এক ক্ষয়িষ্ণু জমিদার পরিবারের সন্তান নবীন সেন পিতার মৃত্যুর পর বিপুল দরিদ্রতার ভেতর দিয়ে গিয়েও শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করেন। বৃহৎ একটি পরিবার ছিল তাঁর আয়ের ওপর নির্ভরশীল। নিজে কষ্টে দিনাতিপাত করে সে দুঃখের দিনকে তিনি কোনো দিন ভোলেননি। তাই জনসাধারণের জীবনমান উন্নয়নে তিনি হয়ে ওঠেন উদ্যোগী।
১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রেজারস ম্যাগাজিনে জন স্টুয়ার্ট মিলের ‘ইউটিলিটারিয়ানিজম’ রচনাটি প্রথম প্রকাশিত হয়। পরে ১৮৬৩ সালে এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। হাসনা বেগম অনূদিতউপযোগবাদ গ্রন্থে থেকে এ দর্শনের পরিচয় দেওয়া হচ্ছে এভাবে:
[…] ‘ইউটিলিটারিয়ানিজম’ বা ‘উপযোগবাদ’ গ্রন্থটিতে মিল তাঁর একটি রূপরেখা দেন এবং সেই আদর্শ অনুসরণে সমাজ পরিবর্তনের একটি উপযুক্ত পথ প্রদর্শন করেন। তাঁর মতে, তেমন একটি সমাজে অধিকাংশ মানুষ (এবং সম্ভব হলে সব সংবেদনশীল প্রাণীই) আনন্দপূর্ণ জীবন যাপন করতে সক্ষম হবে। মানুষের কার্যকলাপ হবে সেরূপ সমাজকে প্রতিষ্ঠিত ও প্রলম্বিত করার জন্য উপযোগী। মানুষ স্বার্থের পথ ত্যাগ করে নিজের ও অপরের জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তুলবে। […] (বাংলা একাডেমি, সেপ্টেম্বর-১৯৮৮, পৃষ্ঠা: ৪)
এরপর মিলের বক্তব্য উদ্ধৃত করে অনুবাদক জানান, […] উপযোগ সুখের বিপরীতধর্মী কিছু তো নয়ই, বরং উপযোগ বলতে সুখকেই বোঝায়, যে সুখ বেদনার অনুপস্থিতির স্বার্থে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। […] মিলের বক্তব্য, […] একটি সন্তুষ্ট শূকর হওয়ার চেয়ে একজন অসন্তুষ্ট মানুষ হওয়া উত্তম; একজন সন্তুষ্ট নির্বোধ হওয়ার চেয়ে অসন্তুষ্ট সক্রেটিস হওয়া উত্তম। […] (প্রগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৭)
অন্যদিকে শরীফ হারুন সম্পাদিত ‘বাংলাদেশে দর্শন: ঐতিহ্য ও প্রকৃতি অনুসন্ধান’ গ্রন্থে ‘বাঙালির দর্শন’ রচনায় আমিনুল ইসলাম লিখেছেন, […] বঙ্কিমের মতে, ধর্ম বলি আর দর্শন বলি, এদের প্রত্যেকেরই আসল লক্ষ্য ব্যক্তির সুখসাধন। […] (বাংলা একাডেমি, জুন- ১৯৯৪) এখানেও উপযোগবাদের সাক্ষাৎ পাই। এর পরের অনুচ্ছেদে লেখক বলেন, […] কিন্তু সমষ্টিকে বাদ দিয়ে কিছুতেই সম্ভব নয় ব্যক্তির সুখ আনি। জন স্টুয়ার্ট মিলও অনুরূপ কথা বলেছিলেন। […]
তবে নবীন সেন পূর্বসূরিদের অন্ধ অনুসারী ছিলেন না। নবীনচন্দ্র সেন, বঙ্কিমকে সবিনয়ে অভিযোগ করেছেন, ঈশ্বরচন্দ্র-রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান সমাজ সম্পর্কে বঙ্কিমের নেতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির। সামনে বসে অগ্রজ বঙ্কিমের সমালোচনাও করেছেন। বাস্তবে, নবীনচন্দ্র সেন ছিলেন তাঁর সময়ের হাতে গোনা ধর্মীয়ভাবে উদার তথা বিরল ব্যক্তিদের একজন। (বঙ্কিমের দীর্ঘশ্বাস, সাইফুর রহমান, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২ অক্টোবর ২০২০)



