্ড’-এ আঘাত হেনেছে এবং পুনরায় এমন হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে।
জবাবে ইরান বৈশ্বিক নৌ-বাণিজ্য এবং তেল পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে এবং তারা আরব উপসাগরীয় দেশগুলো জুড়ে থাকা বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এবং ইরান তা না মানলে জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত হানার হুমকি দিয়েছেন।
শনিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ ট্রাম্প লিখেছেন, যদি ইরান ঠিক এই মুহূর্ত থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোনো হুমকি ছাড়াই হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে খুলে না দেয়, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সবচেয়ে বড়টি থেকে শুরু করে, আঘাত করে নিশ্চিহ্ন করে দেবে।




