
ঢাকা, ১৪ অক্টোবর – বিগত দিনের সীমাহীন প্রশাসনিক অবহেলা আর তদারকিহীনতায় দেশের গৌরবোজ্জ্বল সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) যখন প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল, ঠিক তখনই শুরু হয়েছিল এক কঠিন সংকট মোকাবিলার অধ্যায়। তবে সমস্ত শঙ্কা আর স্থবিরতা কাটিয়ে মাত্র সাত মাসের ব্যবধানে এক অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে স্বাস্থ্য খাত। সরকার, মাঠপর্যায়ের নিবেদিতপ্রাণ স্বাস্থ্যকর্মী ও আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থাগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপে দেশের দুই কোটিরও বেশি শিশুর কাছে সফলভাবে পৌঁছে দেওয়া গেছে জীবনরক্ষাকারী টিকা।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে ইপিআই ও ভিপিডি সার্ভেইল্যান্সের যৌথ স্বাধীন পর্যালোচনা ফলাফল অবহিতকরণ’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের কর্মশালার সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এই সামাজিক ও মানবিক জয়ের কথা ঘোষণা করেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত।
কোন পরিস্থিতির মুখে কীভাবে ঘুরে দাঁড়াল দেশের টিকাদান ব্যবস্থা?
একসময় বাংলাদেশের ‘সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি’ (ইপিআই) আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাছে এক অনন্য বিশ্বমানের মডেল হিসেবে সম্মানিত হতো। বহু বছর ধরে চরাঞ্চল, উপকূল ও পাহাড়ি দুর্গম এলাকার শিশুদের অকালমৃত্যু কিংবা চিরতরে পঙ্গু হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছে এই কর্মসূচি। তবে বিগত সময়কালের অব্যবস্থাপনার কারণে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই স্বনামধন্য ব্যবস্থায় দেখা দিয়েছিল মারাত্মক ছন্দপতন।
সংকট সামলে সাফল্যের পেছনের মূল চিত্র:
শুরুতেই ‘হামের প্রাদুর্ভাব’ ও বড় সতর্কবার্তা: বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১৫ দিনের মাথায় দেশে শুরু হয় মরণঘাতী হামের মারাত্মক বিস্তার। বিগত দিনের অবহেলার কারণেই যে শিশুদের শরীরে কোনো রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা সুরক্ষাবলয় গড়ে ওঠেনি—এই প্রাদুর্ভাব ছিল তারই এক আশঙ্কাজনক নগ্ন প্রতিফলন।
জরুরি ক্র্যাশ প্রোগ্রাম ও কোল্ড-চেইন সক্রিয়করণ: পরিস্থিতির গভীরতা উপলব্ধি করে স্বাস্থ্য বিভাগ তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি পদক্ষেপ নেয়। ঝিমিয়ে পড়া কোল্ড-চেইন অবকাঠামো সচল করা, মাঠপর্যায়ের পরিদর্শকদের সক্রিয় করা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতো বৈশ্বিক অংশীদারদের যুক্ত করে বিশেষ টিকাদান অভিযান জোরদার করা হয়।
প্রান্তিক শিশুদের নিখুঁত ট্র্যাকিং: শুধু শহরাঞ্চল নয়, দুর্গম পাহাড়ি পথ আর হাওর অঞ্চলের যেসব শিশু টিকার আওতা থেকে ছিটকে পড়েছিল, বিশেষ বুথ ও ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে খুঁজে খুঁজে গত সাত মাসে দুই কোটিরও বেশি শিশুকে সফলভাবে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন: “বিগত সময়ের চরম অবহেলা ও অব্যবস্থাপনায় আমাদের বিশ্ব সমাদৃত ইপিআই কর্মসূচি এক বড় ধরনের সংকটে পড়েছিল। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে যখন হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, তখনই স্পষ্ট হয় পরিস্থিতি কতটা নাজুক ছিল। তবে গত সাত মাসের নিরলস পরিশ্রমে দুই কোটি শিশুকে আমরা টিকার আওতায় এনেছি। যদিও হামের ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি কাটেনি, তাই চিহ্নিত সব ত্রুটি-বিচ্যুতি দ্রুত দূর করে ইপিআই-এর পুরোনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনাই এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য।”
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ: এই সাফল্য ধরে রাখতে করণীয় কী?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এত অল্প সময়ে দুই কোটি শিশুকে টিকাদানের আওতায় আনা নিঃসন্দেহে এক অসামান্য মানবিক অর্জন। তবে রোগ প্রতিরোধে এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই এখন আসল পরীক্ষা।
বিশেষ করে টিকার মান অক্ষুণ্ণ রাখা, প্রান্তিক পর্যায়ে কোনো শিশু যেন বাদ না পড়ে তা ডিজিটাল ডেটাবেজের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা এবং হামসহ অন্যান্য ঘাতক ব্যাধির সংক্রমণ পুরোপুরি শুন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে নিয়মিত বুস্টার ডোজ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী অবশ্য দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে জানান, বিগত দিনের কোনো ভুলকে আর প্রশ্রয় না দিয়ে একটি কার্যকর ও টেকসই শিশু স্বাস্থ্য বলয় গড়ে তুলতে বর্তমান প্রশাসন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
এনএন/ ১৪ অক্টোবর ২০২৬

