অঞ্চলভিত্তিক ভোটের সমীকরণ ভেঙে দিল নির্বাচন | চ্যানেল আই অনলাইন

অঞ্চলভিত্তিক ভোটের সমীকরণ ভেঙে দিল নির্বাচন | চ্যানেল আই অনলাইন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের প্রচলিত অঞ্চলভিত্তিক ভোটের সমীকরণকে বড়ভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পশ্চিম, উপকূলীয় এলাকা কিংবা রাজধানী ঘিরে যে স্থায়ী রাজনৈতিক ধারা এতদিন ধরে দৃশ্যমান ছিল—এবারের নির্বাচনে তার ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা গেছে।

প্রাথমিক ও বেসরকারি ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, একাধিক অঞ্চলে ঐতিহ্যগতভাবে শক্ত অবস্থানে থাকা দলগুলো অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আবার যেসব আসনে দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট দলের একচেটিয়া প্রভাব ছিল, সেখানে নতুন জোট, স্বতন্ত্র প্রার্থী কিংবা মিত্রদল সমর্থিত প্রার্থীরা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন।

উত্তরাঞ্চলে পাল্টে যাওয়া সমীকরণ
রংপুর অঞ্চলে জাতীয় পার্টির (জাপা) দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটিতে বড় ধস নেমেছে। যে অঞ্চলকে দলটির ‘দুর্গ’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো, সেখানেই এবার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে পরাজয়ের মুখ দেখতে হয়েছে দলীয় প্রার্থীদের।

প্রাথমিক ফলাফল ও বিভিন্ন আসনের ভোট গণনার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রংপুরে ৬টি আসনের ৬ টি তেই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। রংপুর বিভাগের একাধিক আসনে জাপা প্রার্থীরা তৃতীয় কিংবা চতুর্থ অবস্থানে চলে গেছেন।

রংপুর সদর, গঙ্গাচড়া, পীরগঞ্জ, কাউনিয়া ও লালমনিরহাটসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পার্টি শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছিল। দলটির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ-এর ব্যক্তিগত প্রভাব এবং আঞ্চলিক আবেগ জাপার ভোটব্যাংককে সুসংহত করেছিল।

কিন্তু এবার সেই আবেগের প্রতিফলন দেখা যায়নি। ভোটারদের একটি বড় অংশ বিকল্প শক্তির দিকে ঝুঁকেছেন বলে স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জোট রাজনীতির নতুন সমীকরণ, প্রার্থী বাছাই নিয়ে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা জাতীয় পার্টির ভরাডুবির পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া) আসনে জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী রায়হান সিরাজী (দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে) পেয়েছেন ১ লাখ ৪৫ হাজার ৮৮ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মোকাররম হোসেন সুজন (ধানের শীষ প্রতীকে) পেয়েছেন ৫৯ হাজার ৪০৭ ভোট। তিনি ৯৫৫৮১ ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন।

রংপুর-২ (তারাগঞ্জ-বদরগঞ্জ) আসনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর এটিএম আজহারুল ইসলাম ১ লাখ ৩৯ হাজার ৬৮০ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আলী সরকার ৭৯ হাজার ৯১০ ভোট পেয়েছেন।

রংপুর-৩ (সদর) আসনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল ১ লাখ ৭৫ হাজার ৮২৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মহানগর আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু (ধানের শীষ প্রতীকে) পেয়েছেন ৮৪ হাজার ৫৭৮ ভোট। এই আসনে তৃতীয় হয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের, যিনি ৪৩ হাজার ৩৮৫ ভোট পেয়েছেন।

রংপুর-৪ (কাউনিয়া-পীরগাছা) আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী, এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন শাপলা (কলি প্রতীকে) ১ লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৭ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সাবেক জেলা সভাপতি এমদাদুল হক ভরসা (ধানের শীষ প্রতীকে) পেয়েছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৯৪৪ ভোট।

রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর) আসনে জামায়াতের জেলা আমির অধ্যাপক গোলাম রব্বানী (দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে) ১ লাখ ৭৫ হাজার ২০৮ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী গোলাম রব্বানী (ধানের শীষ প্রতীকে) ১ লাখ ১৪ হাজার ১০৪ ভোট পেয়েছেন।

রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনে জামায়াতের নুরুল আমিন (দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে) ১ লাখ ১৮ হাজার ৮৯০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সাইফুল ইসলাম (ধানের শীষ প্রতীকে) পেয়েছেন ১ লাখ ১৬ হাজার ৯১৯ ভোট।

উত্তরপূর্বাঞ্চলে বিএনপির জয়জয়কার
সিলেটের ৬টি আসনের ৫ টিতেই জয় পেয়েছেন বিএনপির প্রার্থী। আর একটিতে জিতেছেন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিস নেতা মুফতি আবুল হাসান।

ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, সিলেট-১ আসনে বিজয়ী প্রার্থী বিএনপির খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর পেয়েছেন ১লাখ ৭৬ হাজার ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি জামায়াত ইসলামের মাওলানা হাবীবুর রহমান পেয়েছেন ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৯ ভোট। এছাড়া গণ অধিকার পরিষদের আকমল হোসেন ৩১৪ ভোট, ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা মাহমুদুল হাসান ২ হাজার ৭০১ ভোট, বাসদের প্রণব জ্যোতি পাল ১ হাজার ১১৩ ভোট, সিপিবির আনোয়ার হোসেন সুমন ৯০৮ ভোট, ও বাসদ (মার্কসবাদী) সঞ্জয় কান্তি দাস পেয়েছেন ৮০১ ভোট।

সিলেট-২ আসনে বিজয়ী বিএনপির তাহসীনা রুশদির লুনা পেয়েছেন ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৫৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি খেলাফত মজলিসের মুনতাসির আলী পেয়েছেন ৩৮ হাজার ৬৩৫ ভোট।

সিলেট-৩ আসনে বিজয়ী বিএনপির এমএ মালিক পেয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজার ৪৫০ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুসলেহ উদ্দিন রাজু পেয়েছেন ৭৫ হাজার ৬৭৪ ভোট।

সিলেট-৪ আসনে বিজয়ী বিএনপির আরিফুল হক চৌধুরী পেয়েছেন ১ লাখ ৮৬ হাজার ৮৪৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি জামায়াত ইসলামের জয়নাল আবেদিন পেয়েছেন ৭১ হাজার ৩৯১ ভোট।

সিলেট-৫ আসনে বিজয়ী ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিস নেতা মুফতি আবুল হাসান পেয়েছেন ৭৯ হাজার ৩৫৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি বিএনপি জোটের প্রার্থী জমিয়তে ইসলামের উবায়দুল্লাহ ফারুক পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৭৭৪ ভোট। এ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী মামুনুর রশিদ চাকসু মামুন ফুটবল প্রতীকে পেয়েছেন ৫৪ হাজার ৬১৪ ভোট।

সিলেট-৬ আসনে বিজয়ী বিএনপির এমরান আহমদ চৌধুরী পেয়েছেন ১ লাখ ৯ হাজার ১০৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি জামায়াতের মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন ১ লাখ ১ হাজার ৫৫৯ ভোট।

উপকূল ও দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রতিদ্বন্দ্বিতা

কক্সবাজার, পটুয়াখালী, খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে। খুলনা-৫ আসনে মাত্র কয়েক হাজার ভোটের ব্যবধানে ফল নির্ধারিত হয়েছে, যা ঐ অঞ্চলে দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটির ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে।

সাতক্ষীরা জেলার নির্বাচনী লড়াইয়ে বড় জয় পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী। জেলার চারটি সংসদীয় আসনেই বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পরাজিত করে জয়ী হয়েছেন জামায়াত মনোনীত ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের প্রার্থীরা।

সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনে জয়ী হয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী মো. ইজ্জত উল্লাহ। ১৬৮টি কেন্দ্রের সবকটির ফলাফলে (পোস্টাল ভোটসহ) তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৭২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হাবিবুল ইসলাম হাবিব ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৬৯ হাজার ৯৯৫ ভোট। ইজ্জত উল্লাহ ২৩ হাজার ৭৭৭ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। এই আসনে গণভোট হ্যাঁ পড়েছে ২  লাখ ২৮ হাজার ৪০৪। না ভোট ১ লাখ ২১ হাজার ২৫৬। ৭৫.৬৪ শতাংশ ভোট কাস্ট হয়েছে।

সাতক্ষীরা-২ (সদর-দেবহাটা) আসনে বড় ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা আব্দুল খালেক। ১৮০টি কেন্দ্রের ফলাফলে তিনি পেয়েছেন ২ লাখ ৬৬ হাজার ৯৫৯ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী মো. আব্দুর রউফ ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৫০ হাজার ২৮৩ ভোট। আব্দুল খালেক ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬৬ ভোটের বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন।

সাতক্ষীরা-৩ (আশাশুনি-কালিগঞ্জ) আসনে ধানের শীষকে পেছনে ফেলে মূল লড়াইয়ে উঠে এসেছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. শহিদুল আলম। তবে শেষ পর্যন্ত জয় পেয়েছেন জামায়াতের রবিউল বাসার। ১৬৫টি কেন্দ্রের ফলাফলে তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৮৪ হাজার ২৩৩ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. শহিদুল আলম (ফুটবল প্রতীক) পেয়েছেন ১ লাখ ৫ হাজার ৩৮৯ভোট। ৭৮ হাজার ৮৪৪ ভোটের ব্যবধানে রবিউল বাসার জয়ী হয়েছেন। বিএনপির প্রার্থী কাজী আলাউদ্দিন ধানের শীষে ৫৬ হাজার ৮১৯ পান। এখানে গণভোট হ্যাঁ ভোট পড়েছে ২ লাখ ৩২ হাজার ৯২৫, না ভোট ১ লাখ ৪ হাজার ৮৮৩। ৭০.৯৯ শতাংশ ভোট কাস্ট হয়েছে।

সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসনে পুনরায় নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াত নেতা গাজী নজরুল ইসলাম। ৯৬টি কেন্দ্রের ফলাফলে তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৬ হাজার ৯১৩ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির ড. মো. মনিরুজ্জামান পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৪৬৬ ভোট। ২১ হাজার ৪৪৭ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন নজরুল ইসলাম। গণভোট হ্যাঁ ভোট ১ লাখ ২৯ হাজার ৭৪১, না ভোট ৬০ হাজার ৭৭৯ ভোট। ৬৭.৭৬ শতাংশ ভোট কাস্ট হয়েছে।

জোট রাজনীতির প্রভাব

এবারের নির্বাচনে জোট রাজনীতি বড় ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নেতৃত্বাধীন জোট একাধিক অঞ্চলে সমন্বিত প্রার্থী দেওয়ার কৌশল নেয়, যা আসনভিত্তিক ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য ইসলামপন্থী দলের প্রার্থীরাও কিছু নগর ও আধা-নগর এলাকায় প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল করেছেন।

নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ভোটের হার, তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় ইস্যু—এই তিনটি উপাদান অঞ্চলভিত্তিক পুরোনো সমীকরণ ভেঙে দিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

বিশ্লেষকদের অভিমত

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবার দলীয় প্রতীক নয়—ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, জোট সমন্বয় এবং মাঠপর্যায়ের সংগঠনের শক্তি ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছে। তারা মনে করছেন, এই নির্বাচনের ফল ভবিষ্যৎ জাতীয় রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ও নতুন জোট বিন্যাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা হলে অঞ্চলভিত্তিক এই পরিবর্তনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র আরও স্পষ্ট হবে। তবে প্রাথমিক ফলেই স্পষ্ট—ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের প্রচলিত ভোট-রাজনীতির সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তনের বার্তা দিয়েছে।

Scroll to Top