ইরান যুদ্ধে কাটা যাচ্ছে আপনার আমার পকেট! | চ্যানেল আই অনলাইন

ইরান যুদ্ধে কাটা যাচ্ছে আপনার আমার পকেট! | চ্যানেল আই অনলাইন

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কি আপনার পকেটেও প্রভাব ফেলতে পারে? এই সংকটের প্রভাব কিভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়ছে? যুদ্ধ থেকে যত দূরেই থাকুন না কেন, যুদ্ধের প্রভাব আছে সবার উপর। কাগজে-কলমে জেনে নেই কিভাবে পকেট কাটা যাবে আমাদের।

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের প্রভাব এখন বিশ্বজুড়ে। অর্থনীতিতে দেখা যেতে শুরু করেছে প্রভাব। কারণ এই সংঘাত সরাসরি আঘাত করেছে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে।

তেল সরবরাহের এই ধাক্কা ১৯৫০ এবং ৭০ এর দশকে বিশ্বে আঘাত হানা সরবরাহের ধাক্কার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যদিও বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের প্রভাব অনেক বেশি।

বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে।  কিন্তু যুদ্ধের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ রুটে জাহাজ চলাচল বাধগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বড় ধাক্কা লেগেছে তেলের সরবরাহে। যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এক পর্যায়ে প্রতি ব্যারেল প্রায় ১২০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছে, পরে কিছুটা কমে প্রায় ৮৫ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছে।

সমস্যা হলো, এই ঘাটতি দ্রুত পূরণ করার মতো সক্ষমতা বিশ্বের অন্য তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোরও খুব সীমিত। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল বা নরওয়ের মতো দেশগুলো উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করলেও তা খুব দ্রুত সম্ভব নয়। একই সময়ে ইরাক, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতেও তেল উৎপাদন কমে গেছে।

সংকট শুধু তেলেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহও কমে গেছে, কারণ কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত্ব জ্বালানি কোম্পানি সামরিক হামলার কারণে বন্ধ রেখেছে উৎপাদন। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা: যদি এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকে, তাহলে খুব দ্রুতই এশিয়া ও ইউরোপে জ্বালানির ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনেও। ইউরোপে গ্যাসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্রেও গাড়ির জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেখানে বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস মূল্যের ওঠানামা থেকে তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত থাকে সেখানেও দাম প্রতি গ্যালন সাড়ে ৩ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা এক মাস আগে ছিল ৩ ডলারের কম।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে দীর্ঘ সময় থাকে, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও কমে যেতে পারে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানি ঘাটতি পূরণের কোন সহজ উপায় না থাকায় এক সপ্তাহের মধ্যে এশিয়া ও ইউরোপে “দৃশ্যমান ঘাটতি” দেখা দেবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, কেউ কেউ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির ফলে প্রযুক্তি সংস্থাগুলি তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অবকাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তিকে আঘাত করবে।

মধ্যপ্রাচ্য অ্যালুমিনিয়াম, সালফার প্রাপ্তির একটি প্রধান উৎস, যা তামার মতো ধাতু প্রক্রিয়াকরণ ও ইউরিয়া সার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। তাই এই পণ্যগুলির দাম যত বাড়তে শুরু করবে খাদ্য এবং উৎপাদিত পণ্যের দামে তার প্রভাব পড়বে।

সংকটের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি এশিয়ার দেশগুলোতে, কারণ তারা জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে দেশের আমদানি ব্যয় বাড়বে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হবে, এবং শেষ পর্যন্ত পরিবহন, বিদ্যুৎ ও খাদ্যপণ্যের দামেও প্রভাব পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ না হয়, তাহলে তেলের দাম আবারও বাড়তে পারে, এমনকি প্রতি ব্যারেল ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বিশ্লেষকরা ইতিমধ্যেই সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, যুদ্ধের এই প্রভাব প্রযুক্তি থেকে শুরু করে কৃষক পর্যায় পর্যন্ত পড়বে। গাড়ি থেকে স্মার্টফোন তৈরিতে যে চিপ দরকার তা উৎপাদনের কেন্দ্র¯’ল তাইওয়ান এবং তারা জ্বালানি আমদানির উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

অর্থাৎ, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন শুধু ভূরাজনীতির বিষয় নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতি এবং বাংলাদেশের মতো আমদানি নির্ভর দেশের জন্যও বড় একটি উদ্বেগের কারণ। দেশের তেলের পাম্পগুলোর চিত্র ইতোমধ্যে সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এরই মধ্যে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আসন্ন ঈদ উল ফিতরের অনেক আগেই বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ‘

মানে, আপনি যেখানেই থাকুন না কেন ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশে দেশে।

Scroll to Top